তোমাদের তো মাত্র দুজন মারা গেছে, না!
হ্যাঁ।
বডি নিয়ে এসেছ!
হ্যাঁ।
কী করবে।
বর্ডারের ওপারে বাংলার মাটিতে কবর দেব।
তাই করা হয়। আবদুস সবুরের দেহ মার্কিন কাপড়ে মোড়ানো হয়েছিল। ধলার দেহে কাফন হয় তার মায়ের বেগুনি শাড়ি।
গুলি লাগার পরে সে বলেছিল, কমান্ডার বাহে, মোকে কিন্তুক মোর মাওয়ের শাড়ি দিয়া কাফন দিবেন। আর মোর ব্যাগের ভিতরে দেখমেন মোর বোনের লাগি মুই ইন্ডিয়ান স্নো-পাউডার কিনি থুছোম। সেগুলা একনা মোর বোনটাকে দিবেন।
.
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বলাবলি করে :
দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪০ বছর পর ৬২ বছরের কমান্ডার মাহবুব হোসেন। আবার গিয়েছিলেন সেই বোয়ালমারী বর্ডার এলাকায়। খুঁজে পেয়েছিলেন ধলা মিয়া আর আবুদস সবুরের জোড়া কবর। জোড়া কবর নামেই জায়গাটাকে এলাকাবাসী সংরক্ষণ করেছে।
তিনি বললেন, আমি ধলা মিয়ার বাড়ি যাব। তার মাকে-বোনকে খুঁজে বের করব।
মোটরসাইকেল যাত্রা শুরু করে গোরুমারা ব্রিজ ধরে। রাস্তাটা পাকা হয়েছে। ব্রিজ পেরিয়ে ডান পাশের রাস্তায় নেমে তারা যান সেই গ্রামে, যেই গ্রামে বাজে পোড়া জামগাছের নিচে ধলা মিয়ার বাড়ি ছিল।
বাড়িটি আর মাহবুব হোসেন খুঁজে পান না। জামগাছটাই তো নেই। আর এলাকাটা এত বদলে গেছে যে তিনি ধন্দে পড়ে যান।
৬৫
তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করতে খুব সকালবেলা এসেছেন মঈদুল হাসান। তখন তাজউদ্দীন আহমদের ঘড়িতে ৭টা ২৫, মঈদুল হাসানের ঘড়িতে ৭টা বাজতে ৫ মিনিট বাকি। তাজউদ্দীন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে নাশতাপানি সেরে নিয়ে নিজের রুমে বসে জরুরি নোট তৈরি করছেন। কার্তিকের এই সকালটায় সত্যি হেমন্তের আমেজ। বাড়ির চারদিকে খোলামেলা, গাছগাছালি থাকায় আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক।
মঈদুল হাসানকে দেখে তিনি বললেন, আসেন মঈদুল সাহেব। চা খাবেন?
খাই এক কাপ। তাজউদ্দীন তাঁর পরিচারক মকফুরকে চা দিতে বললেন।
মঈদুল বললেন, পাঁচদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ হয়ে গেছে। ভারত সোভিয়েত চুক্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে আপনার মনটা কি এখন আগের চেয়ে ভালো নয়?
তাজউদ্দীন বললেন, আমার যুদ্ধ তো কেবল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে নয়। আমার যুদ্ধ ঘরে-বাইরে সবদিকে।
নতুন কী হলো?
