আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…
মেজর হায়দার নির্দেশনা দিলেন, এরপর কী করা হবে। প্রথমে পাঠানো হবে মন্দাবাগে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের রেগুলার সোলজারদের পাশাপাশি থেকে যুদ্ধ করার জন্য। সেখানকার যুদ্ধাভিজ্ঞতা তোমাদের কাজে লাগবে। এরপর তোমাদের পাঠানো হবে ঢাকা শহরে। তোমরা ঢাকা শহরে গেরিলা অ্যাটাক করবে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠবে।
মেজর খালেদ মোশাররফ শপথবাক্য পাঠ করালেন। এরপর সবাই স্লোগান ধরল :
জয় বাংলা।
জয় বাংলা।
মহান জাতির মহান নেতা
শেখ মুজিব শেখ মুজিব
তোমার নেতা আমার নেতা
শেখ মুজিব শেখ মুজিব।
.
তৌফিক উত্তেজিত। তারা যুদ্ধে যাবে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের সঙ্গে যাবে মন্দাবাগ। সরাসরি যুদ্ধ। যদিও ক্যাম্পের খাবার তার পেটে সহ্য হয়নি। পেটের পীড়ায় ভুগেছে সে।
তাদের একটা করে রাইফেল দেওয়া হয়েছে। চারটা করে অ্যামুনিশন ক্লিপ। প্রতিটায় ১০টা করে গুলি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রাক ৩৮ জন। গেরিলাকে মন্দাবাগ স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে নামিয়ে দিয়ে গেল। ধানখেত, মাঠ, চষা খেত, ছোট জলা পেরিয়ে তারা পৌঁছালেন অপারেশন হেডকোয়ার্টার্সে। মুজিব ব্যাটারির কামান দেখতে পেলেন। দেখতে পেলেন। গোলন্দাজদের। তাদের পরনে লুঙ্গি, গায়ে গেঞ্জি। আবারও হাঁটা। মন্দাবাগে পৌঁছানোর পর তাদের স্বাগত জানালেন কমান্ডার এইচ এম এ গাফফার।
৫১
চীনে যাচ্ছি। চীনে যাচ্ছি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের মস্তিষ্কের কোষে কোষে একটা মৌমাছি একটা গুঞ্জনই তুলে চলেছে অবিরাম। আমি তারে পারি না এড়াতে। সব কাজ তুচ্ছ মনে হয়। চীনের সঙ্গে আমেরিকার প্রকাশ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। চীনে আমেরিকার কোনো দূতাবাস নেই। আমেরিকায়ও চীনের কোনো দূতাবাস নেই। যা আছে তা হলো নিউইয়র্কে, জাতিসংঘ দপ্তরে। কিন্তু শীতল যুদ্ধের এই সময়ে আমেরিকা জানে, চীনের সঙ্গে দোস্তিটা খুবই দরকার। বিশেষ করে সোভিয়েত-চীন যুদ্ধের পর এই প্রেম অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কিসিঞ্জার যাচ্ছেন অভিসারে। অতিগোপনে তিনি যাবেন চীনে। সে জন্য তাকে যেতে হবে প্রথমে ভারতে। তারপর পাকিস্তানে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, যিনি কিনা নিক্সনের অনির্বচনীয় প্রেমের উৎস আর গন্তব্য, তিনি এই প্রেমের দূতিয়ালি করছেন। আমেরিকার কাছে ইয়াহিয়ার গুরুত্বের একটা গোপন কারণ এই দৌত্য। কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম এই যে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানে যেতে পারেন না, যদি না আগে তিনি ভারতে যান।
কিসিঞ্জার ভারতে যাবেন, থাকবেন মাত্র দুই দিন। এটাও ভারতকে একটা শিক্ষা দেবে। যদি ভারতীয়দের শেখার আদৌ কোনো ইচ্ছা থেকে থাকে।
