.
মন্ত্রিপরিষদের সবাই কাইয়ুমকে বললেন, আপনি এই লিয়াজোঁ এগিয়ে নিয়ে যান।
শুধু তাজউদ্দীন আহমদ বিষণ্ণ এবং ভেতরে-ভেতরে বিধ্বস্ত। আমেরিকা যার বন্ধু তার শত্রুর দরকার পড়ে না। আমেরিকার সাহায্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে হবে কেন?
জহিরুল কাইয়ুম ও মোশতাক মন্ত্রিপরিষদের কাছে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট গোপন রাখলেন :
১. মোশতাক নিজে হোসেন আলীকে দিয়ে এবং চাষীর মাধ্যমে আমেরিকান কনসুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
২. মোশতাক এ কথা বলছেন যে শেখ মুজিবের মুক্তির বিনিময়ে। তারা স্বাধীনতার চেয়ে কম কিছু পেলেও স্বাধীনতাসংগ্রাম ত্যাগ করতে রাজি আছেন।
৩. বাগেরহাট এলাকা থেকে নির্বাচিত এমএনএ নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ইসলামাবাদ চলে গেছেন। তা-ও ঢাকা দিয়ে। তিনি ইসলামাবাদে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডের সঙ্গে মিটিং করেছেন। ফারল্যান্ড সারা দিন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গেই থাকেন। তাঁরা এক বৈঠকে দুজনে মিলে এক বোতল হুইস্কি সাবাড় করেন। ফারল্যান্ড ইয়াহিয়া খানকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমেরিকার কথা হচ্ছে। ইয়াহিয়া খান রাজি থাকলে তারা একটা আপস-মীমাংসায় আসতে পারেন। শুধু শেখ মুজিবকে হত্যা করে ফেলো না।
মন্ত্রিপরিষদ এই কথাগুলো যেহেতু জানে না, তারা জহিরুল কাইয়ুমকে সাধুবাদই জানাল।
মোশতাক আমেরিকানদের জানালেন যে ইয়াহিয়া তার ভালো বন্ধু। তাঁর সঙ্গে বসতে তার কোনো অসুবিধা নেই।
শুনে ইয়াহিয়া জানালেন যে মোশতাক ভালো লোক। তাঁর সঙ্গে বসতেও ইয়াহিয়ার কোনো আপত্তি নেই।
কিন্তু ভারত কথাটা জেনে গেল। ওয়াশিংটনের ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জন আরউইন জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি কথা হচ্ছে। ওয়াশিংটন মধ্যস্থতা করছে। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক হতে পারে। ইয়াহিয়া খানও রাজি। বাংলাদেশ স্বাধীনতার চেয়ে কম কিছু পেলেও সমঝোতা করতে রাজি। দিল্লি ব্যাপারটা তাজউদ্দীনকে জানাল। ভারতীয় গোয়েন্দারাও জহিরুল কাইয়ুম এবং মোশতাকের ওপরে নজর রাখল। মোশতাককে ভারতীয় কর্তা জিজ্ঞেস করলেন, ঘটনা সত্য কি না। মোশতাক সরাসরি অসত্য বললেন যে এ ধরনের কোনো কথা হয়নি।
২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনসংলগ্ন মাহমুদ আলীর বাড়িতে মোশতাক আমেরিকান পলিটিক্যাল অফিসার জর্জ গ্রিফিনের সঙ্গে রাতের বেলা ৯০ মিনিট বৈঠক করেন। মোশতাক বললেন, আমি কমিউনিজমবিরোধী। আমার কমিউনিস্টদের প্রতি কোনো দুর্বলতা নাই। কিন্তু আপনারা কী করছেন? আপনারা ইয়াহিয়া খানকে সাহায্য করছেন কেন? তাদের সাহায্য করা বন্ধ করুন। আপনাদের অস্ত্র দিয়ে তারা বাংলার মানুষকে মারছে, এটা বন্ধ করুন। এবার মোশতাক মন্ত্রিপরিষদের কাছ থেকে পাওয়া দাবিগুলো উপস্থাপন করলেন :
১. বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা।
২. শেখ মুজিবের মুক্তি।
৩. স্বাধীনতার পর পুনর্গঠনের জন্য আমেরিকান সাহায্য।
৪. স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন।
৫. বাংলাদেশের নেতাদের কাছে দেশ ফিরিয়ে দেওয়া।
৬. প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনা।
৭. হাইকমিশনারের মাধ্যমে পলিটিক্যাল অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হবে একমাত্র মাধ্যম।
মোশতাক সতর্ক করে দিলেন, আমেরিকা যদি এটা করতে না পারে, তাহলে যুদ্ধ চলবে। রুশরা এগিয়ে আসবে। বাংলাদেশ বামপন্থীদের হাতে চলে যাবে।
কিসিঞ্জারের কাছে এই আলোচনার প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কিসিঞ্জার দেখলেন, এরা চায় পূর্ণ স্বাধীনতা আর ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনা। ইয়াহিয়া খান বারবার করে বলেছেন, মুজিবের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়। রাষ্ট্রদ্রোহীর সঙ্গে কিসের আলোচনা! তার মানে এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে না। কিসিঞ্জার পরবর্তীকালে লিখবেন, এই উদ্যোগ এখানেই শুকিয়ে যায়।
কিন্তু আমেরিকা ক্রমাগতভাবে পরামর্শ দিতে থাকে, ইয়াহিয়া খান যেন পূর্ব বাংলায় সামরিক অভিযান বন্ধ করে পরিবেশ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। তারই অংশ হিসেবে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করবেন বাঙালি আবদুল মোত্তালিব মালিককে। টিক্কা খানকে সরিয়ে দেবেন। সে আরও পরের কথা।
