নাম কী?
মুজিবুর রহমান!
মুজিবুর রহমান। মুজিবুর রহমানকে পাওয়া গেছে। মারো মারো। পাকিস্তানি সৈন্যরা উল্লাস করছে। বাংলা ভাষার লোকও পাওয়া যাচ্ছে। তাদের উচ্চারণ শুনেই মনে হচ্ছে তারা সাতক্ষীরারই লোক। মুজিবুর বুঝতে পারছেন। এরা রাজাকার। জামায়াতে ইসলামীর লোকজন সব রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। বাঙালিদের ওপরে অত্যাচারে তাদের তৎপরতা বেশি, আরও নিষ্ঠুর।
একপশলা বেদম প্রহার। একটুখানি দম নিচ্ছে প্রহারকারী। দুই হাতের। ওপরেই বুট। গলার মধ্যে বুট। মুখের মধ্যে বুটের লাথি।
বাবার নাম?
হাজি অহেদ আলী। মায়ের নাম ছবিরুন্নেছা।
ওই মুজিবুর রহমান। তোর বাবার নাম ইন্দিরা গান্ধী।
আবারও মার।
কী করিস?
ছাত্র। ম্যাট্রিক পাস।
কোত্থেকে আসছিস তোরা?
ভারতে চলে গেছলাম।
ভারতের কোথায়?
খিদিরপুর।
ট্রেনিং নিয়েছিস কোথায়?
ট্রেনিং নেই নাই।
দলনেতা কে? মানে বুঝি না।
ভারতে আর কে কে মুক্তিযুদ্ধে গেছে?
জানি না।
কী কী অস্ত্র নিয়ে ঢুকেছিলি?
অস্ত্র চিনি না।
গুলি করল কে?
আমরা ঘুমায়ে ছিলাম। নৌকাতে অচেনা লোক ছিল। তাদের চিনি না। ঘুম থেকে উঠে দেখি আর্মি।
ডাকা হলো ইমাম বারীকে। ছ্যাচড়াতে ঘঁাচড়াতে নিয়ে গেল পাশের ঘরে। মাটিতে চিত করে শোয়ানো হলো। একটা বুটের পাড়া পড়ল গলায়। দুইটা বুট দুই হাতের ওপরে। এরপর শুরু হলো পায়ের নিচে লোহার রড দিয়ে বাড়ি।
বল তোর নাম কী?
ইমাম বারী।
বাবার নাম কী?
আতিয়ার রহমান।
বাড়ি কই?
কাঠিয়া, সাতক্ষীরা।
পেশা?
ছাত্র।
মুক্তির ট্রেনিং কোথা থেকে নিয়েছিস?
নেইনি। আমি মুক্তিযোদ্ধা না।
মুক্তিযোদ্ধা না? গুলি করলি। আবার বলিস মুক্তিযোদ্ধা না। পায়ের নিচে মার চলছে। এরপর বুটের লাথি। চোখে-মুখে সবখানে।
তাতেই ওই এক কথা। আমি মুক্তিযোদ্ধা না। ভারতে গেছলাম। ভারত আমাদের শত্রু। তাই পলায়ে আসছি। সাতক্ষীরা বাড়ি যাব।
এবার পায়ের নিচে সুই ফোঁটানো হতে লাগল।
.
তাদের আবার পাশের ঘরে আনা হলো। চোখ খোলা। হাত বাঁধা। সবাই রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। কে কার দিকে তাকাবে।
মুজিবুর তবু তাকালেন। আফতাব আর সিরাজুল গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত পড়ে আছে। কাতরাচ্ছে।
মুজিবুরের কান্না পাচ্ছে। আফতাব তাঁর ভাইয়ের ছেলে। যদিও বয়সে তিনিই বড়। তাঁকেই সে চাচা বলে ডাকে। ছেলেটার চিকিৎসা দরকার। তাকে বাঁচানো দরকার। না হলে ভাইকে তিনি কী জবাব দেবেন?
