কমান্ডার মাহবুব হোসেন (২২) পিঠের রাইফেলের বেল্টটা কাঁধে একটু সরিয়ে নেন। তারা তিনজন চলেছেন মড়াঘাটির ভেতর দিয়ে চিকন নালার দিকে। ধলা মিয়া ছাড়াও তাদের সঙ্গে আছেন আবদুল খালেক। আবদুল খালেক ইপিআরের জওয়ান, তার কাঁধেও রাইফেল, চাঁদের আলোয় রাইফেলের নল চকচক করছে, আবদুল খালেক হাতিয়ারের যত্ন নেন খুব। বোধ হয় নলে নারকেলের তেল মাখেন।
এত সুমসাম রাত। এখনো রাতের প্রথম প্রহর কাটেনি, তাতেই পুরো পৃথিবী যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। মাঝেমধ্যে শিয়ালের ডাক শোনা যায়, প্রলম্বিত হুক্কাহুয়া ডাক, তারপরেই কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ের পশলা ওঠে। কুকুরের ডাকের উৎসের দিকে তাকালে আবছায়া গ্রামের আভাস দেখা যায়।
ধানখেত থেকে উঁচুতে তারা একটা রাস্তায় ওঠে। মাটির রাস্তা। সেটা থেকে নেমে আবার তারা চলে আলপথ ধরে।
একটা পাকুড়গাছের নিচে এসে দাঁড়ায় তারা। সামনে একটা খাল। খালে সরু জলের ধারা, আর বালু, চাঁদের আলোয় জল আর বালু যার যার মতো করে চিকচিক করছে।
বাঁ দিকে খাল ধরে এগোবে তারা।
মাইলখানেক হাঁটলে গোরুমারা ব্রিজ। সেটা পাহারা দেয় তিনজন রাজাকার। এইটাই খবর তাদের কাছে। আজকে তাদের কাজ রেকি করে দেখা, কজন আসলেই পাহারা দেয়। তারা কোথায় পজিশন নেয়। তাদের হাতে কী অস্ত্র থাকে।
ধলা মিয়া বলে, বাহে কমান্ডার, এই নালা পার হইলেই কইলাম মোর বাড়ি।
কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, তাই নাকি। কোন বাড়িটা?
ওই যে উঁচা একখান গাছ দেখা যায়, জামগাছ, বাজে পোড়া জামগাছ, ওইটার বগলত।
তাইলে তো গোরুমারা ব্রিজ তুই ভালো করেই চিনিস।
হ। এইসব জায়গাত মুই কত গরু চরাইছ। গরুক ধরি আইল-চরা দিছ। আইলের দূর্বাঘাস খাইলে গাইয়ের দুধ বেশি হোয়ায়।
আর কতক্ষণ হাঁটা লাগিবে? আবদুল খালেক বলেন। তার কপালে একটা উঁচু ঢিবির মতো আছে, চাঁদের আলোয় সেটাও চকচক করে।
ধলা মিয়া বলে, আর বেশি হাঁটা লাগিবে না। আসিয়াই পড়ছোম। ওই দেখেন, হামার বাড়ির টিনের চাল দেখা যায়।
ধলা মিয়ার চোখ চকচক করে।
খালের ধারে বিষকাটালির ঝোঁপ। তাতে জোনাকির মেলা। খালের পানিতে মাছ নড়ে ওঠে। মাহবুব হোসেন টর্চের আলো ফেলেন। মাছ বুঝিবা দেখা যায়।
ধলা মিয়া বলে, কমান্ডার, ও বাহে কমান্ডার, মুই একনা যাওঁ বাড়িত, মাওয়ের সাথত একনা দেখা করি আসি!
মাহবুব হোসেন বলেন, তোর মা এই বাড়িতে থাকে!
হয় হয় বাহে। মোর মাও আছে, মোর ছোট বোইন আছে। ধলা মিয়া উৎসাহের সঙ্গে বলে।
তোর ছোট বোনের নাম কী? মাহবুব হোসেন জিজ্ঞেস করেন।
উপালি।
রুপালি?
হয়। উপালি।
তোর মতোই ফরসা তোর বোনটা?
মুই আর কী ফরসা! মোর বোইন একেরে ধরেন এই চান্দের মতন ধবধবা ফরসা।
কত বছর বয়স তোর বোনের?
