মণি ভাইদের বিরোধিতাটা কি ব্যক্তিগত? মুকুল প্রশ্ন করলেন।
আমির বললেন, না। ব্যক্তিগত খানিকটা থাকতে পারে। বঙ্গবন্ধুর। ভাগনে। তাই তিনি ভাবতে পারেন, বঙ্গবন্ধুর পর উত্তরসূরি তিনিই হবেন। কিন্তু সেটা বড় না। আসল পার্থক্য মতের। দৃষ্টিভঙ্গির। তাজউদ্দীন দেশ স্বাধীনের মিশনটা দ্রুত করতে চান। তিনি চান ইন্ডিয়া স্বীকৃতি দিক। চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হোক। মণি ভাই চান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হোক। বাংলার গ্রামে গ্রামে তিনি লাখ লাখ ক্যাডার তৈরি করবেন। তারা মুজিববাদে দীক্ষিত হবে। তখন তাদের দিয়া নতুন দিনের নতুন সমাজ গড়া যাবে। এর মধ্যে সিরাজুল আলম খান চায়, এদেরকে সমাজতন্ত্রের বিপ্লবী ক্যাডার করে তুলতে।
একদিন বাংলার বাণীতে তাজউদ্দীন আহমদের খবর আর ছবি দিয়ে প্রথম পাতা সাজানো হলো। শেখ মণি আমিরকে ডেকে বললেন, কাগজটা কি আমার নাকি তাজউদ্দীনের?
আমির শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা দুপুরে নিজের ডেস্কে বসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য সম্পাদকীয় লিখছিলেন। তাঁর সামনে এসে বসেছে এক তরুণ। তাকে ভয়াবহ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। চুল এলোমেলো। চোখ গর্তে বসা। গায়ের কাপড়চোপড় ধূলিধূসরিত। সে বলল, আমার নাম ফজলার রহমান। আমি মাদারীপুর থেকে এসেছি। ছাত্রলীগ করি।
বসো।
আমার খুব খিদে পেয়েছে। একটু খাবারদাবার হবে?
বসো। আমি খাবার আনাচ্ছি।
তিনি অফিসের সহকারীকে দিয়ে খাবার আনালেন। ভাত, ডাল, সবজি। ছেলেটা বাথরুম থেকে হাত-পা ধুয়ে এসে গোগ্রাসে খেতে লাগল। আমির তার খাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটু ভাত-ডালও যে মানুষ কত যত্ন করে, কত আগ্রহভরে খেতে পারে!
খাওয়ার পর বোধ করি একটু শক্তি ফিরে পেল। বলল, আমার ভাইকে মিলিটারিরা খুন করেছে। আমি প্রতিশোধ নেব। যুদ্ধে যাব বলে এসেছি। বনগা শিবিরে উঠেছি। ওখানে খাবারদাবারের কষ্ট। তা হোক। কিন্তু ট্রেনিংয়ে তো পাঠাচ্ছে না। আপনি ব্যবস্থা করে দেন। তাড়াতাড়ি ট্রেনিং দরকার। আপনি বলে দেন যেন ট্রেনিংয়ে পাঠায়।
তোমার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা হবে। তুমি বনগা ক্যাম্পে ফিরে যাও। আমি বলে দেব। তোমাকে নেক্সট ব্যাচেই নিয়ে নেবে।
ফজলার রহমানকে বনগা ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন আমির।
৫৯
থিয়েটার রোডের মুজিবনগর সরকার কার্যালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রিসভার বৈঠক বসেছে। এই গরমের মধ্যে তাজউদ্দীনের পোশাক যথারীতি হাফহাতা শার্ট আর ফুলপ্যান্ট, সৈয়দ নজরুল, মনসুর আলী, কামারুজ্জামান সাহেবের সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা আর খন্দকার মোশতাকের আচকান। মাথায় টুপি। মোশতাক সাহেবের বিশেষ অনুরোধেই আজকের বৈঠক।
এর মধ্যে সুন্দর ফুলহাতা শার্ট, ইস্তিরি করা প্যান্ট আর ঝকঝকে জুতা পরে এসেছেন কাজী জহিরুল কাইয়ুম।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম আর তাজউদ্দীন দিল্লি থেকে ঘুরে এসেছেন।
তাজউদ্দীনের মনটা বেশ খারাপ। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথম আলাপ খুব ভালো হয়েছে। মাঝখানের আলাপটা চিন্তায় ফেলেছে। শেষের আলাপটা তাকে মুষড়ে দিয়েছে।
সৈয়দ নজরুল ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি আলাপ শুরু করলেন। বললেন, আমরা সভার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করি। আপনাদের একটু জানিয়ে রাখি, দিল্লিতে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আমাদের আলাপ ভালো হয়েছে। তিনি খুবই ভালো মুডে ছিলেন। তিনি মনে করছেন, ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি বেশ একটা ভরসার জায়গা তৈরি করেছে। তিনি এখন তৃতীয় কোনো দেশের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থানে আছেন। তারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ের গতি বাড়ানো, আমাদের চাহিদা মোতাবেক অস্ত্র দেওয়ার প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়েছেন।
তাজউদ্দীন আহমদের মনটা খচখচ করে উঠল। এটা ঠিক, ভারতের নীতিনির্ধারকেরা ভারত-সোভিয়েত চুক্তির পর আর পেছনের দিকে নয়, সামনের দিকে তাকাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, শীতের আগেই সমস্যার সমাধান করতে যা কিছু করণীয় তারা করতে পারবেন। কিন্তু তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছে একটা সংবাদ। তা হলো, পি এন হাকসার অবসরে যাচ্ছেন। তার জায়গায় আসছেন ডি পি ধর। হাকসারের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের বোঝাপড়াটা বন্ধুত্বের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। মস্কোতে এত দিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন ডি পি ধর। তার সঙ্গে রসায়নটা কী হবে তিনি জানেন না। ৩ নম্বর যে বিষয়ে তাজউদ্দীন রীতিমতো বিষণ্ণ হয়ে পড়েছেন, তা হলো বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ) বা মুজিববাহিনী প্রসঙ্গ। র-এর প্রধান আর এন কাও এবং হাকসারের সঙ্গে তাঁদের দুজনের-সৈয়দ নজরুল এবং তাজউদ্দীনের একান্ত বৈঠকে তাজউদ্দীন কথাটা তুলেছিলেন। বলেছিলেন, মুজিববাহিনী খুবই ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। এলাকা থেকে খবর আসছে, তারা কোথাও কোথাও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে মেতে তাদের অস্ত্র কেড়ে নিচ্ছে। তাদের ট্রেনিং ভালো, তাদের অস্ত্র ভালো, তাদের নেতাদের অবস্থানও উচ্চে। এটা আমাদের সরকার এবং মুক্তিবাহিনীর জন্য খুবই বিব্রতকর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে আমাদের নিয়মিত বাহিনীর অফিসাররা খুবই ক্ষিপ্ত। আর আমাদের গেরিলা বাহিনীর ছেলেরা হতাশ। আমাদের আরেকটা বাহিনী থাকতেই পারে। একটা দেশের নানা ধরনের বাহিনীই তো থাকে। কিন্তু সেটা তো বাংলাদেশ সরকারের অধীনে হতে হবে। তারা প্যারালাল অথরিটি হয়ে উঠছে, আর বাংলাদেশ সরকারকে উৎখাত করতে চাইছে।
