রাজাকার তিনজনই। তিনজনের হাতেই টর্চ আছে। মাঝেমধ্যে তারা টর্চ জ্বালে। আর এদিক-ওদিক টর্চের আলো ফেলে। ঝোঁপের মধ্যে। ঝাড়ের মধ্যে। পানির মধ্যে।
তিনটার কাঁধেই রাইফেল।
কাজটা কঠিন হবে না। ছয়জনের দলই যথেষ্ট। খালের দুপার থেকেই আক্রমণ করতে হবে। এপাশে তিনজন। ওপাশে তিনজন। রাস্তা ধরে দুজন। দুপাশের নামা থেকে চারজন। মাহবুব হোসেন ছক কষতে থাকেন।
কিছুক্ষণ আখের খেতে ঘাপটি মেরে থেকে রাজাকারগুলোর গতিবিধি দেখে তারা ফিরে আসে।
ধলা মিয়া বলে, পরশু দিন ফির আসিবার দরকার কী। রাইফেলটা দ্যান মোর হাতত, মুই এটে থাকি গুলি করি খতম করি দেই।
একটা গুলি করিলে তিনটায় শুতি পড়িবে, তখন কী করিবি।
তা-ও তো কথা?
না পরশু একেরে রেডি হয়া আসমা। গ্রেনেড আনমো। রাজাকারগুলাক খতম করিয়া এক্সপ্লোসিভ দিয়া ব্রিজটা উড়ি দেমো। তাইলে এই রাস্তা ধরি মিলিটারি জিপ আর না যাইবার পারিবে। বর্ডারত যাওয়া ওমার বন্ধ হয়া যাইবে।
তারা ফিরে আসে। প্রথমে আখখেত ধরে। তারপর খালের পার হয়ে।
আবার তারা চলে আসে ধলা মিয়ার বাড়ির কাছাকাছি। ধলা মিয়া বলে, ও বাহে কমান্ডার, মুই একনা যাও মোর বাড়িত। কাকেও না ডাকিমো। খালি ওই দেখেন বেড়াত মোর মার শাড়ি দেখা যায়, মুই খালি যায় মায়ের শাড়িটা একবার ধরিমো। উয়ার গন্ধ একনা শুকিমো। আর কিছু না করিমো।
তার এই আকুতিতে মাহবুব হোসেনের হৃদয় গলে যায়। মাহবুবেরই-বা কী এমন বয়স। তিনি বলেন, আচ্ছা যা, হামরা এটে কোনা পাকুড়গাছের নিচে বসি থাকি। একনা জিরাই। তুই এক দৌড়ে দিয়া যা, আর এক দৌড় দিয়া আয়। দেরি করিস না জানি। তাইলে কিন্তু ম্যালা ফাপর লাগিবে।
কথা শেষ হওয়ার আগেই ধলা এক লাফে খালের কিনারে। দুই লাফে হাঁটুজলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে সে খাল পেরিয়ে যায়। মাহবুব হোসেন আর আবদুল খালেক তাকিয়ে থাকেন। সে খালের ওপারে ওঠে। তারপর আলপথ বেয়ে ওই যে তার বাড়ির ভিটার দিকে যায়। মাঝেমধ্যে গাছের আড়ালে পড়ে তার ছায়ামূর্তি, কখনোবা তাকে ফের দেখা যায়।
খানিক পরে দৌড়েই ফিরে আসে ধলা মিয়া। তার হাতে তার মায়ের শাড়ি। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, অত সময় নাই, তাই মুই মার শাড়িখান ধরি নিয়া আসছোম। এইটা মুই মোর কাছে থোমো। মুই এইটাকে খ্যাতা বানায়া গায়ত দেমো।
তার চোখে জল, মুখে হাসি। বিজয়ীর হাসি।
চলেন এলা।
আবারও মাইল দশেক হাঁটতে হবে। তারপর বর্ডার। সাবধানে বর্ডার পেরিয়ে তারা চলে যাবে ওপারে। ওই পারে তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প প্লাস শেল্টার। একটা প্রাইমারি স্কুলের দুইটা রুম দখল করে নিয়ে তাদের থাকার জায়গা। তারই মেঝেতে তারা বাইশজন ঘুমায়।
