কেউই না ওস্তাদ।
সবাই যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত?
ইয়েস, ওস্তাদ।
ট্রেনিং মানে ভয়াবহ ট্রেনিং। মাইলের পর মাইল সাঁতার কাটো। পেটের মধ্যে মাইন বেঁধে চলো। ডুবে জাহাজের গায়ে মাইন সেট করো। সুইচ চালু করে বিস্ফোরণ ঘটাও। কিন্তু নিজে বিপদের আগেই নিরাপদ দূরত্বে চলে এসো।
প্রথম দিকে খাবার ছিল কাকরভরা ভাত, ডাল, মাছ। জুন মাসের শুরু থেকে খাবার আসতে লাগল রাজসিক। ডালডা ভাজা পরোটা, ডিম, দুধ, কমলার রস, ফল, মিষ্টি, দুবেলা মাছ, মাংস। কারণ, এদের শক্তপোক্ত হতে হবে। আর? আর এরা আর ফিরে আসবে কি না কেউ জানে না।
ভারতীয় প্রশিক্ষক সমীর দাস মাঝেমধ্যে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলোকে দেখে নিজেই কাঁদতেন। কী ভয়াবহ অপারেশনেই না এরা যাবে!
১১ জুলাই তাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে এলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন, সেনাপতি কর্নেল ওসমানী।
প্রশিক্ষণার্থী মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে ওসমানী বললেন, যুগে যুগে যুবকেরা দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। তোমাদেরও নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তাজউদ্দীন আবেগহীন মানুষ। কিন্তু তিনিও আজ বক্তৃতা দিতে গিয়ে চোখের কোনা শার্টের হাতায় মুছতে লাগলেন।
কমান্ডো যুবকেরাও সবাই ভেজা চোখ মুছতে লাগল।
.
আগস্টের ১ তারিখ থেকে কমান্ডোদের দেশের নানা স্থান টার্গেট করে পাঠানো শুরু হলো। চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর, হিরণ পয়েন্ট, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ।
মোংলা বন্দরের জন্য রওনা হলেন ৬০ জন। সাবমেরিনার আহসানউল্লাহ তাদের কমান্ডার। তাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আনা হলো খিদিরপুর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে ডায়মন্ড হারবারের অদূরে ক্যানিংয়ে। তারা শুনতে পেলেন এখানেই নাকি রবার্ট ক্লাইভ প্রথম জাহাজ ভিড়িয়েছিলেন।
৬ আগস্ট ৫টা বড় দেশি নৌকায় তাঁদের ষাটজনকে তোলা হলো। ৫টা দলে ভাগ হলেন তারা। কমান্ডোদের সঙ্গে দেওয়া হলো স্থল গেরিলাদের। পথে যদি শত্রুসেনার সামনে পড়ে যায়, তাহলে যেন তারা যুদ্ধ করতে পারে।
সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌকা চলছিল। হাল ধরতেন মুজিবুর রহমান। ঝড় এল। সবাই দোয়া পড়ছে। নৌকায় মাইন আছে। না জানি তীরে ধাক্কা লেগে সব বিস্ফোরিত হয়।
১৩ আগস্ট সকালে রেডিও ধরে বসে আছেন। আক্রমণ করার জন্য আকাশবাণী থেকে সংকেত আসবে। পঙ্কজ মল্লিকের গান : তুমি আমায় যত শুনিয়েছিলে গান। গানটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে সবার স্নায়ু শক্ত হয়ে যায়। তার মানে তারা কমান্ডো অভিযান করতে যাচ্ছেন।
১৩ আগস্ট বিকেলে মোংলার কাছাকাছি সুতারখালী গ্রামে এসে নৌকা ভেড়ালেন তাঁরা। ১৪ আগস্ট ৭ জন বের হলেন রেকি করতে। মুজিবুর রহমানের মনে আছে, তাঁরা সুন্দরবনের খালের মধ্যে বুকপানিতে হাঁটছেন। আর পাশে গোলপাতার মধ্যে একটা বাঘ তাকিয়ে তাকিয়ে তাঁদের দেখছে। তাদের হাতে অস্ত্র। বাঘকে পেছনে রেখে সেই দিকে চোখ রেখে উল্টো দিকে পানির মধ্যে হাঁটতে হয়েছিল তাদের।
.