সখী কেমনে বাধিব হিয়া, আমার বঁধুয়া আনবাড়ি যায় আমার আঙিনা দিয়া-ভারত যদি জানত, আসলে কিসিঞ্জার যাবে চীনে, তাহলে হয়তো এই গানটাই গাইত।
কিসিঞ্জার একটা প্লেনে উঠেছেন, জুলাইয়ের ৬ তারিখে। ট্যাকটিক্যাল এয়ার কমান্ডের কাছ থেকে এই প্লেনটা ধার করে নেওয়া হয়েছে, কারণ প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজগুলো একটাও আজার নাই। ভয়াবহ একটা প্লেন, কিসিঞ্জার বিড়বিড় করেন। এটা কি আকাশ দিয়ে যাচ্ছে, নাকি চন্দ্রপিঠে চাকার ওপর দিয়ে দৌড়াচ্ছে। এর চেয়ে ভারত-পাকিস্তানের গরুগাড়িগুলো বেশি আরামদায়ক নয়? উফ, কী ঝাঁকি দিচ্ছে রে বাবা। এই রকমের একটা ভয়াবহ উড়াল শেষে দিল্লি এয়ারপোর্টে নামার সময় কিসিঞ্জার আবার নিজেকে বললেন, আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সফরটা আমি করতে যাচ্ছি, আমি চীনে যাচ্ছি।
দিল্লি তখন বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে। বৃষ্টি বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে দিল্লি বিমানবন্দরে সমবেত হয়েছে ভারতীয় বিক্ষোভকারীরা। গ্যারি জে ব্যাস দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম বইতে তার সরস মনোহর বর্ণনা দেবেন। বিক্ষোভকারীরা চিৎকার করছে, বড় বড় ব্যানারে লিখে এনেছে, খুনি কিসিঞ্জার ফিরে যাও, কিসিঞ্জার অব ডেথ, গো ব্যাক। বিক্ষোভকারীরা সঙ্গে করে এনেছে পচা টমেটো আর পচা ডিম। পচানোর জন্য তাদের দিল্লির প্রচণ্ড গরমে এই ডিম আর টমেটোগুলো তিন দিন ঘরের ছাদে, আঙিনায় ফেলে রাখতে হয়েছে। কিসিঞ্জার এবং তার সঙ্গী-সাথিদের গাড়িবহরে তুলে গোপন পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দিল্লির অশোকা হোটেলে। বিক্ষুব্ধ জনতা এয়ারপোর্টের বাইরে যে গাড়িকে বেরোতে দেখছে, তাতেই ডিম আর টমেটো ছুঁড়ে মারছে। গন্ধে দিল্লির বৃষ্টিভেজা বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠছে। বিক্ষোভকারীরা সমবেত হয়েছে দিল্লির আমেরিকান দূতাবাসে। সেখানে তারা গেট ভেঙে সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়ে, খুনি কিসিঞ্জার ফিরে যাও বলতে বলতে পরবর্তী গেট ভাঙতে যাচ্ছে, আর ইউএস ম্যারিনরা তাজ্জব হয়ে তাদের কাণ্ড দেখছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় মতো। দিল্লি পুলিশ এসে তাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। বৃষ্টির মধ্যে একটা লাল পতাকা আমেরিকান দূতাবাসের আঙিনায় মাটিতে গাঁথা হয়ে থাকে।
ভারতীয়রা আনুষ্ঠানিকভাবে কিসিঞ্জারকে বলে, পশ্চিম বাংলা ত্রিপুরা সীমান্তে যে শত শত শরণার্থীশিবির আছে, সেসবের যেকোনো একটা পরিদর্শনে চলুন। আমেরিকান ডলার দিয়ে কী করা হচ্ছে, স্বচক্ষে দেখুন, দাদা। কিসিঞ্জার বললেন, না। প্লেনে এমন ঝাঁকুনি খেয়েছি যে পশ্চাদ্দেশে ব্যথা হয়ে গেছে। নিতম্বেরও খানিকটা বিশ্রাম তো চাই।
