আবার মিলিটারি এল। পেটাতে শুরু করল নৃশংসভাবে। মুজিবুরের নাম শুনে বেল্ট দিয়ে পেটাতে পেটাতে তাকে একেবারে মাটির সঙ্গে যেন মিশিয়ে দেবে।
ইমদাদুল হক দেখতে পেলেন, রাজাকারদের মধ্যে একজন তার স্কুলের সহপাঠী।
এই ঘরের বন্দীদের একজন একজন করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল বাইরে।
ইমদাদুল তার ক্লাসমেট রাজাকারকে জিজ্ঞেস করলেন, এই, যাদের নিয়ে যাচ্ছে, কই নিয়ে যাচ্ছে।
সে জানাল, বিনের পোতা ব্রিজে নিয়ে যাবে। বেয়নেট দিয়ে পেট চিরে মেরে ফেলা হবে। রোজ ৪০ থেকে ১০০ জন দুষ্কৃতকারীকে এইভাবে মারা হয়।
ডায়মন্ড হোটেলের এই হলরুমের পাশে সারি সারি কক্ষ। এই কক্ষগুলোতে বাঙালি মেয়েদের ধরে ধরে এনে রাখা হয়েছে। রাত বাড়তে থাকলে আসতে থাকল মিলিটারিরা। মেয়েদের আর্তনাদে এই নৌকমান্ডোরা নিজেদের দুঃখ-কষ্ট ভুলে যেতে লাগলেন।
এখান থেকে তাদের তুলে দেওয়া হলো মুসলিম লীগ এমপি গফুর ও চেয়ারম্যান মজিদের হাতে। তারা তাদের বলল, তোমাদের মরতেই হবে। মরার আগে তোমাদের একটু খাওয়ানো দরকার। সাতক্ষীরা বাসস্ট্যান্ডে। বসিয়ে তাঁদের মাছ, মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ানো হলো।
গফুর বলল, দই খাও। মরার আগে দইয়ে স্বাদ ভালো পাবে।
সেখান থেকে তাদের নেওয়া হলো থানাহাজতে।
একদিন পর তাদের নেওয়া হলো খোলা মাঠে। চারজনকে বলা হলো, চারটা কবর খোড়ো। তাঁরা কবর খুঁড়লেন। এবার তাঁদের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে। বলা হলো, সত্য স্বীকার করো। তাঁরা সবাই আগের কথাই বললেন। আবার তাদের পাঠানো হলো থানায়। সাত দিন পর তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলো যশোর ক্যান্টনমেন্টে।
ব্যাঙ্গমা বলল, ১৭ সেপ্টেম্বর এঁরা চারজন যশোর ক্যান্টনমেন্ট থাইকা পালায়া যাইতে সমর্থ হইছিলেন।
ব্যাঙ্গমি বলল, রাজাকার আলবদরদের অত্যাচারের কিছুটা নমুনা এই কাহিনিতে পাওয়া গেল।
ব্যাঙ্গমা বলল, হ। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল বালুচিস্তানের কসাই টিক্কা খানের লগে দেখা করেন নুরুল আমিন, গোলাম আজম, ফরিদ আহমদ, খাজা খয়েররা। তাঁরা টিক্কা খানের বাঙালি নিধনে তাগো মনের খুশি প্রকাশ কইরা মিলিটারিগো সব ধরনের সাহায্য করনের প্রতিশ্রুতি দেন।
ব্যাঙ্গমি বলল, ৬ এপ্রিল গোলাম আজম আবার গেলেন টিক্কা খানের কাছে। সাথে গেলেন হামিদুল হক চৌধুরী, পীর মোহসিন, এ টি সাদীসহ কয়েকজন। তারা আবারও টিক্কা খানরে সাপোর্ট দিয়া আইলেন। ৯ এপ্রিল গঠন করলেন শান্তি কমিটি।