১৫ আগস্ট সকালে আকাশবাণী থেকে বেজে উঠল দ্বিতীয় গানটি। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে–আমার পুতুল আজকে যাবে প্রথম শ্বশুরবাড়ি। দলনেতা আহসান উল্লাহ সবাইকে ডেকে শপথ করালেন :
আমরা দেশের স্বাধীনতার জন্য দরকার হলে নিজের জীবন উৎসর্গ করব। আমরা সবাই একই মায়ের সন্তান, বাংলা মা, কেউ কারও সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব না। শত্রুভয়ে ভীত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত হব না। যুদ্ধ শেষে সবার সঙ্গে দেখা হবে না, কিন্তু কারও মৃত্যু ঘটলেই আদর্শচ্যুত হব না। সবার চোখে পানি। সবাই সবার সঙ্গে বুক মেলালেন।
সারা দিন ধরে মাইনগুলো প্রস্তুত করা হলো।
সন্ধ্যার সময় সবাই খাওয়া সেরে নিল। নিজ নিজ ফিনস, ড্যাগার, সুইমিং কস্টিউম, পলিথিনে মোড়ানো দেশলাই নিলেন। শরীরে প্রচুর পরিমাণে শর্ষের তেল মাখলেন। রাত দুইটায় জোয়ার শুরু হবে। তখন রওনা হতে হবে। তারা নৌকায় ওঠেন। বানিয়া শান্তা পতিতাপল্লির কাছে গিয়ে উঠলেন যখন, তখন ভোর হয়ে গেছে। কমান্ডোরা প্রায় সবাই সম্পূর্ণ উলঙ্গ। তাদের হাতে অস্ত্র। তাদের দেখে পতিতাপল্লির মেয়েরা চিৎকার করতে শুরু করলে গেরিলাদলের নেতা আফজাল ও আনোয়ার তাদের বোঝান যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তোমরা চুপ করে থাকো। কোনো কথা বলবে না।
এবার জাহাজের উদ্দেশে পানিতে নেমে পড়লেন নৌকমান্ডোরা।
ছয়টা জাহাজ। প্রতিটাতে যাবেন আটজন করে। ৪৮ জন যাবেন।
এঁরা পানিতে নেমেছেন। প্রবল স্রোত। কচুরিপানার আড়ালে চলেছেন তাঁরা। ওই যে আসছে পাকিস্তানি মিলিটারির গানবোট। তারা ডুবে নিজেদের আড়াল করছেন। তারপর ঠিকই ছয়টা জাহাজের নিচে নেমে ড্যাগার দিয়ে শেওলা পরিষ্কার করে মাইন পেতে ফিউজ জ্বালিয়ে তারা ফিরে আসতে থাকলেন তীরে। সকাল ছয়টায় একটার পর একটা জাহাজের নিচে মাইন বিস্ফোরিত হতে লাগল। আগুন জ্বলে উঠল। জাহাজগুলো তলিয়ে যেতে লাগল। নাবিকেরা এসওএস সংকেত দিতে লাগলেন। পাকিস্তানি গানবোট ছুটে আসতে লাগল। তীরে থাকা স্থলমুক্তিযোদ্ধারা একযোগে এলএমজির গুলি ছুঁড়তে লাগলেন। তারপর তারা নৌকায় উঠে পূর্বনির্ধারিত কামারখোলা স্কুলে উপস্থিত হলেন। দুজন কেবল নৌকায় আসতে পারেননি। গ্রামবাসীর সহযোগিতায় তারাও এসে উপস্থিত হলেন।
