তারা পাশের অফিসঘরে এসে বসলেন। কলকাতায় খুব বৃষ্টি হচ্ছে। ইদানীং। তাতে গরম কমছে না। তাজউদ্দীন ফ্যানটা ছেড়ে দিলেন।
ফারুক আজিজ খান বললেন, সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি এসেছেন। তিনি নিক্সন প্রশাসনের বাংলাদেশ নীতির সবচেয়ে বড় সমালোচক। তিনি বাংলাদেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে সিনেটে কথা বলে যাচ্ছেন, বাইরে জনমত তৈরি করছেন। তার সঙ্গে আপনার কথা বলা উচিত। দিল্লি তার সফরসূচি চূড়ান্ত করছে। আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, আপনি তার সঙ্গে দেখা করবেন কি না।
তাজউদ্দীন বললেন, আমি ব্রিটিশ এমপি ডগলাসম্যানের সঙ্গে দেখা করেছি। তার সঙ্গে বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে দেখা করেছি। এপ্রিলে সেই ঘটনা। আপনি আসার আগে। তবে আপনি নিশ্চয়ই জানেন। কিন্তু আমি টেড কেনেডির সঙ্গে দেখা করব না।
কেন করবেন না। আমার ধারণা, কেনেডি আমাদের জন্য বড় রকমের একটা সাপোর্ট হবেন। আমেরিকায় ফিরে গিয়ে তিনি শোরগোল তুলবেন। তিনি নিক্সনের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তাঁকে বাংলাদেশের পাশে পাওয়া আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের জন্য খুবই হেল্পফুল হবে।
তাজউদ্দীন বললেন, শোনেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তাদের হাকিম নড়বে, হুকুম নড়বে না। আজকে যদি কেনেডি নিক্সনের জায়গায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকতেন, নিক্সন যা যা করছে, হুবহু তা-ই করতেন।
না না। তা কেন হবে। কেনেডির নীতি তো আলাদা।
তাজউদ্দীন বললেন, ফারুক আজিজ সাহেব। আপনি সমাজতন্ত্র চাইবেন, আবার আমেরিকানদের সাহায্য-সমর্থন চাইবেন, তা তো হতে পারে না।
ফারুক আজিজ তাজউদ্দীনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই মানুষটার আদর্শবাদিতার কোনো তুলনা নেই। তবে সোনাতে একটুখানি খাদ মেশাতে হয়। শুধু সোনা দিয়ে অলংকার হয় না। তাজউদ্দীন সাহেব কি বাস্তবতাবাদী নন? আমেরিকার প্রতি এতটা বিমুখ হলে কি বাস্তব দুনিয়ায় চলা যাবে?
৫৮
আমির হোসেন বসে আছেন কলকাতার বাংলার বাণী অফিসে। তাঁর সামনে এক তরুণ। বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, বিষণ্ণ তরুণ।
আমির হোসেনের ৩১ বছরের জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুড়িকে কানায় কানায় পূর্ণ বলা যাবে না। দৈনিক ইত্তেফাক-এর রিপোর্টার তিনি, বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক বাংলার বাণীতে উপসম্পাদকীয় লিখতেন। মাদারীপুরের ছেলে। তাকে ছাত্রলীগে আনেন আবদুর রাজ্জাক। ইত্তেফাক-এ আওয়ামী লীগসংক্রান্ত খবর সংগ্রহ করতেন, বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ছিল অবাধ যাতায়াত।
এখন তিনি কলকাতায়, ভবানীপুরের চিত্তপ্রসাদ সড়কের সেই বাড়িটির নিচতলায়, যে বাড়ির ঠিকানা বঙ্গবন্ধু ছাত্রনেতাদের মুখস্থ করিয়েছিলেন। এই বাড়িটি বেশ বড়সড়। এর দোতলায় সাধারণত থাকেন তোফায়েল আহমেদ। শেখ মণি থাকেন আগরতলা। সিরাজুল আলম খান থাকেন শিলিগুড়ি। রাজ্জাক থাকেন মেঘালয়ের তুরা।
তারা কখনো কলকাতা এলে এই বাড়িতে থাকেন।
চিত্ত সুতারের মাধ্যমে র-এর কানেকশন উন্মোচিত হয়েছে। এই চার নেতা বিএলএফ তথা মুজিববাহিনী গড়ে তুলেছেন।
শেখ মণি আমির হোসেনকে দায়িত্ব দিয়েছেন কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক বাংলার বাণী বের করতে হবে।
আমির হোসেন সেই কঠিন দায়িত্ব পালন করছেন। পত্রিকা বের করা। চাট্টিখানি কথা নয়। আর এখানে তাঁকে খালি সম্পাদকগিরি করলে চলে না। জুতা সেলাই থেকে শুরু করে চণ্ডীপাঠ করতে হয়। নিউজপ্রিন্ট জোগাড় করা, পত্রিকা ছাপানো, পত্রিকা বিলি করা–ঝামেলা কি কম?
