হাকসার এবং কাও দুজনেই নীরব থেকে গেলেন। সৈয়দ নজরুলও আর কথা বাড়ালেন না। তাজউদ্দীন বুদ্ধিমান লোক। তিনি বুঝতে পারলেন, এই সিদ্ধান্ত অতি উচ্চ পর্যায় থেকে নেওয়া হয়েছে। তার মানে স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদন আছে।
.
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে কথা বলে। তারা যা বলে, তার মর্মার্থ হলো :
বঙ্গবন্ধু মার্চের কোনো একদিনে তাজউদ্দীন, শেখ ফজুলল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক আর সিরাজুল আলম খানকে বাড়ির ভিড়ের ভেতর থেকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে যান তার পড়ার ঘরে। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলেন, আলোচনা চলছে, কিন্তু আলোচনা ফেইল করতে পারে। আমাদের সেকেন্ড অপশন ওপেন রাখতে হবে। কলকাতায়। আমার লোক রাখা আছে। বহু বছর হলো সে সেখানে আছে। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার কন্ট্যাক্ট আছে। নামটা মনে রাখো, চিত্তরঞ্জন সুতার। বরিশালের আওয়ামী লীগ নেতা। চিনতে পারছ অনেকেই। কোথাও লিখতে পারবা না, মুখস্থ রাখো। ভবানীপুর ২৬ প্রসাদ রোড। যদি আমাদের উপরে হামলা হয়, মিলিটারি রুল চালানোর চেষ্টা করে, তাজউদ্দীনসহ তোমরা ৫ জন কলকাতা চলে যাবা। চিত্তরঞ্জন সুতারের সাথে যোগাযোগ করবা। বাকিটা সে তোমাদেরকে করে দিবে। তাজউদ্দীন পারবে। কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু এবার আর আপস করা যাবে না।
এই কথা অনুসারে চার যুবনেতা কলকাতায় এসে ২৬ প্রসাদ রোডে যান এবং চিত্ত সুতারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলাম এই বাড়ি খুঁজে পাননি। এর কারণ হলো, রাস্তাটার নাম আসলে রাজেন্দ্র প্রসাদ রোড। ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের নাম অনুসারে। আর চিত্তরঞ্জন সুতার এই বাড়িতে থাকতেন ভুজঙ্গভূষণ রায় নামে। নাম পাল্টিয়ে। তাজউদ্দীন কলকাতা এসে তাদের বিএসএফের তত্ত্বাবধায়ক সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে এই নাম এবং ঠিকানা বলেন এবং সেখানে যেতে চান। তারা টেলিফোন ডিরেক্টরি ঘেঁটে এই রোডও খুঁজে পাননি, এই নামেরও কাউকে পাননি। এর মধ্যে দিল্লির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলে তারা দিল্লি চলে যান।
যুবনেতারা এই প্রপার চ্যানেলে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে ইন্দিরা গান্ধী র-এর ওপরে দায়িত্ব দেন এই যুবনেতাদের চাহিদামাফিক ব্যবস্থা নিতে। ভারতীয়দের বিবেচনায় থাকে :
১. সব ডিম এক পাত্রে রাখতে নাই। কোনো কারণে তাজউদ্দীনের সরকার ব্যর্থ হলে এই যুবনেতারা এবং তাদের লাখো অনুসারী যেন বিকল্প নেতৃত্ব ও সংগ্রাম সংঘটিত করতে পারে।
২. ওই সময় দিল্লি সরকারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল নকশালবাড়ি আন্দোলন নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গ এবং সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র কার্যক্রম চলছিল। ভারত সরকার অত্যন্ত কঠোরহস্তে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করে সেই বিদ্রোহীদের দমন করছে। পুরো ঘটনাটা ঘটাচ্ছিল চীন। ভারতে এই স্লোগান প্রকাশ্যে দেওয়া হচ্ছিল, চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। চীনে কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে এই বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিরা ডেলিগেট হিসেবে উপস্থিত ছিল। এদের অস্ত্র, অর্থ এবং নির্দেশনা আসত চীন। থেকে। এখন বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র দিলে তা। যে বামপন্থী ভারতীয় পিকিংপন্থী বিদ্রোহী কিংবা নাগা বা মিজো গেরিলাদের হাতে চলে যাবে না, এই নিশ্চয়তা কী?
৩. বাংলাদেশেও চীনা বিপ্লবী সশস্ত্র দলগুলো সক্রিয় আছে। তারা স্বাধীনতা আন্দোলন সংগ্রামকে দুই কুকুরের লড়াই হিসেবে অভিহিত করে ভারতের সম্প্রসারণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আর স্বাধীনতাসংগ্রাম যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এই সংগ্রাম বামপন্থীদের হাতে চলে যেতে পারে। ভারতের পাশের একটা দেশ চীনা বিপ্লবীদের খপ্পরে পড়লে বা স্থায়ী নৈরাজ্যের কবলে পড়ে গেলে তার কুফল ভারতও ভোগ করতে থাকবে।
চার যুবনেতাকে নিয়ে ভারতীয়রা ব্যাপক গবেষণা করে। মেজর জেনারেল সুজন সিং উবানকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এই চার নেতার সঙ্গে কাজ করার। তিনি ছিলেন স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের ইন্সপেক্টর জেনারেল।
শেখ ফজলুল হক মণির লক্ষ্য ছিল বামপন্থার বিপদ থেকে মুজিববাহিনীকে রক্ষা করা। কিন্তু সিরাজুল আলম খানের ছিল নিজস্ব প্ল্যান। তিনি চেয়েছিলেন মুজিববাহিনীকে সমাজতন্ত্রের সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে। যাতে স্বাধীনতার সংগ্রাম আর সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম পাশাপাশি চলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশকে সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তোফায়েল আহমেদ সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন কিন্তু এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান শক্ত ছিল না। ডাকসুর ভিপি হিসেবে দেশজোড়া ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল। তিনি যখন যুবশিবিরে যোদ্ধা রিকুটের জন্য যেতেন, তখন সবাই সব শৃঙখলা ভেঙে তাকে দেখতে ছুটে আসত। রাজ্জাক ছিলেন সমাজতন্ত্রের আদর্শে অনুগত। কিন্তু এঁদের প্রত্যেকের রক্তের মধ্যে ছিল একটা অচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য, এঁরা প্রত্যেকেই বঙ্গবন্ধুর অন্ধভক্ত, এঁদের আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। বামপন্থীদের হাত থেকে মুক্তিযুদ্ধকে রক্ষা করতে গিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের অজান্তেই বামপন্থীদের হাতেই বিএলএফ তথা মুজিববাহিনীকে তুলে দিয়েছিলেন। বাস্তবে সিরাজুল আলম খান সব ট্রেইনার নিযুক্ত করেছিলেন তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাদের, যারা ক্যাম্পে ক্যাম্পে ছেলেদের সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে মাতোয়ারা করে দিতে চাইতেন।