বারো হইবে ধরেন।
তুই আদর করিস বোনকে?
করি মানে ধরেন উয়াকে মুই কত যে বরাই পাড়ি দেই, তেঁতুল পাড়ি দেই।
বোনটাকে দেখতে ইচ্ছা করছে?
হয় হয়। বোইনটাক দেখমো বলি মনটা পোড়াইতেছে। আর মা-ও আছে। মা-ও তো মোকে খুব আদর করে। মোকে ধরেন জামবাটিতে গরম দুধ দিবে, তাতে দিবে লাল মুড়কি, সর দিবে তুলি, মুই মার সামনত পিঁড়াতে বসি দুধ খামো, আর যদিল ধরেন দুধভাত খাই, গুড় দিবে, গুড় দিয়া পাত মোর একেরে লাল হয়া যাইবে।
তুই একাই খাস। বোনকে দিস না?
বোনকও দেই। মোর বোন দুধের চাইতে ধরেন কুড়ানি জিনিস বেশি পছন্দ করে। পানিয়াল তার এক নম্বর পছন্দ।
তারা আবার হাঁটে।
কমান্ডার, ও কমান্ডার বাহে, চলেন বাহে, মোর বাড়িত যাই, মাকে একনা দেখি, বোইনটাকে একবার দেখি, কত দিন দেখোম না, ৯৭ দিন হইবে না?
মাহবুব হোসেন বলেন, না না, যে কামত আসছিস সেই কামত মন দে। এলা যাওয়া না যাইবে। রংপুর কারমাইকেল কলেজের ছাত্র মাহবুবও রংপুর অঞ্চলের কথ্যভাষাটা ভালোভাবেই জানেন। তিনি বুঝিয়ে বলেন, এখন যদি আমরা তোর বাড়িতে যাই, তোর মা ঘুম থেকে জাগবে, বোন জাগবে, কুকুর ডাকাডাকি করবে, আশপাশের তোর চাচা-চাচির বাড়ির লোকজন জেগে যাবে, তারা বুঝতে পারবে মুক্তিরা এসেছে, এ-কান ও কানে কথা ছড়িয়ে পড়বে। আমরা আজকে যাচ্ছি রেকিতে। কাল বা পরশু আমরা আসব অপারেশনে। তার আগে কথা এ-কান ও-কান হলে আমাদের এই অপারেশনটা আর হবে না রে ধলা। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমরা দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। আর মাকে-বোনকে দেখার লোভ সামলাতে পারব না?
আবদুল খালেক বলেন, ধলা মিয়া, তাইলে কাইল হোক পরশু হোক হামরা অপারেশন শ্যাষ করি ফেরার সময় তোর মার বাড়ি যামো। তখন তুই তোর মা আর বোনক দেখিস। আইজকা-কাইলকা দুইটা দিন সবুর কর।
বর্ডার থেকে প্রায় ১২ মাইল হেঁটে তারা এসেছে এই গ্রামে। গ্রামটা ধলা মিয়ার নিজের এলাকায় বলে তাকে সঙ্গে আনা হয়েছে গাইড হিসেবে। আর ধলা মিয়া যোদ্ধা হিসেবেও ভালো। গ্রামের রাখাল ছেলে, পরিশ্রম করা অভ্যাস আছে, তার নিশানাও খুব ভালো। সাহসেরও তুলনা নাই।
ধলা মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে, ঠিক আছে, তাইলে আইজকা আর না যাওঁ। পরশু দিন লড়াই শ্যাষ করি রাজাকারগুলানক খতম করি, তারপর যামো।
হাঁটতে হাঁটতে তারা দূর থেকে দেখতে পায় গোরুমারা ব্রিজ।
মাহবুব হোসেন গলায় ঝোলানো বাইনোকুলার বের করেন। সামনে। আখের খেত। তার ভেতরে ঢুকে তারা নিঃশব্দে এগোতে থাকেন। তবু পাতার খসখস আওয়াজ তাঁদের বুকে এসে বেঁধে। নিজেদের নিশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। একটা শিয়াল ঘাড় বাঁকিয়ে অবাক হয়ে তিন মানবসন্তানের সন্তর্পণে এগিয়ে যাওয়া প্রত্যক্ষ করে।
