গেরিলাদের সঙ্গে নৌকমান্ডোদের মতের অমিল হলো। ইমাম বারী বলছেন, আমাদের ওপরে নির্দেশ হলো ভারতে ফিরে যাওয়া। স্থল গেরিলারা। ফরেস্ট অফিস আক্রমণ করে ওই অস্ত্রগুলো লুট করে নিতে চান।
ইমাম বারী সাতজন নৌকমান্ডোকে নিয়ে নৌকায় করে ভারতের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। মুজিবুর রহমানও তাঁর সঙ্গে।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, গেরিলাদের নেতা আছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন। তিনি আসলে অস্ত্র জমায়া রাখতেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য আলাদা। তিনি চাইতেছিলেন যুদ্ধ শ্যাষ হইয়া গেলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লাইগা আবার লড়াই করবেন। সর্বহারাগো লগে তার যোগাযোগ আছিল। আর খিজির আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলারা বন বিভাগের দুইটা লঞ্চ বনলক্ষ্মী আর বনহুর–বহুত মালামাল, অর্থ, রাইফেলসমেত ভারতে লইয়া গিয়া মেজর জলিলের হাতে তুইলা দেয়।
ব্যাঙ্গমি বলল, ওই দিন চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর, দাউদকান্দি ও নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরে একযোগে ২৬টা জাহাজ, লঞ্চ, গানবোট ধ্বংস হয়। এই অপারেশনটা অপারেশন জ্যাকপট নামে ইতিহাসে বিখ্যাত হইয়া আছে। নৌকমান্ডো এরপরেও আরও অনেকগুলা অপারেশন করছিল।
.
মুজিবুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এখন তারা পাকিস্তানিদের খাঁচায় বন্দী।
খলিলুর রহমান, মুজিবুর রহমান, ইমাম বারী, ইমদাদুল হক ধরা পড়ে গেছেন। ধরা পড়েছেন সাতক্ষীরা জেলার বুধটায়ে। ১৫ দিনের ঘুমহীন শ্ৰান্তিহীন পরিশ্রমে তারা নৌকায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ছইওয়ালা নৌকা। ১৮ আগস্ট রাত বারোটা পার হয়ে গেছে। ১৯ আগস্ট প্রথম প্রহর। দুটো বাজে ঘড়িতে হয়তো। বর্ষাকালের এই রাতটায় প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। একটুখানি হালকা বাতাস তাদের শরীরে আরামের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। হঠাৎ গুলির শব্দে তাঁরা জেগে উঠলেন। দেখতে পেলেন, নৌকা ঘাটে ভেড়ানো। গুলিবিদ্ধ আফতাব আর সিরাজুল ইসলাম কাতরাচ্ছেন। পাহারা দেওয়ার জন্য জেগে ছিল খুলনা পাইকগাছার মোহসীন আলী। তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিপদ দেখে সে হয়তো পানিতে নেমে পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু তার উচিত ছিল সবাইকে আগেই জাগিয়ে দেওয়া। তা হয়নি। কীভাবে কী হয়েছে, এই নৌকমান্ডোদের বোঝার মতো সময়, পরিস্থিতি এটা নয়।
ঘুমভাঙা চোখে তাঁরা তাঁদের সঙ্গে থাকা এসএমজি তুলে নিলেন। ডাঙায় চারদিক থেকে অসংখ্য টর্চলাইটের আলো তাদের ওপরে এসে পড়েছে। সেই আলো লক্ষ্য করে তারাও এসএমজির গুলি চালাতে লাগলেন। একনিশ্বাসে এক ম্যাগাজিন গুলি চালিয়ে শেষ করে ফেললেন। আরেকটা ম্যাগাজিন আছে। সেটাও চালানো হলো। আর গুলি নেই। এখন কী করবেন?