নতুন কিছু হয়নি। বারাসাতে ৯ নম্বর জোনাল অফিসে আমাদের ৪০ জন পরিষদ সদস্য বসেছেন। তারা রেজলুশন নিয়েছেন, সরকার বাতিল করতে হবে। ওয়ার কাউন্সিল গঠন করতে হবে। নুরুল ইসলাম এমপিএ সাইন করেছেন।
তাজউদ্দীন একটা ইংরেজিতে টাইপ করা চিঠি বের করে দেখালেন মঈদুলকে। মঈদুল পড়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন।
চিঠিতে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ভোটে ম্যান্ডেট পেয়েছে। কিন্তু একটা একনায়কতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার কাজকর্ম আওয়ামী লীগের নীতি-আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আপনারা জানেন, একটা উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাতে ন্যাপের দুই গ্রুপ, কমিউনিস্ট পার্টি, কংগ্রেস আর আওয়ামী লীগকে রাখা হয়েছে। এ রকম একটা ভাইটাল ম্যাটার দলের মধ্যে আলোচনা করে পাস করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করা হয়নি। একটা প্ল্যানিং সেল গঠন করা হয়েছে, যাতে একজনও আওয়ামী লীগার নেই।
এমএনএ এনায়েত হোসেন খানের সভাপতিত্বে ১১ সেপ্টেম্বরে এই গ্রুপ তাজউদ্দীনকে সরকার ও দলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরানোর জন্য আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঈদুল হাসান বললেন, আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড এই কথা শুনবে কেন?
শোনা না-শোনা পরের ব্যাপার। আমরা যুদ্ধ করব, না ঘর সামলাব? আর হেনা ভাই ইউসুফ সাহেব মিলে উত্তরাঞ্চলের নেতাদের সংগঠিত করছেন। টাকা তুলে টাকা ছিটাচ্ছেন। দিনাজপুরের আজিজ সাহেব আমার লোক। তাকে সাইজ করার চেষ্টা করছেন। এই যে রিপোর্ট।
হাতে লেখা একটা গোয়েন্দা রিপোর্ট দেখালেন তাজউদ্দীন। মঈদুল পড়লেন।
মঈদুল বললেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে, আপনার ঘরের মধ্যে চার ধরনের শত্রু। ১. খন্দকার মোশতাক, চাষী, আমেরিকা। ২. শেখ মণি এবং ছাত্রনেতা, মুজিববাহিনী। ৩. খুলনা যশোর গ্রুপ। ৪. উত্তরবঙ্গ গ্রুপ। কারও সঙ্গে কারও তো বনিবনা নাই। আপনি আবার আওয়ামী লীগের এবং পরিষদ সদস্যদের জাতীয় সভা ডাকেন।
তাজউদ্দীন বললেন, কারও সাথে কারও বনিবনা নাই। কিন্তু একটা প্রশ্নে সবাই এক। তাজউদ্দীন হটাও।
মঈদুল বললেন, একটা পলিটিক্যাল আদর্শ এদের আছে। তা হলো, এরা সবাই ডানপন্থী। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। আওয়ামী লীগের একক নেতৃত্বে বিশ্বাস করে।
তাজউদ্দীন বললেন, মণি ছাড়া বাকি তিনজন যুবনেতা, তোফায়েল, রাজ্জাক, সিরাজ কিন্তু নিজেদের সমাজতন্ত্রী বলে।
মঈদুল বললেন, তা বলে কিন্তু…
তাজউদ্দীন বললেন, সিরাজ আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। দেখা করব।
মঈদুল বললেন, করেন। আপনি প্রধানমন্ত্রী। আপনি সবার সঙ্গেই কথা বলতে পারেন।
তাজউদ্দীন বললেন, নুরুল কাদের আমাকে একটা বুদ্ধি দিয়েছেন। সবাইকে কাজ দেন। এম আর সিদ্দিকী, মিজানুর রহমান চৌধুরী, মফিজ চৌধুরী সবাইকে বাংলার বাইরে পাঠিয়ে দেন। জাতিসংঘে বড় দল পাঠানো যায়। দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় জনমত তৈরি করতে প্রতিনিধি পাঠানো যায়। দিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্যে প্রতিনিধি পাঠানো যায়। খন্দকার মোশতাক সাহেবকে রণাঙ্গন দেখতে যেতে বলি। এক জায়গায় বসে থাকলেই এঁরা দলাদলি করবেন।
