খারাপ বুদ্ধি না। তবে আপনি কাউন্সিল ডাকেন। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
মঈদুল হাসান এসেছিলেন দিল্লির খবর নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মস্কো যাচ্ছেন। মস্কোর বাংলাদেশ নীতি এখনো খুবই আলতো, পাকিস্তানকে চাপ দিচ্ছে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য। ইন্দিরা গান্ধী মনে করেন, এটা আর সম্ভব না। একমাত্র উপায় হলো যুদ্ধ করে পাকিস্তানি মিলিটারিকে পরাজিত করে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। কেবল তাহলেই এক কোটি শরণার্থী দেশে ফিরতে পারে। সেসব নিয়ে কিছু কিছু কথা সেরে মঈদুল হাসান বিদায় নিলেন।
বাইরে এসে তিনি ভাবলেন, আজ একটু হাঁটি। সকালটা হাঁটার জন্য বেশ। কলকাতার থিয়েটার রোডে খানিকক্ষণ হাঁটলেন ফুটপাত ধরে। টানা রিকশাগুলো রাস্তার ধারে। অ্যাম্বাসেডর গাড়িগুলো লাইন ধরে দাঁড় করানো।
ট্যাক্সিচালকেরা একখানে হয়ে হল্লা করছে।
মঈদুল হাসানের মনে হলো, তাজউদ্দীন আহমদ না খুন হয়ে যান!
.
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বলাবলি করে :
একজন এসেছিল অস্ত্রসমেত। থিয়েটার রোডের বাড়ির গেটে বিএসএফের প্রহরায় সে ধরা পড়ে। তাকে তাজউদ্দীন আহমদের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে সে বলে, সে মুজিববাহিনীর সদস্য। মুজিববাহিনীর এক নেতা তাকে পাঠিয়েছে তাজউদ্দীনকে হত্যা করার জন্য। তবে সে হত্যা করতে আসে নাই। তাজউদ্দীনকে সতর্ক করতে এসেছে।
তাজউদ্দীন বলেন, অস্ত্রটা রেখে দিয়ে এর নাম, ঠিকানা, ছবি রেখে একে ছেড়ে দিন। ভালো ছেলে। কোনো অসুবিধা নাই। আর এই নিয়ে কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করবেন না। এটা টপ সিক্রেট।
মুজিববাহিনীর কোন নেতা এই কাজটা করতে পারে? কারও এত কাঁচা কাজ করার কথা নয়। তাজউদ্দীন আহমদকে ইন্দিরা গান্ধী পছন্দ করেন, হাকসার, ডি পি ধর পছন্দ করেন, রুস্তমজি, গোলোক মজুমদার পছন্দ করেন, দলের এবং পরিষদ সদস্যদের সভায় তিনি অনুমোদন পেয়েছেন, তাঁকে মারতে একজন ছেলেকে অস্ত্রসহ একেবারে থিয়েটার রোডে পাঠিয়ে দেবে, আর এমন একজনকে পাঠাবে যে এসে বলে যাবে যে আমাকে এই অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে, ব্যাপার তো এত সহজ হওয়ার কথা না। কী। জানি। মানবচরিত্র বড়ই জটিল। কার মনে কী আছে, কে কেন কী বলছে, কী আচরণ করছে, অনেক সময়ই তা ধরা যায় না। এই আততায়ী ছেলের আচরণটাও রহস্যজনকই রয়ে যাবে। হয়তো চিরটাকালই।
.
সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখে জয় বাংলা পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় খবর আর ছবি প্রকাশিত হলো। ছবিটা হলো, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে সম্প্রতি ভারতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক গলব্রেথ মুজিবনগরে দেখা করেন।
আর বড় অক্ষরের শিরোনামটা হলো : পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের জাতিসংঘ যাত্রার প্রস্তুতি।
তাজউদ্দীন খবরটা দেখলেন। তিনি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে আলাপ করলেন। তার হিসাব হলো, খন্দকার মোশতাক আমেরিকা গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ত্যাগ করলে মুক্তিযুদ্ধের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু বিভ্রান্তি তো তৈরি হবেই।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, আর খন্দকার মোশতাকের হিসাবটা হইল, এই তাজউদ্দীনের খপ্পর থাইকা বাইরায়া যাই। তারপর আমেরিকার লগে কানেকশন ফিট কইরা শেখ সাহেবরে যদি ছাড়াইতে পারি, তাইলে সবাই মোশতাকের নামেই জয়ধ্বনি দিব। আর যদি ছাড়াইতে পারি, তাইলে কথা একটাই, হয় স্বাধীনতা, নাইলে মৃত্যু। আমগো স্বাধীনতাযুদ্ধে হেল্প করেন, না পারেন তো যুদ্ধ কইরা মরতে দেন।
ব্যাঙ্গমি বলে, কিন্তু এই দিকে ভারত-সোভিয়েত চুক্তির পর আর পাঁচ দলের উপদেষ্টা কমিটিতে মস্কোপন্থী দল দুইটারে রাখার পর তাজউদ্দীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্পষ্ট দেখতে পাইতাছেন। ইন্ডিয়া বাংলাদেশরে স্বীকৃতি দিব, পাকিস্তান ইন্ডিয়া অ্যাটাক করব, ভারতের সেনাবাহিনী আর বাংলার মুক্তিবাহিনী একযোগে ঢাকা দখল কইরা ফেলব।
তাজউদ্দীন এক প্রতিনিধিদল ঠিক করেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বইলা। এরা জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে কথা কইতে নিউইয়র্ক যাইব।
.
এ আর মল্লিক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, যিনি মার্চ-এপ্রিলের প্রতিরোধ সংগ্রামে সেনাধ্যক্ষের ভূমিকা পালন করছিলেন, তিনি তখন বোম্বেতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিচ্ছেন এবং তাঁর ভাষণের সময় কত তালি পড়ছে, তার হিসাব কষছেন। হঠাই কলকাতা থেকে ফোন এল, তাজউদ্দীন ডেকে পাঠিয়েছেন এবং তাকে নিউইয়র্ক যেতে হবে, জাতিসংঘে। তিনি দ্রুত উড়ে এলেন কলকাতা, দেখা করলেন তাজউদ্দীনের সঙ্গে, তারপর ভবনের দোতলা থেকে নামার পথে দেখা পেলেন খন্দকার মোশতাক, আর তার সঙ্গী তাহের উদ্দীন ঠাকুরের। ঠাকুর বললেন, স্যার, জাতিসংঘে যাচ্ছেন তো?
হ্যাঁ।
স্যুট বানানোর টাকা পেয়েছেন?
তা তো একটা খাম পেলামই।
স্যার কষ্ট করে আর স্যুট বানাতে হবে না। আমি বানিয়েছিলাম। ওটা নিয়ে যান।
তোমারটা আমার গায়ে ফিট করবে বলে মনে হয় না। তুমি যাচ্ছ না। কেন?
এখানে অনেক কাজ স্যার।
আসলে ডি পি ধর খন্দকার মোশতাককে ডেকে ধমক দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বিশ্বাসঘাতক।
তাতে খন্দকার মোশতাক নিজেকে নিবৃত্ত করেন।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, ডি পি ধরের এই ট্রেইটর বা বিশ্বাসঘাতক কথাটা ইতিহাসে প্রমাণ হইয়া যাইব। সেইটা অনেক রক্তের দামে।
