মন্ত্রিসভা একটা উপদেষ্টা কমিটি করতে রাজি হলো।
ডি পি ধর বিদায় নেওয়ার পর ক্যাপ্টেন মনসুর আলী বললেন, ভাত খাওয়ার জন্য একটা মাটির সানকি পাওয়া গেছে। এখন নিজেরা ঝগড়া করে এই সানকিটা ভাঙার কোনো মানে হয় না। ভারত সরকার চাইছে, আমরা একটা জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করতেই পারি।
বাকিরাও রাজি হলেন।
৬১
মওলানা ভাসানী দেরাদুনের সার্কিট হাউসে। তাঁকে দেখাশোনা করেন ব্রিগেডিয়ার লবরাজ। তাঁর স্ত্রী জয়া লবরাজ। বিদুষী, চটপটে, হাসিখুশি। আর আছেন সাইফুল।
ভাসানী সকালের নাশতার টেবিলে বললেন, স্বাধীনতাসংগ্রাম যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, ততই মঙ্গল।
জয়া বললেন, সেকি কথা দাদু। স্বাধীনতাসংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী হওয়া মানে আরও বেশি মানুষের মৃত্যু, বেশি মানুষ উদ্বাস্তু, বেশি বাড়িঘর পুড়ে যাওয়া, বেশি কষ্ট, বেশি অশ্রু।
ভাসানী হাসলেন।
না দাদু, হাসলে চলবে না। বলুন। ব্যাপারটা কী?
ভাসানী বললেন, বেশি যুদ্ধ মানে বেশি কষ্ট। বাংলার প্রত্যেক ঘরে অন্তত একজন মারা যাউক। তাহলে মানুষ বুইঝবে স্বাধীনতার মূল্য। তখন স্বাধীনতা পাইলে সেইটারে মুক্তিতে রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করব। তা না হইলে মানুষ সোনা হইব না। না পুড়লে মানুষ খাঁটি হয় না।
কলকাতা থেকে নির্দেশ এসেছে মওলানা ভাসানীকে কলকাতা নিয়ে যেতে হবে। বিমানে চড়ে তিনি গেলেন কলকাতা। তাঁকে তোলা হলো হাজরা স্ট্রিটের একটি বাড়িতে। তারপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের বাড়িতে। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১।
সেখানে গিয়ে ভাসানী খুশি। দেখা পেলেন মণি সিংহের। মোজাফফর আহমদের। মণি সিংহ জানালেন, তিনি ছিলেন যশোর কারাগারে। এপ্রিলে যশোর মুক্ত হলে কারাগারের বন্দীরা জেলারকে বলেন, আমাদের ছেড়ে দিন।
জেলার বলেন, আমি ছাড়তে পারব না। কারাগার ভেঙে পালিয়ে যেতে পারলে যান।
তখন বন্দীরা পেছনের একটা গেট ভেঙে ফেলে। সেই ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে মণি সিংহ হাঁটতে হাঁটতে নদীতীরে যান। নৌকায় উঠে চলে আসেন পশ্চিম বাংলায়।
তাজউদ্দীন বললেন, আমরা একটা পরামর্শ কমিটি গড়তে চাই। পাঁচটি দল থাকুক। আওয়ামী লীগ, দুই ন্যাপ, সিপিবি, বাংলাদেশ কংগ্রেস। হুজুর, আপনি এই উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি।
খাবারদাবার ভালো দেওয়া হলো। মওলানা ভাসানী তিন ঘণ্টার বক্তৃতা দিলেন। কতগুলো প্রস্তাব পাস হলো। এর মধ্যে আছে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন বন্ধ করা, জাতিসংঘের মাধ্যমে তার মুক্তির ব্যবস্থা করা, মুজিবনগর সরকারের প্রতি পূর্ণ আস্থা, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বিশ্বের সব দেশকে আহ্বান, ভারত সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন, বাংলাদেশের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া আর কিছুই গ্রহণযোগ্য নয় বলে অভিমত প্রকাশ।
