তিনি সোজা উঠলেন শামীমের বাসায়। মিসেস কে এন হুসেন। তাঁর স্বামীকে পশ্চিম পাকিস্তানে আনা হয়েছিল স্পেশাল ব্রাঞ্চের আইজি করে। এরপর স্বামী বেচারাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে সুইজারল্যান্ডে, রাষ্ট্রদূত করে। এখন শামীম তার বাসায় একা। প্রেসিডেন্ট সেখানে গিয়ে উঠলেন।
বাইরে নিরাপত্তারক্ষীরা সব দাঁড়িয়ে আছে।
ইয়াহিয়ার আর বেরোনোর নাম নেই। তিন দিন তিন রাত প্রেসিডেন্ট সেই বাড়িতে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগহীন অবস্থায় কাটিয়ে দিলেন।
চতুর্থ দিন তাঁকে দেখা গেল বেরোতে। তাঁর বগলে শামীম। শামীমকে নিয়ে তিনি উঠলেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে। সেখানে শামীমকে চাকরি দেওয়া হলো। পদের নাম, ইন্টেরিয়র ডেকোরেটর।
এখন আর প্রেসিডেন্টের কোনো অসুবিধাই রইল না শামীমের সঙ্গসুধা ভোগের। যখনই ইচ্ছা হতো, তিনি চলে আসতেন এই অতিথি ভবনে।
তিনি লাহোরে চলে যেতেন প্রায়ই। সেখানে আসতেন ম্যাডাম নুরজাহান।
নুরি!
সরকার।
তোমার এখনকার ড্রেসটা আরও সুন্দর।
সকালেরটা কি খারাপ ছিল।
না। তবে এটা আরও সুন্দর।
রাতেরটা আরও সুন্দর হবে, সরকার। নুরজাহান ইয়াহিয়াকে ডাকতেন সরকার বলে।
নুরজাহান বললেন, সরকার, আমি টোকিও যাব। আমার ডলার দরকার।
সরকারি টুরে যাচ্ছ। যাও। ডলার নিয়ে যাও।
আপনার লোকেরা আমাকে ডলার দিতে রাজি না। এটা নাকি নিয়মে নাই। আমি টাকা পেতে পারি। কিন্তু ডলার না।
নিয়ম কী? সামরিক আইনে সামরিক আইন প্রশাসক যা বলবে তা-ই নিয়ম। যাও। ডলার তোমার ঘরে পৌঁছে যাবে।
নুরি আর ইয়াহিয়া এক ঘরে। গুরুত্বপূর্ণ কাজের ডাক এসেছে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে। খুবই জরুরি একটা কাজ করতে হবে।
কে ঢুকবে রাষ্ট্রপতির কক্ষে।
আবারও ডাক পড়ল জেনারেল রানি ওরফে আকলিমের।
রাষ্ট্রপতির একটা জিনিস ছিল, তিনি তার খাসকামরার বিশাল কাঠের দরজার কপাটে কখনো ছিটকিনি লাগাতেন না।
দুটো নক করে আকলিম ঢুকে গেলেন ইয়াহিয়ার ঘরে।
পরে তিনি হামুদুর রহমান কমিশনের তদন্তে বলবেন, ম্যাডাম নুরি ও আগা জানি সম্পূর্ণ নগ্ন। ম্যাডামের সমস্ত শরীরে ইয়াহিয়া হুইস্কি ছিটাচ্ছেন। আর জিব দিয়ে সেই হুইস্কি তিনি পান করছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা পরে সেই কথা প্রকাশ করে দেবেন।
আরেক দিনের ঘটনা। অনেক রাতে আকলিমের কাছে এসেছেন তার আগা জানি। তাঁর পা টলটলায়মান। তাঁর কণ্ঠস্বর জড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন, রানি, রানি, তুমি কি ওই গানটা জানো? চিচে দা চালা।
না।
আরে ধি রানি সিনেমার গান।
গান শোনার সময় কই আমার, আগা জানি।
কিন্তু ওই গানটা যে আমার এখনই শুনতে হবে, রানি।
আপনি বসেন। আপনার পদসেবা করে ধন্য হই।
না। ইসহাক। ইসহাক।
স্যার।
আমার এখনই এই গান শুনতে হবে-চিচে দা চালা। যাও, যেখান থেকে পারো ওই গানের ক্যাসেট আনো।
স্যার। এখন বাজে রাত দুটো, স্যার।
তো?
সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে, স্যার।
তাতে কী? আমি পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। আমার এখন গান শুনতে ইচ্ছা করছে। আমি এখনই শুনব। যাও। দোকানে যাও। দোকান ভাঙো। ক্যাসেট নিয়ে আসো।
সৈনিকেরা ছুটল তখনই। ক্যাসেটের দোকানে গিয়ে দোকানির ঘুম ভাঙাল। ক্যাসেট জোগাড় করল। রাত তিনটার মধ্যে আকলিমের বাড়িতে চলে এল সেই ক্যাসেট।
আগা জানি সেই গান শুনে ভুড়ি দুলিয়ে নাচতে লাগলেন।
.
নাজলি বেগম তাঁর এক লীলাসঙ্গিনী।
পার্টিতে গিয়ে তিনি কোলে বসে পড়লেন ইয়াহিয়ার।
কী ডার্লিং। কী চাও?
আপনার অনুগ্রহ চাই। জনাব।
অনুগ্রহ কেন! তুমি আমার প্রেম পাবে।
জনাব। আমি পিআইসিসি ব্যাংক থেকে লোন চেয়েছি। ব্যাংকের এমডি আমাকে লোন দিচ্ছে না।
ওকে। কালকেই ওর চাকরি খেয়ে ফেলব। তোমার মতো সুন্দরী ভদ্রমহিলাকে যে অপমান করবে, তার স্থান পাকিস্তান মুলুকে হবে না। হতে পারে না।
পরের দিনই বেচারা ব্যাংক এমডির চাকরি চলে গেল।
.
৬১, হারলি স্ট্রিট রাওয়ালপিন্ডিতে ইয়াহিয়া একটা প্রাসাদ বানালেন। বলা ভালো, প্রমোদকুঞ্জ। সেখানে তিনি যেতেন, সেনাপ্রধান হামিদ যেতেন। নরক গুলজার হতো। নাচ-গান, মদ-নারী। হুল্লোড়-পার্টি।
এমনি এক পার্টিতে ইয়াহিয়া বললেন, শেখ মুজিবকে হত্যা করব। আই উইল কিল মুজিব। কীভাবে মারব? কী বলো তোমরা? বিচার করব, নাকি বিচার না করেই মারব।
একজন বান্ধবী চিৎকার করে বলল, কিসের বিচার। কোনো বিচার লাগবে না। জাস্ট হ্যাং হিম।
আরেকজন বলল, নো নো। ফাঁসি না। আমি চাই তাঁকে শুট করবে।
একজন বান্ধবী মদালস গলায় বলল, বিচার করবে।
কেন, বিচার করব কেন? ইয়াহিয়া বললেন।
কারণ, তুমি তো তাঁকে মারবেই। বিচারের রায় তো মৃত্যুদণ্ডই হবে। বিচার করে তাঁর রায় মৃত্যুদণ্ড হলে সবাই বলবে, বিচার হয়েছে। তা না হলে সবাই বলবে, তুমি খুন করেছ।
রাইট। রাইট। তিনি তাঁর এই বান্ধবীকে নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে পড়লেন।
ইয়াহিয়া বান্ধবীর কথার গুরুত্ব বুঝেছেন। বিনা বিচারে মুজিবকে মেরে ফেলাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তার বিচার করতে হবে। লন্ডনের ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে ১৯ জুলাইয়ে প্রকাশিত সাক্ষাঙ্কারে ইয়াহিয়া বললেন, শেখ মুজিবের বিচার করা হবে। বিচার হবে গোপনে। তা হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, তার অনেকগুলোর শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড।
