আপনি কি নিজ কানে এটা শুনেছেন?
না। আমার এক বন্ধু শুনেছে।
ব্রোহি আবার গেলেন মুজিবের কাছে। আপনি কথা বলুন।
মুজিব বললেন, এই আদালত অবৈধ। আমি কিছু বলব না।
ইয়াহিয়া খানের কাছে মামলার অগ্রগতির কাগজ এসেছে। ইয়াহিয়া বললেন, আচ্ছা, মুজিব কিছু বলছে না। এইভাবে চলবে না। তিনি নতুন ফরমান জারি করলেন। ৮৮ নম্বর সামরিক বিধি। এতে বলা হলো, শেখ মুজিবের বিচারের সময় অভিযুক্ত পক্ষের উকিলের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। সাক্ষীর সাক্ষ্য পুরোটা লিপিবদ্ধ করার দরকার নেই। শুধু সারসংক্ষেপ নথিভুক্ত করলেই চলবে। কোনো সাক্ষী যদি বিরক্তিকর, অপ্রয়োজনীয়, কিংবা লম্বা সাক্ষ্য দিতে থাকে, যা বিচারকার্যকে বিলম্বিত করতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়, সে সাক্ষীকে সামরিক আদালত বাতিল করতে পারবে।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, সরকারপক্ষ মোট ১০৫ জনের নাম সাক্ষী হিসেবে দিছিল। এদের মধ্যে বেশির ভাগই আছিল বাঙালি সামরিক সেনা কর্মকর্তা। প্রচণ্ড নির্যাতন কইরা তাগো কাছ থাইকা জবানবন্দি আদায় কইরা নিয়া স্বাক্ষর করায়া নেওয়া হইছিল। তবে আদালতে বেশির ভাগ সাক্ষীকেই হাজির করতে সেনা কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হইছিল। আর এ কে ব্রোহি এবং তাঁর চার সহযোগীর জেরার মুখে সাক্ষীরা সবাই আউলা-ঝাউলা কথা কইতে থাকলেন।
ব্যাঙ্গমি বলে, শেখ মুজিবের বিচার গোপন সামরিক আদালতে হইতেছে, এই খবর ছড়ায়া পড়ার সাথে সাথে সারা পৃথিবীর সব বিবেকবান মানুষ একযোগে এবং আলাদাভাবে প্রতিবাদ কইরা উঠলেন। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল তাঁর মুখপাত্রের মাধ্যমে জানাইলেন, এইটা উচিত হইতেছে না। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল শেখ মুজিবকে প্রিজনার অব কনশায়েন্স বইলা অভিহিত করল। ইন্টারন্যাশনাল জুরিস্টস কমিশন এই বিচারের বৈধতা নিয়াই প্রশ্ন তুলল। বহু দেশ, বহু সরকার, বহু সংগঠন শেখ মুজিবের এই বিচার-প্রহসন বন্ধ করার লাইগা বিবৃতি দিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ইয়াহিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ কইরা বলার চেষ্টা করল, শেখ মুজিবকে য্যান ফাঁসি দেওয়া না হয়।
.
১১ আগস্ট ইন্দিরা লিখেছিলেন নিক্সনকে, আমাদের শঙ্কা, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার অজুহাত হিসেবে তথাকথিত বিচারকে ব্যবহার করা হবে। তার ফলটা দাঁড়াবে এই, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে, ভারতের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর কারণে ভারতেও এর প্রতিক্রিয়া হবে চরম। আমাদের অনুরোধ, এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বৃহত্তর স্বার্থে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ওপরে আপনি আপনার প্রভাব খাটান, যেন তিনি একটা বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেন।
৫৫
আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটা ঘুরে ঘুরে দেখছেন এ আর মল্লিক আর আনিসুজ্জামান। তাঁরা বেরিয়েছেন ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরে সভা-সেমিনার করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত গঠন করতে।
আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল আলিম। তিনি সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ-সভার। একমাত্র বক্তা মল্লিক। আনিসুজ্জামানের কাজ শুধু উপস্থিত থাকা।
আনিসুজ্জামানদের ঘুরে ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দেখানো হচ্ছে।
তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের সফরসূচি। ঘড়ির কাঁটা ধরে কখন খাওয়া, কখন সভা, কখন বেড়ানো, কখন প্রাতরাশ। সবই চলছে নিয়মমাফিক।
আনিসুজ্জামান বাংলায় বললেন মল্লিক সাহেবকে, সব ঠিক আছে। কিন্তু কোথাও প্রাণের ছোঁয়া নাই।
মল্লিক বললেন, ভারতের সব জায়গায় দেখেছি, বেশির ভাগ মুসলমান। স্বাধীন বাংলাদেশ চায় না। তারা আমাদের কাজ সমর্থন করে না। তারা চায় পাকিস্তান এক থাকুক।
আনিসুজ্জামান বললেন, আমার আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও এই মনোভাব। তোমরা আত্মীয়। এসেছ। সমাদর যা করার করব। কিন্তু মুসলমানদের একটা দেশ হয়েছে, সেটা কেন ভাঙছ।
মল্লিক বললেন, শুনেছি ভারতের মুসলমানরা নাকি ক্রিকেট খেলায় ভারতকে সমর্থন না করে পাকিস্তানকে সমর্থন করে!
আনিসুজ্জামান বললেন, তা অবশ্য আমি জানি না।
আনিসুজ্জামান আর মল্লিক এই মুহূর্তে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে। গাড়ি করে ক্যাম্পাস ঘুরছেন তাঁরা। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যাচ্ছেন। চিকিৎসাকেন্দ্রে দেখার মতো কী থাকবে?
তবু তারা নামলেন। উঁচু সিঁড়ি। বেশ বড় বড় কলামওয়ালা ভবন। তাদের। নেওয়া হলো চিফ মেডিকেল অফিসারের কক্ষে।
দেয়ালে টাঙানো স্বাস্থ্যবিষয়ক বড় পোস্টার, যেখানে মানবদেহের ছবি। একটা কাঁচের আলমারিতে মোটা মোটা বই। বড় একটা টেবিল। টেবিলে ওষুধ কোম্পানির কলমদানি।
আনিসুজ্জামান ও মল্লিক বসলেন। চিফ মেডিকেল অফিসারের সঙ্গে পরিচিত হলেন তাঁরা। তাঁর নাম ডা. এস এম ইউসুফ।
পুরো আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের এখানে-ওখানে যাদের সঙ্গেই কথা হয়েছে, আর যা-ই পাওয়া যাক, আন্তরিকতার স্পর্শ তারা পাননি।
এই প্রথম কাউকে পাওয়া গেল, যিনি খুবই আগ্রহভরে তাঁদের বসালেন। বললেন, চা খান। আসুন, একটু গল্প করি। আমি আপনাদের বাংলাদেশ আন্দোলনকে মনেপ্রাণে সমর্থন করি।
তাই নাকি? মল্লিক তাকালেন আনিসুজ্জামানের চোখে।
ডা. এস এম ইউসুফ বললেন, শেখ মুজিবুর রহমান কোথায়?
আনিসুজ্জামান বললেন, তিনি তো পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে। তবে কোন কারাগারে, কী অবস্থা, জানতে দেওয়া হয় না।
