হ্যালো।
লিলি, আমি খোকাভাই। কী খবর।
খবর ভালো। হাসুর ছেলে হয়েছে। হাসু-ছেলে দুজনেই ভালো আছে। ছেলে দেখতে একদম ভাইজানের মতো হয়েছে।
কবি জাফরকে ধন্যবাদ জানিয়ে মমিনুল হক খোকা ফিরে এলেন সৈন্যঘেরা বাড়িটাতে। রেনুকে জানালেন সুখবরটা। রেনু খুশিতে কী করবেন, কী বলবেন বুঝে উঠছেন না। শেষে বললেন, তুই যে আমাকে কত বড় সুসংবাদ দিলি কী করে বোঝাব। আলহামদুলিল্লাহ। শোন তুই যা চাইবি, আমি তোকে তা-ই দেব। বল কী চাস!
আমি কিছু চাই না, ভাবি। একটাই জিনিস চাই, মিয়া ভাই যেন নিরাপদে আমাদের মধ্যে ফিরে আসেন। আল্লাহর কাছে মিয়া ভাইয়ের প্রাণভিক্ষা চাই।
ভাবি বললেন, সেই দোয়াই তো আল্লাহর কাছে সব সময় করি। তবু তোকে আমি কী দেই, নে, এই আংটিটা নে। বলে তিনি তার হাতের আঙুল থেকে সোনার আংটি খুলে খোকার হাতে দিলেন।
রেনু কাঁদছেন। খোকাও আংটি হাতে নিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
রেহানা খুশি। জামাল খুশি। কিন্তু কিছু করার নেই। তাদের ঘরের বাইরে পা রাখা নিষেধ।
কদিন পরে হাসিনা নবজাতককে কোলে করে বাসায় ফিরলেন।
রেহানা আর আপার বিছানার কাছছাড়া হয় না। রাসেলও বিছানায় তার ভাগনের পাশে বসে গেল। বলতে লাগল, মামা, মামা!
দুদিন পরে ওয়াজেদ মিয়া বললেন, ছেলের নাম কী রাখবা?
হাসিনা বললেন, আব্বাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। আব্বা আপনার নাতি বা নাতনির নাম কী রাখবেন? আব্বা তখন অসহযোগ আন্দোলন নিয়ে খুব ব্যস্ত। বললেন, একটু ভাবি। কাল আবার জিজ্ঞেস করিস। পরের দিন জিজ্ঞেস করলাম। বললেন, ওর নাম হবে জয়! ও বাংলার জয় এনে দেবে। আমি বললাম, যদি মেয়ে হয় তাহলে। ও হো এটা তো ভাবি নাই। আরও ভাবি… পরে আবার ধরলাম আব্বাকে। বললাম, আব্বা, আমার মেয়ে হলে কী নাম রাখব? আব্বা বললেন, ভাবি নাই। শোন, তোর ছেলেই হবে। যাহ। শোন, সহজ বুদ্ধি আছে। মেয়ে হলে নাম রেখে দিবি জয়া।
রেনু পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি নাতিকে কোলে তুলে নিলেন, বললেন, সত্যিই এ আমার জয়। আমার কোনো ভাই নাই, এবার আমি পেলাম ভাই, জয় ভাই। আর শোনো, হাসুর আব্বা রেখেছেন ডাকনাম, ভালো নাম আমি রাখব। মুজিবের সাথে মিলায়ে ওর নাম রাখো সজীব।
ওয়াজেদ সাহেব খুশিই হলেন। সবাই মিলে ঠিক করা হলো, ছেলের নাম হবে সজীব ওয়াজেদ জয়।
জামাল রেহানাকে বললেন, শোন, ভাগনে এসে গেছে। মামা-ভাগনে যেখানে আপদ নাই সেখানে। আমার প্যান্টের ভেতরে একটা গোপন পকেট সেলাই করে বানিয়ে দে।
রেহানা বললেন, প্যান্টের ভেতরের পকেট দিয়ে কী হবে?
বলতে পারি, কিন্তু তোকে কসম কাটতে হবে, তুই কাউকে বলবি না। মাকে না, আপাকে না। কাউকে না।
আচ্ছা বলব না।
আমি যুদ্ধ করতে চলে যাব।
কেমন করে? বাড়ি থেকে বের হবা কী করে?
