কিসিঞ্জার বললেন, ইয়াহিয়া কোনো প্রতিভাবান নন।
আচ্ছা। নিক্সন ভাবলেশহীনভাবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এটা আমার ধারণা যে ইয়াহিয়া এবং তাঁর সঙ্গীরা আইকিউয়ের জন্য কোনো পুরস্কার পাবেন না। কিংবা তাদের রাজনৈতিক বোধের জন্যও না। তারা অনুগত, মাথামোটা সৈনিক।
কিন্তু তাদের সত্যিকারের বুদ্ধিগত সমস্যা আছে, তারা বোঝে না কেন পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের অংশ থাকতে পারে না।
কী রকম?
ইয়াহিয়া এবং তাঁর সহকর্মীরা এটা বুঝতেও পারেন না যে ভারত তাদের সঙ্গে যুদ্ধের পরিকল্পনা করছে।
আচ্ছা।
আর যদি যুদ্ধ বাধেও, তাহলে তাঁদের ধারণা তারাই জয়লাভ করবেন।
তাই নাকি। কীভাবে?
এই প্রশ্নটাই আমি তাদের করেছিলাম, আপনারা কেন ভাবছেন যে আপনারা ভারতের বিরুদ্ধে বিজয়ী হবেন। ভারত তো সব সৈন্যসংখ্যা ও অস্ত্রবলে আপনাদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। তখন তাঁরা কী বললেন, জানেন?
কী বললেন?
বললেন যে ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম সৈন্যরা উন্নততর।
হুঁ।
তারপর আমি বললাম আমার পেটব্যথা। ডিনারের সময় বললাম। তখন ইয়াহিয়া চিৎকার করতে লাগলেন, সবাই বলে আমি একজন একনায়ক। তিনি প্রতিটা টেবিলে গেলেন, প্রত্যেক অতিথিকে ধরে ধরে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, অ্যাম আই আ ডিক্টেটর? আমি কি একজন স্বৈরশাসক?
তিনি আমার কাছেও এলেন। আমাকে বললেন, মিস্টার কিসিঞ্জার, আমি
কি একজন ডিক্টেটর?
আমি বললাম, আমি তো জানি না। তবে এইটা আমি জানি, আপনি এমন একটা লাউজি ইলেকশন করেছেন, যেটা একজন ডিক্টেটর করতে পারে না।
.
কিসিঞ্জারের পেটব্যথা খুবই বেড়ে গেল।
তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে নাথাইগলিতে।
এর আগে আমেরিকান নিরাপত্তাকর্মীরা জায়গাটা ঘুরে গেছেন। তারা সেখানে যাওয়ার পথে উট দেখে লাফিয়ে উঠেছিলেন, উট উট। ভালুক দেখে তো তারা অজ্ঞান, ভালুক ভালুক।
ভোজসভা শেষে সব অতিথিকে বিদায় করে দিয়ে অতিগোপনে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো রাওয়ালপিন্ডির বিমানবাহিনী সাইটে। সেখান থেকে তিনি পিআইএর একটা বিমানে চড়ে উড়ে গেলেন।
কিন্তু সবাই জানল যে তিনি প্রেসিডেন্ট হাউসেই আছেন। তাঁর পেটে ব্যথা।
তাঁর এত পেটব্যথা যে তাঁকে নাথিয়াগলিতে বিশ্রামে রাখতে হবে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডকে নিয়ে মোটর শোভাযাত্রা রওনা হলো নাথিয়াগলির দিকে।
কিসিঞ্জার পৌঁছালেন পিকিংয়ে।
এদিকে নাথাইগলিতে একজন নিরাপত্তাকর্মী সত্যি সত্যি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে দেখানোর জন্য অ্যাবোটাবাদ থেকে একজন ডাক্তার ডেকে আনা হলো।
তিনি রোগী দেখার পর বললেন, কিসিঞ্জার কই?
তাঁকে বলা হলো, আছেন। আপনার জানার দরকার নাই।
তিনি অসুস্থ। আমি ডাক্তার। আমি অবশ্যই কিসিঞ্জারকে দেখব।
না না। দেখা চলবে না।
ওই ঘরেও তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি কিসিঞ্জার নিখোঁজ!