ধলা মিয়া বেগুনি রঙের ছেঁড়া শাড়িটা দিয়ে তার গা-মাথা মুড়ে রেখেছে। সকালবেলার রোদ এসে পড়েছে সেই শাড়িতে। মাহবুব হোসেন দেখেন। ঘুমাক ছেলেটা।
মনে হচ্ছে সে ঘুমুচ্ছে তার মায়ের কোলে।
সে সন্ধ্যাতেই তাদের শিবিরের ওপরে মর্টারের গোলা এসে পড়তে থাকে।
পাকিস্তানি মিলিটারি বর্ডার থেকে মর্টার দিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে বোমা মারছে। এদিক থেকে বিএসএফও পাল্টা গোলা ছুঁড়তে শুরু করে।
মাহবুব হোসেন সবাইকে ক্রল করে দ্রুত পেছনের দিকে সরে যেতে নির্দেশ দেন।
সবাই ক্রল করছে।
পেছাচ্ছে।
একটু পরে বিএসএফের কমান্ডার জগদীশের কল আসে ওয়্যারলেসে। কাউয়ার্ডের দল পেছাচ্ছ কেন? সামনে এগোও।
সব রাইফেল নিয়ে পুরো টিম ভেতরে যাও। মর্টারের গোলা কখনো কাছে পড়ে না।
ভেতরে গিয়ে ওদের রেঞ্জের ভেতরে এনে রাইফেল দিয়ে অ্যাটাক করো। যাও।
মাহবুব নির্দেশ দেন, চলো, ক্রল করে বর্ডারের দিকে চলো।
হাতের কনুই ছিলে যাচ্ছে। হাঁটু ছড়ে যাচ্ছে। পিঠে অস্ত্র। গোলাবারুদ। তারা সামনে এগোয় দ্রুত। খানিক পরে তারা টের পায়, গোলা যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। এখন তারা হাঁটতে পারে।
কী যে শব্দ হচ্ছে। মাথার ওপর দিয়ে মাঝেমধ্যেই ছুটে যাচ্ছে গোলা। আগুন জ্বলে উঠছে দূরে দূরে। মাহবুব হোসেনের দল তড়িৎবেগে দৌড়াচ্ছে বর্ডারের দিকে।
আবার তিনি অর্ডার দেন, শুয়ে পড়ো। আমরা শত্রুর রাইফেলের রেঞ্জে এসে গেছি। আরেকটু এগোব। হাবিলদার কাশেম এলএমজি চালাবে শুরুতে। তারপর আমরা রাইফেল চার্জ করব। একযোগে চলো।
ঢোলকলমির বন ধরে তারা ক্রল করে করে এগোতে থাকে। খুব কাছে। আরও কাছে।
.
ধলা মিয়ার কাঁধে রাইফেল। তার নিশানা সবচেয়ে ভালো। তারা শত্রুর খুব কাছে এসে গেছে। শত্রুদের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। মর্টারে গোলা ভরে ভরে তারা চার্জ করছে। জটলা পাকিয়ে। এত কাছ থেকে তাদের কেউ আক্রমণ করে বসতে পারে, এটা তারা ভাবতেও পারবে না। সামনের কলমির গাছগুলো সরিয়ে এলএমজির পজিশন তৈরি করে কাশেম।
সবাই আধা বসা হয়ে একযোগে রাইফেল তাক করে।
মাহবুব আদেশ করেন, ফায়ার।
এই রকম সাফল্য ইদানীংকালে মুক্তিযোদ্ধারা অল্পই দেখিয়েছেন। ১২ জন পাকিস্তানি মিলিটারি মারা গেছে। তাদের অস্ত্র সব বয়ে নিয়ে এসেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। বিএসএফের কমান্ডার জগদীশ জড়িয়ে ধরলেন কমান্ডার মাহবুবকে। শাবাশ! ইউ ডিড অ্যান এক্সিলেন্ট জব। দিস ইজ হিরোইক অ্যান্ড ব্রেভ। অ্যান্ড দিস উইল রিমেইন অ্যাজ অ্যান এক্সাম্পল ইন দ্য মিলিটারি হিস্ট্রি। মর্টার পোস্টে গিয়ে আক্রমণ করে বসা। ও মাই বয়েজ ও মাই বয়েজ!
