আমি রেইনকোট পরে নেব। আর ছাতা তো আছেই।
ছাতা হাতে ধরে তো আপনি সাঁকো পার হতে পারবেন না।
তাহলে রেইনকোটই যথেষ্ট।
শাড়ি। শাড়ির নিচে রেইনবুট। শাড়ির ওপরে রেইনকোট। ইন্দিরা গান্ধী তিন বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে পাহাড়ি নালা পার হলেন। সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর এ আই ডায়াস। আর তার উপদেষ্টা সিদ্ধার্থ শংকর রায়।
তিনি ক্যাম্পের ভেতরে প্রবেশ করলেন। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বাঁশের ব্যারাক। ৮০০-এর বেশি মুক্তিযোদ্ধা এখানে গেরিলা ট্রেনিং নিচ্ছেন। তিনি ছেলেদের সঙ্গে দেখা করলেন।
একজন কিশোর বয়স্ক ছেলেকে দেখে তিনি কৌতূহলী হলেন। বললেন, তোমার বয়স কত?
ছেলেটি তাড়াতাড়ি তার বয়স বাড়িয়ে ফেলল তিন বছর। বলল, ১৮।
এখানে তোমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো?
সে বলল, না, কষ্ট হচ্ছে না। কিসের কষ্ট। আমার বাড়ি পাকিস্তানি মিলিটারিরা পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে। আমি এখানে বেঁচে আছি।
তোমার কি কিছু লাগবে?
না। আমার কিছু লাগবে না।
না। যদি কিছু লাগে তো বলো।
ছেলেটা বলল, আমাদের রেডিওটা ভালো শোনা যায় না। আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনি। একটা ভালো রেডিও যদি দিতেন!
ইন্দিরা গান্ধী আবেগাপ্লুত হলেন। এই ছেলেকে যে দেশ জন্ম দিতে পারে, সেই দেশ স্বাধীন হবেই।
এমএনএ মতিউর রহমান সঙ্গে ছিলেন। তিনি বললেন, ম্যাডাম, আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন।
ইন্দিরা বললেন, আমিও খুব উদ্বিগ্ন। আমি আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে চিঠি দিয়েছি। অন্য সব জায়গাতেই আমি চিঠি দিয়েছি। আমাদের যা কিছু করার আমরা করছি, করব।
মতিউর রহমান বললেন, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র দরকার। আরও বেশিসংখ্যক ছেলের ট্রেনিং দরকার। এক লাখ পাঞ্জাবি সৈন্য, এক লাখ রাজাকার। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের তিন লাখ মুক্তিযোদ্ধা দরকার হবে। ট্রেনিংয়ের গতি বাড়াতে হবে।
ইন্দিরা একটা শামিয়ানার নিচে একটা গার্ডেন চেয়ারে বসলেন।
ব্রিগেডিয়ার ওবেরয় বললেন, ম্যাডাম, আপনি এক কাপ চা খাবেন।
তিনি বললেন, আকাশে কী রকম মেঘ দেখছেন। এই রকম পরিবেশে এক কাপ চা হলে মন্দ হয় না।
ফ্লাস্কে করে চা এল। কাপ এল।
ইন্দিরা নিজ হাতে চা ঢাললেন কাপে। এক কাপ এগিয়ে দিলেন গোলোক মজুমদারের হাতে। তারপর উঠলেন চেয়ার থেকে। গোলোক মজুমদারকে বললেন, একটু এই দিকটায় আসুন। বৃষ্টিতে গাছপালাগুলো কী রকম সবুজ দেখাচ্ছে, না!
গোলোক এগিয়ে গেলেন। ইন্দিরা বললেন, চা ভালো হয়েছে। এটা কি দার্জিলিং চা, নাকি আসাম চা?
গন্ধ তো বলছে দার্জিলিং!
এই গতিতে যদি আমরা চলি, কবে আপনি আশা করছেন যে আপনি ঢাকায় হাজির হতে পারবেন?