ফটোগ্রাফার রেডি ছিল। ছবি তুলল। সেই ছবি হয়ে উঠল এক মূল্যবান দলিল। দিল্লিতে ছবি পাঠানো হলো, পাঠানো হলো রুশদের কাছে।
৬২
১৪ মে থেকে মুর্শিদাবাদের পলাশীতে নৌকমান্ডোদের ট্রেনিং শুরু হয়েছিল। মুজিবুর তার আগেই যশোরে যুদ্ধ করেন। প্রতিরোধযুদ্ধ। যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে যান। যশোরের পতন হলে তিনি আর আফতাব সীমানা পেরিয়ে চলে যান বনগাঁ। ৫ নম্বর টালিখোলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোগ দিলেন। ১২ মে কর্নেল ওসমানী এলেন, এলেন নৌবাহিনীর গাজী রহমতউল্লাহ, ভারতীয় নৌবাহিনীর সমীর কুমার দাস। ৪০০ জন যুবককে লাইন করে দাঁড় করানো হলো। ৪৫ জন টিকে গেল নৌকমান্ডোতে যোগ দেওয়ার জন্য। একটা মিলিটারি ট্রাকে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো মুর্শিদাবাদে। সেখানে মিলিটারি ক্যাম্পে রাত কাটিয়ে পরদিন তাঁরা গেলেন পলাশীতে।
পলাশী নামটা শুনেই মুজিবুর রহমানের সিরাজউদ্দৌলার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। মনে পড়ে গিয়েছিল পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের সঙ্গে নবাব সিরাজউদ্দৌলার যুদ্ধের কথা। সবাই বলে, তিনিও বলেন, এক আমবাগানে স্বাধীনতার সূর্য ডুবে গিয়েছিল, মেহেরপুরের মুজিবনগরের আরেক আমবাগানে স্বাধীনতার সূর্য আবার উদিত হয়েছে।
পাশেই ভাগীরথী নদী। সেই নদীতে শুরু হলো তাদের ট্রেনিং। তাঁদেরটা হলো ১০ নম্বর সেক্টর। সেক্টর অধিনায়ক কর্নেল ওসমানী স্বয়ং। ফ্রান্সের তুল পোতাশ্রয়ে পাকিস্তানের সাবমেরিন ম্যানগ্রোতে কয়েকজন বাঙালি নাবিক ছিলেন। তাঁদের আটজন অনেক কষ্ট করে পালিয়ে স্পেন, সুইজারল্যান্ড হয়ে ভারতে চলে এসেছেন বাংলাদেশের হয়ে যুদ্ধ করবেন বলে। আর আছেন পূর্ব পাকিস্তানে পোস্টিং হওয়া নৌবাহিনীর সদস্যরা। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। বিভিন্ন যুবশিবির থেকে বাছাই করে আনা ছাত্র-যুবারা। সব মিলিয়ে ৪১৫ জন ট্রেনিং নিচ্ছে। ১৩ মে উদ্বোধন হলো ট্রেনিং। প্রথম নৌ কমান্ডো ট্রেনিং ক্যাম্পের নাম সি-২ পি। তাদের প্রথম দিনেই বলা হলো, এটা সুইসাইডাল স্কোয়াড।
তাদের ট্রেনিং ক্যাম্পটা নির্জন এলাকায়। চারদিকে কোনো জনবসতি নেই। শুধু গাছ আর গাছ। তারই মধ্যখানে একটা জায়গা পরিষ্কার করে বানানো হলো তাদের ক্যাম্প। তাঁবু গেড়ে তৈরি সেই ক্যাম্প দুদিন পর প্রচণ্ড ঝড় নিল উড়িয়ে। ট্রেইনাররা পরের দিন এসে বললেন, ঝড়ে কে কে যুদ্ধ করতে যাওয়ার মনোবল হারিয়ে ফেলেছ?