তিনি নিজ দায়িত্বে এসপিকে বললেন, কিসিঞ্জার নিখোঁজ হয়েছে।
এসপি ভাবলেন এত বড় খবরটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো দরকার।
তখন সেই এসপিকে হাতে-পায়ে ধরে থামানো হলো। কিসিঞ্জার কোথায় গেছে, এটা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য। এটা নিয়ে কোনো কথা বললে আপনার চাকরি যাবে।
সবার ধারণা কিসিঞ্জার গেছেন বন্দী শেখ মুজিবের সঙ্গে গোপন বৈঠক করতে।
আরেকটি খবরও রটেছিল। কিসিঞ্জার বন্দী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন। এ খবর পত্রিকাতেও প্রকাশ হয়। পরে পাকিস্তান সরকার বিবৃতি দিয়ে এই খবরের সত্যতা অস্বীকার করে।
.
তবে একজন পাকিস্তানি সাংবাদিক খবরটি লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ অফিসে পাঠালেন–কিসিঞ্জার চীনে। ডেইলি টেলিগ্রাফ খবরটি গাঁজাখুরি হিসেবে বিবেচনা করে বাজে কাগজের ঝুড়িতে দিল ফেলে।
তিন দিন পর কিসিঞ্জার পাকিস্তানে ফিরে এলেন একই প্লেনে।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, কিসিঞ্জারের লগে চীনের প্রধানমন্ত্রীর কী কথা হইল?
ব্যাঙ্গমি বলল, কী কথা হইল। শুনো তাইলে…
.
কিসিঞ্জার বললেন, মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, আমরা ভারতকে সামরিক সরঞ্জাম দিই না।
হ্যাঁ। আমি তা-ই শুনেছি। কিন্তু আপনারা পাকিস্তানকে কিছু অস্ত্র দিচ্ছেন। চৌ এন লাই মাথা নেড়ে বললেন।
হ্যাঁ। আপনারাও তো তা-ই করেন।
চৌ এন লাই বললেন, তথাকথিত বাংলাদেশ সরকারের হেডকোয়ার্টার ভারতে। এটা কি পাকিস্তান সরকারের জন্য ক্ষতিকর নয়?
আপনি জানেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে আমরা খুব পছন্দ করি। আমরা তার এবং তার দেশের জন্য গভীর বন্ধুত্ব অনুভব করি।
চৌ এন লাই বললেন, দয়া করে ইয়াহিয়া খানকে বলবেন, যদি ভারত কোনো আগ্রাসন চালায়, তাহলে আমরা পাকিস্তানের পক্ষ নেব। আপনারাও তো তা-ই নেবেন।
আমরা অবশ্যই ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা করব। কিন্তু সামরিক দিক থেকে আমাদের কিছু করার নেই।
আপনারা তো অনেক দূরে।
হ্যাঁ। আমরা ১০ হাজার মাইল দূরে।
আপনারা ভারতকে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করুন।
চীন তো কাছে।
হ্যাঁ। আমরা ১৯৬২-এর যুদ্ধে ভারতকে হারিয়ে দিয়েছিলাম। সেটা আমরা আবার করতে পারি।
চীন নিক্সনকে আমন্ত্রণ জানাবে এমন কথার মধ্য দিয়ে কিসিঞ্জার প্লেনে উঠলেন। তাঁকে দেওয়া হলো অনেক চীনা ফল, মাও সে তুংয়ের বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ। এবং এই ট্রিপের ফটো অ্যালবাম।
কিসিঞ্জার হাসতে হাসতে বললেন, আপনাদের দেশে অনেক বিদেশি এসেছে, আগ্রাসন করেছে। কিন্তু আমার মতো এত অসভ্যভাবে বোধ হয় আর কেউ আসেনি।
৫২
রাসেলের খুব কান্না পায়। তার আব্বার কথা মনে পড়ে। তার কামাল ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। তার মনে পড়ে জামাল ভাইয়ের কুকুর দুটো–টমি আর টিকলির কথা। কিন্তু সে তো প্রকাশ্যে কাঁদতে পারে না। সে তো বড় হয়ে গেছে। তার বয়স ৬+। কিছুদিন পরে ৭ হবে। সে কীভাবে সবার সামনে কাঁদবে।
