২ আগস্ট প্রেসনোট জারি করা হলো। শেখ মুজিবের বিচার শুরু হচ্ছে সামরিক আদালতে। ৩ আগস্ট পাকিস্তান টেলিভিশনে ভাষণ দিলেন ইয়াহিয়া। ঘোষণা করলেন, শেখ মুজিবের বিচার শুরু হচ্ছে। পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে তার বিচার হবে। রাষ্ট্রের আইন অনুসারেই বিচার হবে। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ নেই। বরং তার দুঃখই হচ্ছে যে কৃতকর্মের জন্য শেখ মুজিবকে শাস্তি পেতেই হবে।
.
সানডে টাইমস-এর রালফ শ সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন। ইয়াহিয়া তাঁকে সময় দিয়েছেন বেলা তিনটায়। বেলা তিনটায়ও ইয়াহিয়ার সামনে গেলাসে করে হুইস্কি এল। বরফ এল।
ধন্যবাদ, প্রেসিডেন্ট, আমি সূর্য ডোবার আগে ড্রিংক করি না। রালফ শ বললেন। আপনাকে ধন্যবাদ আপনি আমাকে একান্ত সময় দিচ্ছেন। আমার প্রশ্ন হলো, শেখ মুজিব কি বেঁচে আছেন?
হ্যাঁ। হ্যাঁ। শেখ মুজিব বেঁচে আছেন।
তিনি এখন কোথায়?
তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে একটা প্রথম শ্রেণির জেলখানায় রাখা হয়েছে।
তিনি কেমন আছেন?
সুস্থ আছেন। ভালো আছেন। তবে আজকের পর তাঁর জীবনে কী হবে, সে ওয়াদা আমি করতে পারব না।
মানে কী? আপনি কি তাকে হত্যা করবেন?
তার মানে এই নয় যে আগামীকালই তাকে গুলি করা হবে। তার তো স্বাভাবিক মৃত্যুও হতে পারে। তাকে প্রথম শ্রেণির কারাগারেই রাখা হয়েছে। তাকে কোনো পরিশ্রম করতে হয় না। তার ঘরে ফ্যান আছে, বাথরুমে গরম পানির ব্যবস্থা আছে, বিছানা আছে। তবে ঘরটা ছোট। এটা ঠিক।
তার স্বাস্থ্য কেমন আছে?
ভালো আছে। রোজ একজন ডাক্তার তাকে দেখেন। তিনি তো পশ্চিম পাকিস্তানের খাবার খেতে পারতেন না। এ জন্য তাঁকে একজন বাঙালি বাবুর্চি দেওয়া হয়েছে। এখন তার ওজন আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছে। তিনি আগে কোনো কথা বলতেন না। এখন অনেক গল্প করেন। কথার তুবড়ি ছোটে তাঁর মুখ থেকে।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, এই সাক্ষাৎকার ৮ আগস্ট সানডে টাইমস-এ প্রকাশিত হয়।
.
শেখ মুজিবকে মিয়ানওয়ালি জেল থেকে হেলিকপ্টারে তুলে আনা হয়েছে ফয়সালাবাদ লায়ালপুর জেলে। এখানে তাকে একজন বাঙালি পাঁচক দেওয়া হয়েছে। কারণ, মিয়ানওয়ালি জেলে শেখ মুজিবের স্বাস্থ্য খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। প্রচণ্ড গরমে জানালাহীন ছোট্ট সেলে থাকতে থাকতে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। এখন তাঁকে আনা হবে জেলখানার ভেতরেই একটা আদালতের সামনে। বিচারকসহ বেশ কিছু মানুষ তাঁকে দেখবে। এই অবস্থায় জীর্ণশীর্ণ মুজিব তাঁদের করুণার উদ্রেক করতে পারে।
রাওয়ালপিন্ডি থেকে দেড় শ মাইল দূরে লায়ালপুর জেল। তাঁর সেলের কাছেই একটা লাল ইটের একতলা ভবনকে আদালত হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। শেখ মুজিবকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হলো ১১ আগস্ট। একজন ব্রিগেডিয়ার প্রধান বিচারপতি, দুজন সেনাবাহিনীর অফিসার, একজন নৌবাহিনীর অফিসার, আরেকজন জেলা জজকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে ৫ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল।
শেখ মুজিবকে বলা হলো, আপনার পক্ষে কাকে আপনি উকিল নিয়োগ করতে চ
শেখ মুজিব বললেন, ড. কামাল হোসেনকে।
না। তা করা যাবে না। সে নিজেই তো পাকিস্তানের কারাগারে। আপনি অন্য কাউকে বাছাই করুন।
মুজিব বললেন, এ কে ব্রোহি।
ব্রোহি পাকিস্তানি, কিন্তু তিনি আগরতলা মামলায় শেখ মুজিবের আইনজীবী ছিলেন। ব্রোহিকে নিযুক্তি দেওয়া হলো।
মুজিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ১২টি। এর মধ্যে ছয়টি অভিযোগ এমন করে সাজানো হয়েছে যে সেসবের প্রতিটার জন্য শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড।
তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো পড়ে শোনানো হলো। মুজিব নির্বিকার রইলেন।
২৬ মার্চে রেডিও-টেলিভিশনে দেওয়া পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাষণের টেপ বাজিয়ে শোনানো হলো আদালতে।
মুজিব বললেন, আমি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছি। আমি ইয়াহিয়া খানের বিচার করতে পারি। ইয়াহিয়া খান আমার বিচার করতে পারে না। এই আদালত সম্পূর্ণ অবৈধ। এই অবৈধ আদালতের কোনো কাজে অংশ নেওয়া মানে অবৈধ কাজ করা। আমি এর অংশ হতে পারব না। মি. ব্রোহি, আপনি যেতে পারেন। আমি এই বিচারকাজের কোনো কিছুতেই অংশ নেব না।
ব্রোহি মনে মনে খুশি হলেন। এই প্রহসনের বিচারে তিনিও থাকতে চাইছিলেন না। কিন্তু আদালত বললেন, মিস্টার ব্রোহি, আপনি থাকুন। আপনার উপস্থিতি আমাদের দরকার।
.
রোজ সকাল ১০টায় শেখ মুজিবকে লম্বা করিডর পার করে আনা হয়। আদালতকক্ষে। আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। শেখ মুজিব কোনো কিছু শোনেন না। তিনি আদালতকক্ষের জানালা দিয়ে আকাশ দেখেন।
তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে এসেছেন একজন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী। সরকারি উকিল তাঁর সঙ্গে কানে কানে কথা বললেন। বিচারকেরা তাঁদের চেয়ারে বসে আছেন। মাড়োয়ারি বললেন, শেখ মুজিব তাঁকে বলেছেন, তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হলো পাকিস্তানকে ধ্বংস করা।
ব্রোহি দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, কবে শেখ মুজিব এটা বলেছিলেন?
আমার ঠিক তারিখটা মনে নেই।
কোথায় বলেছিলেন?
তাঁর বাসায়।
তাঁর বাসাটা কোথায়?
ঢাকা।
ঢাকায় কোথায়?
আমার ঠিক জায়গাটার নাম মনে পড়ছে না।
আপনি তাঁর বাসায় কবে গিয়েছিলেন?
মনে পড়ছে না।
তাঁর বাড়িটা কয়তলা? আপনারা কী ধরনের লিফটে চড়ে তাঁর ফ্ল্যাটে গেলেন।
আমার ঠিক মনে নেই।
