.
ব্যাঙ্গমা বলবে, এই মুজিববাহিনী থাইকাই পড়ে জাসদ হইব। মণি আর সিরাজ আলাদা হইয়া যাইব। এইভাবে মুজিবের অনুগত বাহিনী গড়তে গিয়া নিজের অজান্তে অথবা সজ্ঞানে ভারতীয়রা মুজিববিরোধী বাহিনী গইড়া তুলছিল। সে আরও এক বছর পরের কথা।
জেনারেল উবান পরে একখান বই লেখছিলেন- ফ্যান্টম অব চিটাগাং। তাতে আরও দুইজনের কথা তিনি বিশেষভাবে লেখেন। একজন হইলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আর একজন। হইলেন কিশোর শেখ জামাল। সৈয়দ আশরাফ কোনো দিনও যুদ্ধের সময় কলকাতায় তার বাবা-মার সঙ্গে দেখা করেন নাই। তার কথা আছিল, আমি যুদ্ধ করতে আইছি, ফ্যামিলি ট্রিপ করতে আসি নাই। তিনি যুদ্ধের ময়দানেই আছিলেন। আর শেখ জামালও ট্রেনিং শেষ কইরা যুদ্ধ করতে চইলা যান। বর্ডারে। মাঝেমধ্যে তিনি তাঁর আব্বার কথা মনে কইরা, মায়ের কথা মনে কইরা কানতেন।
অহন আসো ১৬ আগস্ট ১৯৭১-এ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার। বৈঠকে–ব্যাঙ্গমা ঠোঁট নাড়ে।
ব্যাঙ্গমি বলে, হ। এইখানে কাজী জহিরুল কাইয়ুম কইব তার আমেরিকা কানেকশন ওপেনের কথা।
ব্যাঙ্গমা বলে, তার আগে মোশতাকের কথাটা পাইড়া লও।
খন্দকার মোশতাক ১৯১৮ সালে কুমিল্লায় জন্ম নেন। বঙ্গবন্ধুর চায়া দুই বছরের বড় আছিলেন। নিজেরে মনে করতেন শিক্ষিত, যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থাইকা বিএল ডিগ্রির বেশি কোনো ডিগ্রি আছিল না।
ব্যাঙ্গমি বলে, চিরটাকাল তিনি মনে করতেন শেখ মুজিব অশিক্ষিত, আর তাঁর নিজের যোগ্যতা শেখ মুজিবের চায়া বেশি। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের সময় জেলে থাইকাই মুজিব যুগ্ম সম্পাদক হইছিলেন, এইটা মোশতাক মাইনা নিতে পারেন নাই। তিনি প্রকাশ্যে নিজেরে কমিউনিজমবিরোধী আমেরিকার লাইনের লোক বইলা দাবি করতেন। তার বেশভূষা, চালচলন কথাবার্তা আছিল পাকিস্তানের মূর্ত প্রতিচ্ছবি। শেখ সাহেবের সামনে তিনি হাত কচলাইতেন, ত্যালের ডিব্বা উজাড় কইরা দিতেন। আড়ালে আড়ালে তারে ঈর্ষা করতেন, তাঁর বিরুদ্ধে কথা কইতেন। ষড়যন্ত্র করতেন। তাজউদ্দীন আছিল তাঁর দুই চোখের বিষ। তাজউদ্দীন শার্ট প্যান্ট পরেন, সমাজতন্ত্ররে নিজের আদর্শ বইলা প্রচার করেন, অসাম্প্রদায়িকতার মন্ত্র বুকে ধারণ করেন, এইটা তার আরও অসহ্য লাগত।