আফতাব পানি পানি বলে কাতরকণ্ঠে মিনতি করছেন। একজন রাজাকার এসেছে। সে বলল, পানি চাস! হারামজাদা পানি চায়।
সে তার লুঙ্গি তুলল। হ্যাঁৎ ঘঁাৎ শব্দ তুলে আফতাবের মুখে পেশাব করে দিতে লাগল।
মুজিবুরের মনে হলো, এখনই এই রাজাকারটার গলা তিনি টিপে ধরেন। কিন্তু হাত বাঁধা। মেঝেতে পড়ে আছেন তিনি। অসহায়ভাবে এই অমানবিক অত্যাচার দেখতে হচ্ছে।
আফতাবকে নিয়ে গেছে বাইরে।
প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হয় আকাশ ভেঙে পড়বে। তখন ভোর চারটার মতো হবে। ঘরের কোণে একটা হারিকেন জ্বলছে।
একটু পরে দুটো গুলির শব্দ হলো। মুজিবুর পড়লেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইল্লাইহি রাজিউন।
মুজিবুর রহমানের চোখের সামনে ভাতিজা মারা গেল। মারা যায় নাই, বলতে হবে শহীদ হলো। তিনি সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এরপর তারা আহত সিরাজুলকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিল। ঘরের জানালা খুলে দিল দুই রাজাকার। তারপর এদের চারজনকেই দাঁড় করাল জানালার ধারে। বলল, দ্যাখ গাদ্দারির শাস্তি কী।
পাশেই নদী। ততক্ষণে বৃষ্টি কমে এসেছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভোরের আলোয় ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে সিরাজুল। তার ক্ষত থেকে আবার রক্ত পড়তে শুরু করেছে।
সে পড়ছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ…একজন রাজাকার গুলি করল রাইফেল থেকে। সিরাজুল পড়ে গেল।
.
ওঠো। চলো। তাদের হাত বেঁধে তোলা হলো ট্রাকে।
ট্রাকের সঙ্গেও শক্ত মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা হলো চারজনকে। চোখ বাঁধা। তাদের একটা দোতলা বাড়িতে তোলা হলো। একটা হল ঘরে ঢোকানো হলো। তাদের চোখ খুলে দেওয়া হলে তাঁরা দেখতে পেলেন, বিরাট হলঘর। ফ্যানের হুকের সঙ্গে পা বেঁধে রাখা হয়েছে ১০-১২ জনকে।
চলল আরেক প্রস্থ লাথি। প্রহার।
সন্ধ্যায় তাঁদের বের করা হলো। নিয়ে যাওয়া হলো একটা কক্ষে। সেই কক্ষটা সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালে মানচিত্র। মনে হচ্ছে একটা ড্রয়িংরুম। পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে একে একে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা।
মুজিবুর রহমান।
ইয়েস স্যার।
তোমরা কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছিলে?
স্যার ভুল করে ভারতে ঢুকে পড়ছিলাম স্যার। ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসছিলাম স্যার।
একটা লিখিত স্টেটমেন্ট নিলেন। কী ঘটেছে, লেখো। তাঁরা লিখলেন একে একে।
সাইন করলেন। তাদের ফেরত পাঠানো হলো আগের বিল্ডিংয়ে। মেলা রাত। এবার তারা বুঝতে পারলেন, এটা হলো সাতক্ষীরার হোটেল ডায়মন্ড। এটা হলো রাজাকারদের ক্যাম্প। রাজাকার বাহিনীর প্রধান জামায়াত নেতা আবদুল্লাহিল বাকি। রাজাকার কমান্ডার ইসহাক। এই ইসহাকই আফতাব আর সিরাজুলকে গুলি করে।
রাত বাড়ছে। তারা সারা দিন কিছু খাননি। আগের রাতে ধরা পড়েছেন। তারপর আর কোনো খাবার জোটেনি। শুধু জুটেছে মার।
