হাকসার খুশি। ধর তো এই চুক্তি করার জন্য বারবার করে লিখছিলেন। এদের সোভিয়েতপন্থী মনোভাব গোপন কিছু নয়।
ধর বললেন, তাহলে আমি মস্কো চলে যাই। সবকিছু অ্যারেঞ্জ করি।
৩ আগস্ট মস্কো পৌঁছালেন ধর। চুক্তির ভাষা কী হবে, এই নিয়ে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্টুে গ্রোমিকোর সঙ্গে বড় বড় বৈঠক করলেন। তারপর তারা উড়ে এলেন দিল্লি। আগস্টের ৯ তারিখে দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং আর সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রোমিকোর মধ্যে মৈত্রী, শান্তি ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। ১৩ আগস্ট ১৯৭১ জয় বাংলা পত্রিকার খবরে ঠিক জায়গাটাকেই বড় করে দেখানো হয়, দুই দেশের কোনো একটা দেশ তৃতীয় কোনো দেশ দ্বারা আক্রান্ত হলে সেই আক্রমণ মোকাবিলার জন্য কী করণীয়, তা দুই দেশ পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে। ঠিক করবে।
আমেরিকা কিছুই জানত না। কিসিঞ্জার খবরের কাগজে পড়লেন এই চুক্তির কথা।
কিসিঞ্জারের হাতের কফির পেয়ালা থেকে কফি ছিটকে পড়ল। এটা কি খবর নাকি বোমশেল!
.
আনিসুজ্জামান গেছেন তাজউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করতে। তাজউদ্দীন বললেন, একটা বিবৃতি লিখেছি। আপনি একটু দেখে দিন।
আনিসুজ্জামান বললেন, কী বিষয়ে?
ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন মৈত্রী চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এই বিবৃতি।
আনিসুজ্জামান বললেন, হ্যাঁ। এই চুক্তি আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে।
তাজউদ্দীন বললেন, এই চুক্তি করার ব্যাপারে আমিও মিসেস গান্ধীকে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি আমাদের এই বিষয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখতে বলেছিলেন। তাই আমরাও একেবারে মুখ বন্ধ করে ছিলাম। আর আমাদের উপহাইকমিশনার হোসেন আলী সাহেব স্টেটসম্যানকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, বলেছেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ক্ষেত্রে কোনো অনুকূল অবদান রাখবে বলে তিনি মনে করেন না।
কী বলেন!
আপনি চিন্তা করেন, এই রকম একটা সেনসিটিভ ইস্যু, এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবেন, হোসেন আলী সাহেব আমাদের সঙ্গে কথা বলে নেবেন না?
তাই তো। আমিও ভাবছি এটা কী করে সম্ভব হলো?
বুঝতে পারছেন না, কী করে সম্ভব হলো?
কিছুটা। আপনার অফিস তো দূরে। খন্দকার মোশতাকের অফিস তো তাঁর মিশনে। খন্দকার মোশতাক আর তার সেক্রেটারি মাহবুবুল আলম চাষী নিশ্চয়ই এই মত পোষণ করেন।
তাজউদ্দীন সাহেবের লেখা প্রেস বিজ্ঞপ্তিটা ইংরেজিতে লেখা। তাজউদ্দীন নিজ হাতে লিখেছেন। তিনি নিশ্চয়ই আশা করছেন, আনিসুজ্জামান এটার বাংলা করে দেবেন। পড়তে পড়তে আনিসুজ্জামান এটার বাংলা তরজমা ভাবতে থাকেন : বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি নিয়ে যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তাতে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। আসলে যেসব দেশ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন জানাচ্ছে, সেসবের দুটি দেশের মধ্যে এই ধরনের মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন খুবই ইতিবাচক একটি ঘটনা বলে বাংলাদেশ সরকার মনে করে।
আনিসুজ্জামান বিবৃতিটা পড়ার পর বললেন, মোশতাক সাহেব, মাহবুবুল আলম চাষীর এই ধরনের প্রতিক্রিয়ার কারণ কী!
তাজউদ্দীনের মুখটা লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, মোশতাক সাহেব আমেরিকার সাথে যোগাযোগ করছেন। জহিরুল কাইয়ুম সাহেবকে পাঠিয়েছেন আমেরিকান কনসুলেটে। তাঁরা আলাপ করছেন বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিনিময়ে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক হবে, আর তাতে মধ্যস্থতা করবে আমেরিকা।
বাস্তবে তা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
আমি ইয়াহিয়া খানকে এক ফোঁটাও বিশ্বাস করি না। আমাদের সঙ্গে স্রেফ মিথ্যা কথা বলেছে একটা লোক। আমরা ২৫ তারিখে তার ফোনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আর লোকটা লাখ লাখ বাঙালিকে হত্যা করে ঠান্ডা করার নির্দেশ দিচ্ছিল। এখন এই ধরনের একটা বৈঠকের কথা বলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে থামিয়ে দেওয়ার এটা একটা চক্রান্ত হবে। আমাদের যুদ্ধ একবার থেমে গেলে সে আবারও আমাদের হত্যা করবে। এটা একটা ফাঁদ। এই ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না।
.
খন্দকার মোশতাকও একটা পত্রিকা বের করেন। নাম অভিযান। কবি সিকান্দার আবু জাফর ধানমন্ডিতে বেগম মুজিবদের বন্দী করে রাখা বাসার পাশেই থাকতেন। তিনি পালিয়ে কলকাতা চলে এসেছেন। কিছুদিন অভিযান এর সম্পাদক থাকলেন। কিন্তু পরে পদত্যাগ করেন তিনি।
সিকান্দার আবু জাফরের শরীরটা ভালো নয়। তিনি জয় বাংলা পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের হাতে একটা চিঠি দিয়েছেন। প্রাপক তাজউদ্দীন আহমদ। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, খন্দকার মোশতাকের উদ্দেশ্য ভালো। নয়। তারা আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য যুদ্ধ বন্ধ করে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় বসা। মুখে তাঁরা বলছেন, তাঁদের আসল উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর মুক্তি। এই জন্য পত্রিকায় বড় অক্ষরে শিরোনাম করেছে, বঙ্গবন্ধু না স্বাধীনতা।
তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর পরিচারক মগফুরের মাথায় পানি ঢালছেন। ছেলেটার জ্বর। তাজউদ্দীন আহমদকে এই ছেলেটা রান্না করে দেয়।
এই সময় দরজার ওপাশে হাজির হলেন ফারুক আজিজ খান।
তাজউদ্দীন বললেন, কে?
আমি ফারুক আজিজ খান।
তাজউদ্দীন বললেন, ফারুক সাহেব। ভেতরে আসেন।
তাজউদ্দীন মগফুরের মাথার ভেজা চুল গামছা দিয়ে মুছে দিলেন। তারপর। বালতিটা সরিয়ে রাখলেন একপাশে। বললেন, ছেলেটার জ্বর। ও সুস্থ না হলে তো আমার খাওয়া নিচের ক্যানটিন থেকে। ডায়াবেটিসের কারণে আমি মেপে খাই। ক্যানটিনের খাবারে আমার একটু অসুবিধা হয়। নিজের স্বার্থেই মগফুরের সুস্থতা জরুরি। আপনি নিশ্চয়ই জরুরি কোনো কথা বলবেন। চলেন, ওই ঘরে গিয়েই বলি।