চুপ করে শোন। একজন মিলিটারি আছে পয়েন্দা খান। ওর সঙ্গে গল্প করে করে খাতির করে ফেলেছি। সে বলেছে, বাড়ির পেছনে যখন ওর ডিউটি থাকবে, সে আমাকে দেয়াল টপকাতে দেবে।
কী বলো? গুলি করে যদি?
না করবে না।
বাইরে বের হয়ে কী করবা? তোমাকে রাস্তায় আর্মি ধরবে।
একটা আইডি কার্ড বানাইছি।
কেমন করে?
আবদুলকে দিয়ে। আবদুল বাইরে গিয়ে আমার বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা দোকান থেকে বানিয়ে দিয়েছে।
তারপর তোমার প্ল্যানটা কী?
তোকে প্ল্যান বলব কেন? চুপ করে থাক।
রেহানা চুপ করে থাকলেন। বাড়ির গার্ড মিলিটারিগুলোও যা অত্যাচার শুরু করেছে। রাতের বেলা তারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনছিলেন, হঠাৎ স্টেনগান নিয়ে একজন হাবিলদার ঢুকে পড়েছে, বলে, তোমরা স্বাধীন বাংলা শোনো। জামালকে ধরে নিয়ে গিয়ে ক্যান্টনমেন্টে পা উল্টা করে ঝুলিয়ে পিটিয়ে চামড়া তুলে নেব।
জামাল সেদিনই ঠিক করে রেখেছেন, আর নয়। যুদ্ধে যেতেই হবে। এই অপমানের শোধ নিতেই হবে।
রেহানা বাথরুমে ঢুকে জামালের প্যান্টে গোপন পকেট বানিয়ে দিলেন।
সকাল আটটার দিকে জামাল দেয়াল টপকালেন।
তার কিছুক্ষণ পর রেনু বললেন, জামাল কই।
রেহানা চুপ। আবদুল চুপ।
রেনু কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
৫৩
ব্যাঙ্গমা বলল, কিশোর শেখ জামালের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়াটা আছিল খুবই ঝুঁকির কাজ!
ব্যাঙ্গমি বলল, বেসম্ভব ঝুঁকির কাজ। এক নম্বর হইল, তিনি নিজে গৃহবন্দী। ঘরে বইসা তিনি তার সমবয়সের আবদুলকে বাইরে পাঠায়া যাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট করলেন। প্রথমে তিনি গেলেন ভিআইপি স্টোরের সামনে। সেই রকমই কথা আছিল। ভিআইপি স্টোরের কর্মচারী ফিরোজের বাড়ি কুমিল্লা বর্ডারের কাছে। সে তারে কথা দিল বর্ডার পার কইরা দিবে। এই এক কথায় বাসা থাইকা বাইরায়া ভিআইপি স্টোরের সামনে গিয়া ফিরোজরে খুঁইজা বাইর কইরা তার বাসায় গিয়া তিনি রাইত কাটাইলেন। এই দিকে বাড়িতে কান্নাকাটি। মিলিটারি গো মইধ্যে তোলপাড়। ছেলে হারায়া গেছে। মিলিটারিরা যখন খোঁজা শুরু করছে, তহনো জামাল ঢাকায়। ৫ আগস্টে বাইর হইলেন। ৬ আগস্ট বেবিট্যাক্সি লইয়া রওনা দিলেন কাঁচপুর ফেরিঘাটের দিকে। কাঁচপুর ফেরিঘাটে গোলযোগ হইছে, গোলাগুলি হইছে, ওই দিকে কেউই যাইতে চায় না। বেশি টাকা ভাড়া দিয়া রাজি করায়া জামাল আর ফিরোজ গেলেন ফেরিঘাটে। দেখেন, মিলিটারি লোকজনরে নৌকা পার করতে তদারক করতাছে। সেই মিলিটারির সামনে দিয়া নৌকায় উইঠা তারা নদী পার হইলেন। এইভাবে একবার নৌকায়, একবার হাইটা, আবার নৌকায় কইরা পাঁচ দিন ধইরা পথ চইলা তারা বর্ডারে পৌঁছান। জামালের পরনে আছিল লুঙ্গি। অনেক জায়গায় রাত কাটাইছেন। লোকে টের পাইছে মজিবরের পোলা। তারা আদর করছে। লুঙ্গি কিইনা দিছে। মুরগি জবাই কইরা খাওয়াইছে। আবার বেশি জানাজানি হইলে ধরা পড়ার ভয়ে পলাইতে হইছে। এইটা আছিল রিস্কের উপরে রিস্ক। আর ১৭ বছরের জামাল পথে গান ধরছেন :
