নিক্সনের যেমন কিসিঞ্জার, ইন্দিরা গান্ধীর তেমনি হাকসার। পি এন হাকসার সাউথ ব্লকে তার অফিসে কিসিঞ্জারের মুখোমুখি হলেন।
হাকসার বললেন, আমি নিউইয়র্ক টাইমস-এ পড়েছি, আমেরিকা পাকিস্তানকে ২৯ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিচ্ছে। এটা কী করে সম্ভব?
কিসিঞ্জার মাথা চুলকান। দার্জিলিং চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এর গন্ধ উপভোগ করতে করতে বললেন, আমিও কাগজেই পড়েছি।
এই চালান আপনাদের বন্ধ করতে হবে।
এটা এত সামান্য যে এর কোনো দামই নেই। বাদ দিন তো। এসব অস্ত্র মারণাস্ত্র নয়। মানুষ মারার কোনো ক্ষমতাই এসবের নেই।
অস্ত্রের মানুষ মারার ক্ষমতা নেই, এসব দিয়ে ফুলবাগানে সার বানানো হবে?
আপনি কি শুধু এই সামান্য বিষয় নিয়েই কথা বলবেন, তাহলে আমার আর কিছুই বলার নেই।
কথাটা একটু বেশি কড়া হয়ে গেল নাকি? কিসিঞ্জার ভাবলেন। কড়া ডোজটাকে একটু মিষ্টি দিয়ে ঢাকা দরকার। তিনি বললেন, আমার প্রেসিডেন্ট নিক্সন বলেন, ভারত একটা বিশাল পাওয়ার, কিন্তু এদের পাওয়ার হচ্ছে শান্তি আর স্থিতিশীলতা আনবার পাওয়ার।
হাকসার বললেন, ধর্মই যদি একটা রাষ্ট্র হওয়ার শর্ত হয়, তাহলে পুরো ইউরোপ তো রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকতে পারত। দেখুন, আমাদের দেশে সত্তর লক্ষ শরণার্থী এসেছে, এদের ৯০ শতাংশ হিন্দু। আমরা তো একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। পাকিস্তান আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার ওপরে আক্রমণ করছে।
কিসিঞ্জার বললেন, ভারত একটু বেশি চিল্লাচিল্লি করছে। এটা করে ইস্ট পাকিস্তানে তারা আগ্রাসন চালানোর প্লট তৈরি করছে।
আর এত শরণার্থী যে আমাদের দেশে ঢুকে পড়েছে!
ভারত বাঙালিদের সাপোর্ট করে জিনিসটা উসকে দিচ্ছে।
তোমাকে আমি খোলাখুলি একটা কথা বলি, কোনো রাখঢাক না রেখে-বললেন হাকসার, ভারত বাঙালি গেরিলাদের কোনো রকমের অস্ত্র দিচ্ছে না। (লেখক গ্যারি জে ব্যাস বলেন, যখন আমেরিকা কিংবা ভারত কোনো মিথ্যা কথা বলে, তার আগে তারা এই কথা বলে, একটা কথা খোলাখুলি বলি।)
কিসিঞ্জার চাইছেন হাকসারকে ঠান্ডা করতে। তিনি বললেন, তোমরা একটু কম উত্তেজিত হও। তোমরা যদি ঠান্ডা হও, আমরা আগামী কয়েক মাসে শরণার্থী সমস্যার সমাধানে কাজ করতে পারি।
হাকসার বললেন, আমরা যুদ্ধে যেতে চাই না, কিন্তু আমরা জানি না যুদ্ধে না গিয়ে কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যাবে।
কিসিঞ্জার বললেন, আমরা আসলে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি চাই। যদি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়, চীন চুপ করে থাকবে না, পাকিস্তানের পক্ষ নেবে, তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পক্ষ নেবে, তাহলে আমেরিকার পক্ষে তো চুপ করে বসে থাকা চলবে না।
হাকসার বললেন, সে ক্ষেত্রে আমেরিকার উচিত ভারতের পক্ষ নেওয়া।
কিসিঞ্জারের সকালটা গেল বাথরুমে, কমোডে দুবার বসে থেকে। ভারতের জীবাণুরা তাঁকে আক্রমণ করেছে। তবে এটা স্ক্রিপ্টে ছিল না। তার স্ক্রিপ্টে আছে, পাকিস্তানে গিয়ে তিনি অসুস্থ হবেন, আর গোপন ঘরে একা থেকে চিকিৎসা নেবেন। ওই ফাঁকে দুনিয়ার চোখ এড়িয়ে তিনি যাবেন পিকিং।
জীবাণুদের আক্রমণের প্রতিক্রিয়া কমোডে ব্যক্ত করে তিনি গেলেন ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে প্রাতরাশ করতে। কে সুব্রামানিয়াম, ভারতের রণবিদ্যাবিশেষজ্ঞ পণ্ডিত, আক্রমণ করে বসলেন কিসিঞ্জারকে, তুমি নিজে একজন রিফিউজি। তুমি জানো না রিফিউজিদের কী বেদনা! ১৯৩০-এর দশকে ইহুদিদের ওপরে অত্যাচার শুরু হলে হিটলারের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে তোমরা যে ভুল করেছ, আজকে সেই একই ভুলের হুবহু পুনরাবৃত্তি করছ।
দুপুরে হাকসারের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজনও একই রকমের তিক্ততায় বিস্বাদময় হয়ে পড়ল। তবে কিসিঞ্জার ভারতীয় প্রতিপক্ষদের, হাকসারকে, শরণ সিংকে আশ্বস্ত করলেন, আমেরিকা চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাইছে, তবে চীন যদি ভারত আক্রমণ করে বসে, আমেরিকা ভারতের পক্ষই নেবে।
ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কিসিঞ্জার বৈঠকে বসেছেন। ইন্দিরা গান্ধী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, ৭০ লাখ শরণার্থী! এই চাপ আমি শুধু ইচ্ছাশক্তির জোরে বহন করছি।
কখন আপনাদের সইবার ক্ষমতা শেষ হবে?
অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। পাকিস্তান কী করছে? সবকিছুতেই হিন্দু-মুসলিম। সবকিছুইতেই জিহাদ। ভারতে তো ছয় কোটি মুসলমান আছে, নাকি! আপনারা পাকিস্তানকে অস্ত্র আর টাকাপয়সা দিয়েই যাচ্ছেন।
না না, সামান্য। খুব সামান্য।
এটা খুব বেশি না খুব সামান্য, তার প্রশ্ন নয়। এটা তো একটা সাইকোলজিক্যাল এবং রাজনৈতিক উৎসাহ যে এসব অপকর্ম আরও করতে পারো। আমরা সহ্য করছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বেধে যাবে না, এটা আমরা বলতে পারি না।
আসলে আমরা ভাবতেও পারিনি যে পাকিস্তান এই রকমের আক্রমণ করে বসবে। শোনেন, আপনারা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, ৫০ কোটি মানুষ, আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকতে চাই। যদি চীন ভারত আক্রমণ করে, আমেরিকা ভারতের পক্ষে থাকবে।
ভারতীয়রা এই একটা কথাই গ্রহণ করল।
.
এরপর কিসিঞ্জার উড়ে গেলেন পাকিস্তানে। ইয়াহিয়ার সঙ্গে তাঁর মুখোমুখি দেখা হলো, ওয়ান টু ওয়ান। রাওয়ালপিন্ডির কাছে, প্রেসিডেন্ট ভবনে। পুলিশরা যে ভবনটাকে বলে থাকে পতিতালয়।
ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের বিবরণ নিক্সনকে কিসিঞ্জার এভাবে দেবেন—
