সে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে চোখের পানি ফেলে। দেনা (রেহানা) আপা আসেন। বলেন, এই রাসেল সোনা, কাঁদছ কেন? রাসেল বলে, কই কাঁদছি না তো। চোখে কুটা পড়েছে।
শেখ রেহানার চোখ ছলছল করে। তিনি আপার কাছে যান। আপা, দেখো, রাসেল কী বলে। কাঁদে আর বলে, না, কাঁদছি না তো। চোখে কুটা পড়েছে।
বাইরে পাকিস্তানি আর্মির লোকেরা পাহারা দিচ্ছে। রাসেল তাদের সামনে তো জয় বাংলা বলতে পারে না, বলে, জয় জয় জয়, গাছের পাতা হয়।
জামাল বারান্দায় উঁকিঝুঁকি মারেন। ১৭ বছরের ছেলের পক্ষে কি ঘরে আটতে থাকা সম্ভব?
মিলিটারির লোকেরা বলে, খবরদার ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করবে না। ধরে পা ওপরে তুলে মারতে মারতে মেরেই ফেলব।
জামাল রেহানাকে বলেন, দ্যাখ, কবে যে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে! আমি বরং বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যুদ্ধে যাই। তাতেই আমি বেঁচে যেতে পারব। কবে যে আমি মামা হব? ভাগনে হোক, ভাগনি হোক, মুখটা দেখেই আমি চলে যাব।
রাতে সবাই মিলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনেন। সবচেয়ে বেশি মন দিয়ে শোনেন রেনু। রাসেলের মুখস্থ হয়ে যায় এই গান : জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়ই।
একদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসে একটা আহ্বান : ওরা মানুষ হত্যা করছে, আসুন আমরা পশু হত্যা করি।
আরে এ তো কামালের গলার আওয়াজরেনু বলেন।
এই ঘোষণা এরপর মাঝেমধ্যেই দেওয়া হতো আর হাসিনা, রেহানা, জামাল, রেনু, ওয়াজেদ মিয়া সবাই বলতেন হা হা এটা কামালের গলা। কামাল ভাইয়ের গলা। তখন তাদের মধ্যে একটা গভীর আশ্বাস কাজ করতে লাগল। যাক, কামাল ঠিকমতো মুজিবনগরে পৌঁছে গেছেন। আর জামাল বলতে লাগলেন, আমিও যুদ্ধে যাব। মুজিবনগর যাব। ঠিক যুদ্ধে যোগ দিতে পারব।
রাসেল বলল, আব্বার নগরে যাবা? আব্বার দেখা পাবা?
তখন সবাই চুপ হয়ে গেল।
হাসিনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। বাড়ির প্রহরারত সৈন্যদলের প্রধান একজন মেজর। ওয়াজেদ মিয়া তার সঙ্গে কথা বললেন। মেজর জানালেন, হাসিনার যেহেতু বিয়ে হয়ে গেছে, তিনি অন্য বাড়ির মেয়ে, কাজেই তিনি তার স্বামীর সঙ্গে বাইরে যেতে পারবেন। ওয়াজেদ মিয়া গাড়ি এনে দাঁড় করালেন বাড়ির সামনে। হাসিনা অতিকষ্টে হেঁটে এসে গাড়িতে উঠলেন। ওয়াজেদ সাহেব গাড়ি চালিয়ে গেলেন ডা. এম এ ওয়াদুদ সাহেবের ক্লিনিকে। হাসিনার শরীর ভালো না। একে তো খেতে ইচ্ছা করে না, তা-ও। ভালো, কিন্তু খেতে ইচ্ছা করলে খাবারই-বা পাবেন কোথায়। ১৭ বছরের। আবদুলকে অবশ্য বাইরে বাজার করতে পাঠানো যায়। কিন্তু সে তো দিনে। মাত্র একবার। বাড়িতে ফ্রিজ নেই যে কোনো খাবার রেখে দেওয়া যাবে।
ওয়াদুদ সাহেব ভালো করে চেকআপ করলেন। বললেন, যদিও ডেট আগস্টে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, তাড়াতাড়িই ভর্তি করিয়ে দিতে হবে। হাসিনাও জানালেন, তিনি ব্যথা অনুভব করেন।
এরই মধ্যে বাড়ির প্রহরায় নিযুক্ত দলের কমান্ডার মেজর হোসেনের বদলে এসেছেন মেজর ইকবাল। তার ব্যবহার খুবই খারাপ।
যখন হাসিনাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হবে, রেনু। বললেন, আমিও মেয়ের সঙ্গে যাব। আমি মা। আমার মেয়ের বাচ্চা হওয়ার। সময়টাতে আমি তার পাশে থাকব।
মেজর ইকবাল বললেন, না। তা হবে না। ওপরের অর্ডার। বেগম মুজিব। কিছুতেই বাইরে বের হতে পারবেন না।
হাসিনা কাঁদতে কাঁদতে গাড়িতে উঠলেন। রেনুও কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে বিদায় দিলেন।
তখন খোকা বের হয়ে গেলেন হাসিনাদের ছোট ফুফু লিলির বাসায়। লিলিকে জানালেন সব কথা। লিলি বললেন, আমিই গিয়ে হাসুর সঙ্গে কেবিনে থাকব।
জুলাই ১৯৭১। আরবান গেরিলারা ঢুকে পড়েছে ঢাকায়। তারা একটার পর একটা অপারেশন করছে। ঢাকা শহরের মিলিটারি পোস্ট, কেপিআই বা কি পয়েন্ট ইনস্টলেশনে হামলা হচ্ছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা মারা যাচ্ছে। এর মুখে-ওর মুখে সেসব কথা পত্রেপুষ্পে পল্লবিত হচ্ছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী, বিবিসিতেও সেসব খবর শোনা যাচ্ছে। আর ওয়াজেদ মিয়া কিংবা খোকা যখন বাইরে যান, এসব খবর পান। এসে রেনুকে শোনান। হাসিনাকে শোনান। ১৯ জুলাই গেরিলারা ঢাকার কতগুলো পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দিল। পরের দিন সেই খবর প্রচার করল স্বাধীন বাংলা বেতার। কেন্দ্র। রেনু বললেন খোকাকে, এই সব অপারেশনে কি কামালও আছে?
.
২৭ জুলাই রাত আটটার দিকে হাসিনার কোলজুড়ে আসে এক পুত্রসন্তান। হাসিনার লিলি ফুফু বাচ্চা দেখেই বলে, ছেলে হয়েছে, দেখতে একদম তার দাদার মতো হয়েছে।
ওয়াজেদ মিয়া হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আজান দিলেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে হাসিনা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনেন। ওয়াজেদের মুখেও মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের কথা শোনেন। তাঁর ব্যথা অনেকটাই কমে যায়।
রেনু গৃহবন্দী। কাঁদেন। ওয়াজেদের কাছে, খোকার কাছে খোঁজ নেন, হাসু কেমন আছে?
খোকাকে তিনি বললেন, ও খোকা। হাসুর কী খবর। ভাইডি যা না একটু ফোন কর না!
খোকা তখন বাড়ি থেকে বের হলেন। গেলেন পাশের বাড়িতে। এটা কবি সিকান্দার আবু জাফরের বাসা। গিয়ে বললেন, ফোন করব। ফোন করার জন্য খোকা এর আগেও এ বাড়িতে এসেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফোন করে কেবিন নম্বর দেওয়া হলো। একটু পরে লিলির গলা শোনা গেল।
