তার কি বিচার করা হবে?
আনিসুজ্জামান বললেন, ইয়াহিয়া খান বারবার করে তা-ই বলছেন। তবে বিচার তো হবে ক্যামেরা ট্রায়াল। রায় ইয়াহিয়া খান দেবেন।
ডাক্তার সাহেব উদ্বিগ্ন। বললেন, তাঁর মুক্তির ব্যাপারে চাপ দেওয়া যায় না?
মল্লিক বললেন, ভারত সরকার যথেষ্ট চাপ দিচ্ছে। নানা দেশ থেকেও ইয়াহিয়া খানকে বলা হচ্ছে শেখ সাহেবের মুক্তির জন্য।
আনিসুজ্জামান বললেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আর যুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের মধ্য দিয়েই শেখ সাহেবকে মুক্ত করা সম্ভব।
ডাক্তার ইউসুফ আরও নানা প্রশ্ন করলেন। চা এল। আঙুর, আখরোট এল।
মল্লিক আর আনিসুজ্জামানেরও গল্প করতে ভালোই লাগছে।
শেষে আনিসুজ্জামানের কৌতূহল হলো। যেখানে ভারতীয় মুসলিমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাকিস্তানেরই সমর্থক, সেখানে ডা. ইউসুফ বাংলাদেশের প্রতি এত সহানুভূতি দেখাচ্ছেন কেন? শেষে আনিসুজ্জামান কৌতূহল নিবৃত্ত করতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই বসলেন, আচ্ছা, ডাক্তার সাহেব, আপনার পুরো নামটা কি জানতে পারি? এস এম…
সাহেবজাদা মোহাম্মদ ইউসুফ খান।
আনিসুজ্জামান দ্বিধান্বিত কণ্ঠে শুধালেন, আপনি কি সাহেবজাদা ইয়াকুব খানের কেউ হন, যিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন?
জি। উনি আমার নিজের ভাই। নিজের মায়ের পেটের ভাই।
আনিসুজ্জামান ও মল্লিক সব বুঝলেন।
তাঁদের মনে পড়ল, সাহেবজাদা ইয়াকুব খান পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। তিনি বাঙালিদের পছন্দ করতেন। কষ্ট করে বাংলা শিখেছিলেন। তাঁর আরও একটা ভাই আছে। বড় ভাই। সাহেবজাদা ইউনুস খান। ইয়াকুব পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বড় কর্তা। ইউনুস ভারতের সেনাবাহিনীর বড় কর্তা। দুজনে একসঙ্গে পড়তে গিয়েছিলেন ব্রিটেনে, ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীর কোর্সে। দুজনেই সেখানে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে দুজন দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য নিয়ে সীমান্তের দুদিকে পরস্পরের দিকে কামান তাক করলেন। বড় ভাই ইউনুসের ছোঁড়া গুলি এসে লাগল ছোট ভাই ইয়াকুবের গায়ে। বড় ভাই চিৎকার করে বললেন, ছোট ভাই, দুঃখ করিস না রে, আমাদের যে সৈনিকের জীবন, কর্তব্য যে আমাদের পালন করতেই হবে।
সেখান থেকে ২৩ বছর পর। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস। ইয়াকুব পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। এর আগে। আহসানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে গভর্নরের পদ থেকে। কারণ, আহসানও পূর্ব পাকিস্তানে বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে। সে বড় বেশি নরম।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ যখন ইয়াহিয়া অ্যাসেম্বলির অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত করে দিল, আর ভেতরে ভেতরে ঠিক করল, কামান দাগিয়ে, ট্যাংক চালিয়ে বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে, আর জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে কোনো দিনও ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না, ইয়াহিয়া খানের বিশ্বস্ত সহযোগী প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস জি এম পীরজাদার সঙ্গে ফোনে কথা বললেন ইয়াকুব।
পীরজাদা বললেন, প্রেসিডেন্ট ঢাকা আসছেন না। তোমরা অপারেশন ব্লিজ নিয়ে এগোতে থাকো। কামান আর ট্যাংকই সমাধান।
ইয়াকুব বললেন, আমি আমার নিজের দেশের মানুষের ন্যায়সংগত আন্দোলনের ওপর গুলি চালাতে পারব না। আমি পদত্যাগ করছি।
শুনে ইয়াহিয়া ভয়াবহ খেপে গেলেন। ইয়াকুবকে পাকিস্তানে ডেকে নেওয়া হলো। ইয়াহিয়া বললেন, ইয়াকুবের বিচার হবে। কোর্ট মার্শাল।
.
আনিসুজ্জামান বললেন, ইয়াকুব সাহেবের খবর কী?
ডাক্তার ইউসুফ বললেন, তাকে হাউস অ্যারেস্ট করে রাখা হয়েছে। তার বিচার করার কথা।
আপনি কি নামের শেষে খান লেখেন না?
না।
ও আচ্ছা। আমিও তাই ভেবেছিলাম।
ভালো থেকো। বিদায়!
আনিসুজ্জামান এবং এ আর মল্লিক মেডিকেল সেন্টার থেকে বের হয়ে এসে গাড়িতে উঠলেন। ডা. ইউসুফের চোখের কোণে এক ফোঁটা জলে তাঁদের গাড়ির প্রতিবিম্ব ফুটে উঠল কি উঠল না, তা আর আনিসুজ্জামান দেখতে পেলেন না।
৫৬
শেখ লুত্যর রহমানের বয়স নব্বইয়ের বেশি। সায়েরা খাতুনের বয়সও আশির বেশি। তারা এখন ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ডা. নুরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে মমিনুল হক খোকা তাঁদের পিজি হাসপাতালের কেবিনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। টুঙ্গিপাড়ার বাড়ি তো পুড়ে ছাই। গ্রামে এ মেয়ের বাড়ি ও মেয়ের বাড়ি রিফিউজি জীবন যাপন করে ঢাকায় এসে উঠেছিলেন সোবহানবাগ কলোনিতে ছোট মেয়ের বাড়িতে। দুজনই অসুস্থই ছিলেন। জানতে পেরে রেনু খোকাকে বললেন, তাদের হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করে দাও।
দাদা-দাদি হাসপাতালে। রেহানা আর রাসেল তাদের দেখতে যেতে চায়। যদিও বাড়িতে একটা ছোট্ট বাচ্চা আছে, তাদের ভাগনে জয়, তার আকর্ষণও কম নয়।
রেনু খোকাকে বললেন, খোকা, আব্বা-আম্মাকে তো দেখতে যাতি হয়!
খোকা বললেন, এদের অফিসারকে বলে দেখেন। আপনাকে কি বের হতে দেবে?
মেজরের সঙ্গে কথা বললেন খোকা। অসম্ভব। শেখ মুজিবের স্ত্রীকে বের হতে দেওয়া হবে না।
তখন একটা বুদ্ধি করা হলো। বলা হলো, বেগম মুজিবের চোখ খারাপ হয়ে গেছে। চোখের ডাক্তার দেখাতে হবে।
মেজর হোসেন বললেন, ওকে, ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে।