আমির জানেন, তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে শেখ মণির বনাবনি নেই। আমির হোসেন ইত্তেফাক-এর ঝানু সাংবাদিক, এ-ও বোঝেন, মোশতাকের সঙ্গে তাজউদ্দীনের দ্বন্দ্ব প্রবল। শেষের দুজনেরটা আদর্শিক এবং ব্যক্তিগত। মোশতাক ডানপন্থী, আমেরিকাপন্থী, সমাজতন্ত্রবিরোধী, ইসলামপসন্দ। তাজউদ্দীন মধ্যবাম, আমেরিকাবিরোধী, সমাজতন্ত্রপ্রেমী, নিজে ধর্মকর্ম করলেও প্রবল অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী। ব্যক্তিগত সমস্যা হলো, মোশতাক সিনিয়র, কাজেই তিনি মনে করেন যে প্রধানমন্ত্রী তাঁরই হওয়া উচিত। আমির বোঝেন, মোশতাক শুধু তাজউদ্দীনের চেয়ে নিজেকে। যোগ্য মনে করেন তা নয়, বঙ্গবন্ধুর চেয়েও নিজেকে বেশি শিক্ষিত ও যোগ্য মনে করেন।
দলের মধ্যে ইজম আছে। তাজউদ্দীন ঢাকার এমপিদের নিয়ে ভেতরে ভেতরে করেন ঢাকা-ইজম। মোশতাকের আছে কুমিল্লা-ইজম। কামারুজ্জামানের আছে উত্তরবঙ্গ-ইজম।
এই নিয়ে সহকারী মুকুলের সঙ্গে আমির মাঝেমধ্যে কথা বলেন।
মুকুল বলে, মোশতাক সাহেব সিনিয়র মোস্ট। উনি তো বঙ্গবন্ধুরও বড়। তাঁর দাবি তো কম নয়। তিনিও ছয় দফার জন্য জেল খাটছেন।
আমির বলে, মোশতাক আওয়ামী লীগ ছাড়ছিলেন। আওয়ামী লীগ যখন মুসলিম শব্দ বাদ দিল, তখন আওয়ামী লীগ ছেড়ে যান আবু হোসেন সরকারের চিফ হুইপ হওয়ার লোভে। আর মুসলিম শব্দ বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে।
ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহেবও তো সিনিয়র-মুকুল নিউজপ্রিন্টের একটা নোটপ্যাডের পাতা ছিঁড়ে নিয়ে আলপিন গাঁথতে গাঁথতে বললেন।
ক্যাপ্টেন মনসুর তো মামলা খেয়েছিলেন। সেই মামলা উইথড্র না হলে তার তো এই পর্যন্ত আসারই কথা না।
সৈয়দ নজরুল?
বঙ্গবন্ধু যখন আওয়ামী লীগ রিভাইভ করলেন, সৈয়দ নজরুল তখন সম্মিলিত বিরোধী দল করার জন্য কিছুদিন নিজেকে বিরত রাখছিলেন। একমাত্র তাজউদ্দীন আগাগোড়া আওয়ামী লীগার। আর বঙ্গবন্ধুর ডান। হাত।