প্রথম রাজাকার বাহিনী গড়া হইল ময়মনসিংহে। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়া। মে মাসে জামায়াত নেতা ইউসুফ ৯৬ জন জামায়াত সদস্যরে নিয়া খুলনায় রাজাকার বাহিনীর সশস্ত্র বাহিনী গইড়া তুললেন। রাজাকার বাহিনীর সদস্যসংখ্যা লাখখানেক হইছিল ডিসেম্বর নাগাদ।
আবার ইসলামী ছাত্রসংঘ গইড়া তুলল আলবদর। এর প্রধান আছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। প্রধান পরামর্শক গোলাম আজম। মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে তাগো ট্রেনিং দেওয়া হইত। এইটাই ছিল তাগো হেডকোয়ার্টার। ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে এই আলবদরেরা কসাইয়ের ভূমিকা পালন করছিল।
জামায়াত বাদে অন্য ইসলামপসন্দ দলগুলা গইড়া তুলছিল আলশামস। জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার প্রাধান্য আছিল এই দলে। আরও আছিল মুজাহিদ বাহিনী। এইটা আছিল আধা সামরিক বাহিনী।
৬৩
ইন্দিরা গান্ধী এসেছেন কোচবিহারে। আগের রাতে ছিলেন শিলিগুড়িতে। ত্রিপুরায় স্বচক্ষে দেখেছেন শরণার্থীশিবির। যা দেখেছেন, তা অবর্ণনীয়। মানুষ কীভাবে যে আছে! সব শিশু উলঙ্গ, তাদের চোখ বড় বড়, বুক যেন। কঙ্কাল। পেট কৃমিতে ঠাসা। সব নারীর পরনে মলিন ছিন্ন শাড়ি। তাদের চোখমুখের হাড় বেরিয়ে এসেছে, একেকজন কাঠি হয়ে গেছেন। কোথাও সারি সারি শণে ছাওয়া ঘর, কোথাও তাঁবু। মানুষ বাস করছে বড় বড় সিমেন্টের পাইপেও। বৃষ্টি-কাদায় পুরো জায়গাটা অগম্য। এর মধ্যে ভাসছে মনুষ্যবর্জ। খাবার নাই। পানীয় জল নাই। বাথরুম নাই। তারপরও মানুষ কেন আসছে ভারতে? প্রায় ৮০ লাখ মানুষ কেন এই পশুর জীবন বেছে নিল জন্মভূমি ছেড়ে? কত অত্যাচারে পীড়িত হলে মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিতে পারে!
রাতে তার ঠিকমতো ঘুম হলো না। শিলিগুড়ির সার্কিট হাউসে পৌঁছেই তিনি বললেন, আমি তাপুরহাট মুক্তিবাহিনী প্রশিক্ষণ ক্যাম্প দেখতে যাব।
তার সিকিউরিটির লোকজন প্রমাদ গুনলেন। ব্যাপারটা ঝুঁকিপূর্ণ। তার মধ্যে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হচ্ছে দিনরাত। তাঁরা বললেন, এই বৃষ্টির মধ্যে আপনি যাবেন কী করে?
হেলিকপ্টারে নয়। প্লেনে যাব।
রাতারাতি সব ব্যবস্থা করা হলো। গোলোক মজুমদার আর ব্রিগেডিয়ার ওবেরয় জিপ গাড়ি চালিয়ে রওনা হলেন রাতের অন্ধকারে। বৃষ্টির মধ্যে সকাল সকাল হাজির হলেন তাপুরহাটে।
প্লেনে শিলিগুড়ি থেকে কোচবিহার। সেখান থেকে জিপ গাড়িতে ইন্দিরা এলেন তাপুরহাট।
একটা নালা ছিল। পাহাড়ি নালায় কলকল শব্দ তুলে স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সেটা পার হতে হবে বাশের সাঁকোয়।
গোলোক মজুমদার বললেন, ম্যাডাম, আপনি তো বোধ হয় যেতে পারবেন না। নালা তো।
ইন্দিরা বললেন, আমি সাঁকো পার হতে পারব।
ম্যাডাম, বৃষ্টি তো!
