রেনু বললেন, অসম্ভব, মরে গেলেও ক্যান্টনমেন্ট যাব না।
মেজর হোসেন বললেন, ইউ আর সো অ্যালার্জিক টু ক্যান্টনমেন্ট।
ওকে। কাল বিকেলে রেডি থাকবেন। আমি গাড়ি নিয়ে আসব।
মেজর হোসেন গাড়ি নিয়ে এলেন। খোকা তাঁর গাড়িও বের করলেন। সেই গাড়িতে সামনে খোকা, পাশে একজন প্রহরী, পান্ডা খান। পেছনে রেনু, রেহানা, হাসিনা। তাঁদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শান্তিনগরের দিকে। রেনু কত দিন পর খোলা আকাশ দেখছেন। শান্তিনগরে ডা. মতিনের বাসভবনে থামল মেজর হোসেনের গাড়ি। রেনু, খোকা ভেতরে গেলেন। মেজর হোসেন। বললেন, চোখের অসুবিধা ছাড়া আর কোনো বিষয় নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা যাবে না।
ডাক্তার মতিন চোখ দেখলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, বেগম ফজিলাতুন্নেছার চোখ ঠিক আছে। তবু তিনি গম্ভীরভাবে চোখ দেখতে লাগলেন আর নানা ওষুধ লিখে দিলেন। মেজর হোসেন বের হয়ে বললেন, গাড়ি সোজা ধানমন্ডির বাড়ি যাবে। বলে তিনি ক্যান্টনমেন্ট চলে গেলেন।
খোকা বললেন পান্ডা খানকে, পিজি হসপিটালে যেতে হবে ওষুধ কিনতে।
পান্ডা খান রাজি হলেন।
পিজিতে গিয়ে রেনু বললেন, ওপরে এদের দাদা-দাদি আছে। আপনিও চলুন। একনজর দেখে আসি।
এবারও পান্ডা খান রাজি হলেন।
দরজায় নক করে কেবিনে ঢুকে পড়লেন রেনু, রেহানা, রাসেল।
লুৎফর রহমান, সায়েরা খাতুন তাদের কন্যাসম পুত্রবধূকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। কাঁদতে লাগলেন রেহানা, চোখের জল গোপন করার চেষ্টা করতে লাগল রাসেল।
রেহানা বলল, আমি নিচের থেকে কমলা কিনে নিয়ে আসি।
খোকা টাকা দিলেন। রেহানা গেলেন নিচে।
পিজির নিচে হঠাৎ চিৎকার : রেহানা।
রেহানা দেখলেন, এপির সাংবাদিক নাজমুল। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ১৯৬৯ সালে লন্ডন গিয়েছিলেন এবং হোটেলে একই রুমে ঘুমাতেন।
রেহানা বললেন, নাজমুল চাচা, কথা বলবেন না। আমাদের ওপরে নজর আছে।
নাজমুল বললেন, খুব জরুরি খবর আছে। আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। সেখানে একটা রুমে আমাকে ঢোকাল। একপাশে দেখি মুজিব ভাই। আমার সঙ্গে চোখাচুখি হলো। তিনি ইশারা করে শান্ত থাকতে বললেন।
জরুরি খবরটা রেহানা কেবিনে এসে মাকে, দাদা-দাদিকে দিলেন। আবারও সবাই কাঁদতে শুরু করলেন তাঁদের প্রিয় মানুষ হাসুর আব্বার জন্য।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, নাজমুলরে ধইরা নিয়া গেছিল মুজিবের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওনের লাইগা।
ব্যাঙ্গমি বলবে, কেন তারে ছাড়ছে, আল্লাহ জানেন। তবে নাজমুলের শেষ রক্ষা হয় নাই, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রসংঘ গঠিত আলবদর বাহিনী পাকিস্তানি মিলিটারির সহযোগিতায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে তালিকা ধইরা বাড়ি বাড়ি গিয়া বুদ্ধিজীবীগো ডাইকা আইনা অত্যাচার কইরা কইরা হত্যা করছিল। সেই তালিকায় নাজমুলের নামও আছিল। তিনিও শহীদ হন। ডিসেম্বরেই।
৫৭
ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি স্মরণ করবে :
কিসিঞ্জার ফিরে গেলেন ওয়াশিংটনে। এরপর ঘোষণা এল, পরের বছর প্রেসিডেন্ট নিক্সন যাচ্ছেন চীনে।
জয় বাংলা পত্রিকার ২৩ জুলাই ১৯৭১ সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় খবর বেরোল : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফরের সংবাদকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
আর জয় বাংলার সম্পাদকীয়তে বলা হলো, কিসিঞ্জার ভারত থেকে পাকিস্তান গেলে ৯ জুলাই হঠাৎ করে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে নাথিয়াগলিতে চিকিৎসা নেন মর্মে ইসলামাবাদ থেকে যে খবর দেওয়া হয়েছিল, তার পেছনে আসলি বাত হলো, কিসিঞ্জার গোপনে পিকিং সফরে যান। সম্পাদকীয়তে বলা হলো, নিক্সন ১০ মাস পরে চীনে যাবেন, তাতে যদি পৃথিবীর মুক্তিকামী দেশগুলো মুক্তির লড়াই বেগবান হয় তো ভালো, না হলে তা কোনো সুফল আনবে না। আমেরিকার সাধারণ মানুষ এবং অনেক রাজনীতিবিদ যে বাংলার মানুষের পক্ষে কাজ করছেন, সম্পাদকীয়তে তা-ও উল্লেখ করে বলা হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে এশিয়ায় শান্তি আসবে না।
খন্দকার মোশতাক যতই নিক্সনের আসন্ন সম্ভাব্য চীন সফরকে সাধুবাদ জানান না কেন, ভারত এই খবরে খুবই উদ্বিগ্ন হলো।
আমেরিকায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত এল কে ঝাঁকে কিসিঞ্জার ডাকলেন ১৭ জুলাই। বললেন, যদি পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ বেধে যায়, আর চীন পাকিস্তানের পক্ষ নেয়, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু করার থাকবে না।
ইন্দিরা গান্ধী এই বার্তা পেলেন। তিনি বললেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলো।
ইন্দিরা গান্ধী তার অফিস রুমে। সামনে বসে আছেন হাকসার, ডি পি ধর, পররাষ্ট্রসচিব কাউল।
ইন্দিরা গান্ধী একটা ধবধবে সাদা কাপে দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিলেন। তিনি চান এবার সোভিয়েত-ভারত চুক্তিটা স্বাক্ষর হোক। চায়ের কাপে সবুজ উষ্ণ পানীয়র দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবলেন, সবুজসংকেতটা দিতে তার দুই বছর লাগল। ১৯৬৯ সাল থেকেই এই চুক্তি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। ইন্দিরা গান্ধী রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি জোটনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করেন। এটা পেয়েছেন তার বাবার কাছ থেকে। এ ধরনের একটা চুক্তি করলে তার দেশের বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া কী হবে, আমেরিকা কী করবে, চীন কতটা বৈরী হবে, পাকিস্তানই-বা কী করবে, সাত-পাঁচ নানা হিসাব তাঁকে করতে হয়েছিল। কিন্তু এখন এসব হিসাব করার সময় নয়। চীন-আমেরিকা নতুন প্রেম দেখা দিয়েছে। নতুন প্রেম সব সময়ই উত্তেজনাকর। এর মধ্যে আবার চীন-আমেরিকার প্রেমটা নিষিদ্ধ প্রেম। কিসিঞ্জার পিকিং গেছেন চুপি চুপি। প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীন যাবেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এবার চুক্তি সই করতেই হয়!