এরা পালানোর জন্য নদীতে ঝাঁপ দেবেন। কিন্তু ততক্ষণে তাদের একেবারে কাছে এসে গেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। একেবারে গানপয়েন্টে তাঁদের অবস্থান। হ্যান্ডস আপ। হাত তোলা ছাড়া এই চারজনের কোনো উপায় নেই। তারা ধরা পড়লেন।
চারজন অক্ষত, দুজন গুলিবিদ্ধ।
এই চারজনের হাত বাঁধা হলো পিঠমোড়া করে। চোখ বাঁধা হলো তাঁদেরই পরনের কাপড় খুলে। তারপর তাদের তোলা হলো গানবোটে।
কোথায় নামানো হলো, তারা বলতে পারেন না। বোঝা গেল, তাদের রাখা হয়েছে একটা অন্ধকার ঘরে।
অন্ধকারের মধ্যেই কথা বলে উঠলেন ইমাম বারী। এই দলের তিনিই কমান্ডার। ফিসফিস করে বললেন, শোনো। আমরা যদি স্বীকার করি যে আমরা নৌকমান্ডো, ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়েছি, এখন জাহাজ ডুবিয়ে ফিরছি, তাহলে সরাসরি মেরে ফেলবে। কিন্তু আমরা বলব, আমরা নিরীহ গ্রামবাসী। ভারতে গেছলাম শরণার্থী হিসাবে। কিন্তু ভারত আমাদের শত্রুদেশ। তাই পলায়ে এসেছি। আমরা সাতক্ষীরায় যার যার বাড়ি যাব।
সবাই বুঝছ?
জি।
সবাই এক কথা বলব। আর বলব, গুলি কারা করছে, আমরা জানি না। মনে হয় সাথে মুক্তি ছিল। আমরা নৌকায় উঠছি এই চারজন।
.
প্রথমে পাশের ঘরে ধাক্কা দিয়ে মারতে মারতে নেওয়া হলো খলিলুর রহমানকে।
নাম কী?
মোহাম্মদ খলিলুর রহমান।
বাড়ি কই?
ভাতশালা, দেবহাটা।
বাপের নাম?
মওলানা আয়েজউদ্দিন বিশ্বাস।
কী করিস?
আমি মাস্টারি করি। হাইস্কুলে পড়াই।
মুক্তির ট্রেনিং কই নিছিস?
নেই নাই।
শুরু হলো নির্যাতন।
মারতে মারতে প্রায় অচেতন করে ফেলল খলিলকে। চিৎকার-চেঁচামেচি।
মুজিবুর রহমান আল্লাহকে ডাকছেন। কেউ যেন কোনো কিছু স্বীকার না করে। স্বীকার করলেই মৃত্যু। যদিও নৌকমান্ডো ট্রেনিংয়ের আগেই সবার কাছে বন্ডসই নেওয়া হয়েছে। আমরা যে কাজে যাচ্ছি, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশমাতৃকাকে উদ্ধারের এই মহান কাজে নিয়োজিত হতে গিয়ে আমাদের মৃত্যু হতে পারে, আমরা শহীদ হতে পারি, এটা আমরা জানি। জেনে-শুনে বুঝে সজ্ঞানে আমরা এই কমান্ডো বাহিনীতে যোগ দিচ্ছি ও ট্রেনিং নিচ্ছি।
মুজিবুর রহমানের বয়স ১৯। তাঁদের সবারই বয়স এই রকমই। ১৮, ১৯, ২০, ২১।
মুজিবুর রহমানের কষ্ট ডাবল। কারণ, তার নিজের ভাতিজা তাঁদের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হয়ে আছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকেও এই বিল্ডিংয়ে এনেছে বলে মনে হয়। যদিও চোখ বাঁধা থাকায় সবটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।
কিন্তু আফতাবের গলা, সিরাজের গলা, ও বাবা গো, মরে গেলাম গো, একটু পানি তিনি শুনতে পেয়েছেন বলে তাঁর মনে হচ্ছে।
মুজিবুরকেও টেনে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো পাশের ঘরে।