কখনো না। গোলোক মজুমদার বললেন।
কেন? আমাকে তো সব সময় বলা হয়েছে, বিএসএফ একাই এটা করতে পারবে!
না, পারবে না। ওদের আছে গোলন্দাজ বাহিনী, বিমানবাহিনী, ভারী অস্ত্র সজ্জিত পদাতিক বাহিনী। আমাদের আর্মি এবং বিমানবাহিনীকে কাজে লাগাতে হবে।
আমিও তা-ই ভাবছি। আমার শুধু একটাই দুশ্চিন্তা। পশ্চিমে কী হবে!
পশ্চিমা বিশ্বে আমাদের প্রচার বাড়াতে হবে। এমনিতেই আমেরিকার জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। এডওয়ার্ড কেনেডির মতো মানুষ অনেক। রবিশঙ্কর কনসার্ট ফর বাংলাদেশ করেছেন। সেখানে জর্জ হ্যারিসনের মতো বড় পপগায়ক বাংলাদেশ নিয়ে গান করেছেন।
আমি পশ্চিম সীমান্তের কথা বলছি।
ও। আমাদের সৈন্য, আমাদের ট্যাংক, আমাদের বিমান ওদের তিন গুণ। আমাদের প্রস্তুতি থাকলে না পারার কথা না।
হুম।
শুধু বর্ষাকালটা চলে যেতে দিতে হবে। আমাদের মাঠগুলো শুকনো থাকতে হবে। ট্যাংকগুলোকে পজিশন নিতে দিতে হবে। আখের খেতগুলো পরিষ্কার হতে হবে।
ঠিক বলেছেন।
তাহলে কবে আমরা গ্রিন সিগন্যাল পাব বলে আশা করতে পারি?
ধরুন। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ। চায়ে দুধটা মনে হচ্ছে মোষের। আসার পথে রাস্তার ধারে অনেক মোষ দেখেছি। কী বলেন!
হ্যাঁ। মোষের দুধের চা-ই হবে।
.
ইন্দিরা গান্ধী চলে গেলেন দিল্লি।
গোলোক মজুমদার এই বার্তা জানালেন রুস্তমজিকে। রুস্তমজি জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফোন করলেন গোলোক মজুমদারকে।
গোলোক, সোজা দিল্লি চলে এসো।
গোলোক মজুমদার দিল্লি গেলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রসচিব, তিন বাহিনীর প্রধান, ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের প্রধান এবং র-এর প্রধান উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে।
গোলোক বললেন, নভেম্বরের তিন নম্বর সপ্তাহ। মানেকশ বললেন, গোলোক, এখন থেকে তুমি তোমার সব ইনফরমেশন আমার সঙ্গে শেয়ার করবে।
বিএসএফের ভেতরে পরিকল্পনা ঠিক করতে শুরু করা হলো। বিএসএফ এবং মুক্তিবাহিনী একযোগে এগোতে থাকবে। তারা পথ দেখাবে মানেকশর বাহিনীকে।
৬৪
কমান্ডার, ও বাহে কমান্ডার! আধখানা চাঁদের আলো পিছলে যাচ্ছে ধলা মিয়ার ছোট করে কাটা চুলে। তার দুচোখের মণিতে দুই টুকরো চাঁদ ফুটে আছে। কার্তিকের সবুজ ধানখেত পড়ে আছে বিস্তারিত, চরাচরজুড়ে যেন। আলপথ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে তারা অনুভব করে ভেজা ঘাসে শিশিরের আদর। ধলা মিয়ার ষোলো বছরের দেহটা ঢেকে রেখেছে একটা মলিন পিরান, চাঁদের আলোয় তার আসল রংটা বলা মুশকিল, তবে তার বোতামের যে ঠিক নাই, তা বুঝতে দিনের আলো দরকার পড়ে না। লুঙ্গিটা হাঁটুর ওপরে তোলা। তাতে চলতে সুবিধা! কোমরে একটা গামছা প্যাঁচানো।