ব্যাঙ্গমা বলে, আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে আর সৈয়দ নজরুলসহ সবার চাইতে বয়সে বড় হিসেবে তিনি ভাবতেন, প্রধানমন্ত্রী কি প্রেসিডেন্ট হওনের তিনিই সবচায়া বড় দাবিদার। তাজউদ্দীনের প্রধানমন্ত্রিত্ব তিনি মানতেই পারতেন না। তাজউদ্দীন দ্যাশ স্বাধীন কইরা ফেলব, এইটা তিনি কেমনে মানেন! আর তাজউদ্দীনের প্ল্যানটা কী? তাজউদ্দীন মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিংয়ে বাম দলগুলানরে জায়গা দিতাছেন। অহন হিন্দুস্তান-সোভিয়েত চুক্তিরে তিনি যহন সন্দেহের চোখে দেখতাছেন, তখন তাজউদ্দীন সেইটারে স্বাগত জানায়া পাল্টা বিবৃতি দিতাছেন। মানেটা হইল, ইন্ডিয়া-সোভিয়েত ইউনিয়ন মিইলা যুদ্ধ কইরা পাকিস্তানরে হারায়া দিব। এইটা হইলে বাংলাদেশ রুশ-ভারত অক্ষশক্তিতে ঢুইকা যাইব। আর দ্যাশ স্বাধীন হইলে তাজউদ্দীনের ক্ষমতা পাকাপোক্ত। তার বদলে মোশতাকে চক্রান্ত করলেন, আমেরিকার লগে লাইন বাইর করার। আমেরিকা মধ্যস্থতা করুক, ইয়াহিয়া খান-শেখ মুজিব বৈঠক করুক, ছয় দফার আলোকে একটা কনফেডারেশন হউক, পাকিস্তানি মিলিটারি সইরা যাক, তাইলে তো আর তাজউদ্দীনের এই খবরদারি চোখের সামনে দেখা লাগে না। এই জন্য তিনি ডেসপারেট হইয়া এরে জিগান, ওরে জিগান, আমেরিকার লগে লাইন দেওন যায় ক্যামনে। টাইম ম্যাগাজিনের সাংবাদিকরেও একই কথা কইলেন। টাইম-এর সাংবাদিক কইল, কলিকাতাতেই তো আমেরিকার উপদূতাবাস আছে। তাগো সাথে ডাইরেক্ট যোগাযোগ করলেই তো হয়। মোশতাক বসতেন বাংলাদেশ হাইকমিশনেই। হোসেন আলীরে কইলেন, লাইন লাগাও। মাহবুবুল আলম চাষী তার সচিব। ব্লু আয়েড বয় বইলা সবাই তারে পাত্তা দিত। পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে আছিলেন। ওয়াশিংটনে পোস্টিং আছিল। তারপর কুমিল্লায় স্বনির্ভর আন্দোলন করতেন। নিজের নামের লগে চাষী তিনি নিজেই লাগায়া নিছেন। সেইখান থাইকা মোশতাক তারে আইনা পররাষ্ট্রসচিব বানাইছেন। আমেরিকা কানেকশন তার আগে থাইকাই আছে।
এই অবস্থায় মোশতাক কথা কইতেছিলেন কুমিল্লার এমএনএ কাজী জহিরুল কাইয়ুমের লগে। জহিরুল কাইয়ুম কলকাতার আমেরিকান কনসুলেটে গেলেন। কী হইল তিনি জানাইতাছেন মন্ত্রিসভারে।
কাইয়ুম কইলেন, আমি প্রথমে গেছি কনসুলেটে। তারা আমার সব খবরই রাখে। আমারে খুব ভালো চিনল। আমি তাগো বললাম, দ্যাখো, শেখ সাহেবরে তোমরা আটক করছ। এখন তোমরা তারে রাখছ পাকিস্তানে আটকায়া। আগে কও তোমরা, তিনি বাঁইচা আছেন, না তারে মাইরা ফেলছ?
তারা জানাইল, তিনি বাইচা আছেন। এরপর আমি তাদের বললাম, দ্যাখো, আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দল। যারা আমেরিকাবিরোধী ছিল, তারা ন্যাপ কইরা আলাদা হইছে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। শেখ সাহেবও আমেরিকার লাইনেই বেশি আস্থা রাখেন। তোমরা তারে ছাড়ো। তিনি জেল থাইকা বাইরায়া ইয়াহিয়া খানের লগে বসবেন। আর মধ্যস্থতা করবেন নিক্সন। দশ মিনিটে সব সমস্যার সমাধান।
