এখন নাশতা খেতে খেতে পাশার তার আম্মার কথা মনে পড়ে। আম্মা তার বড় ছেলের খাওয়া নিয়ে কী যে করতেন! পাতে মাংস, মাছ তুলে তুলে দিতেন। মাঝে মাঝে নিজেই খাইয়ে দিতেন। পাশার চোখ ছলছল করে। মনে পড়ে দুই ছোট ভাই রামা আর ডারার কথা। ওরা এখন কী করছে?
মাঝেমধ্যে মেজর খালেদ মোশাররফ আসেন। তাঁকে প্রথম পাশা দেখে বিকেলে, তিনি একটা পাহাড় থেকে নেমে আসছিলেন, সেটা ছিল পুব দিকে, আর পশ্চিম থেকে আসা অস্তগামী সূর্যের হলুদ আলো এসে পড়েছিল খালেদের চোখে, মুখে, চুলে। তাঁকে সোনার তৈরি গ্রিক দেবতার ভাস্কর্য বলে মনে হচ্ছিল। হাফহাতা বুশ শার্ট পরা খালেদ মোশাররফ তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, এই ছেলে, তুমি এখানে কী করো?
স্যালুট দিয়ে পাশা বলল, স্যার আমি যুদ্ধ করতে এসেছি। ট্রেনিং নিচ্ছি।
তোমার বয়স কত?
১৫ স্যার।
তাহলে তুমি এখানে কেন?
আমি স্যার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছি। আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমি লড়াই চালিয়ে যাব।
খালেদ পাশার পিঠে হাত রাখলেন, দুটো চাপড় মেরে বললেন, শাবাশ। তোমার মতো ছেলেদের দেখে আমরা ভরসা পাই, যুদ্ধে আমরা জয়ী হবই।
একদিন বিকেলে মেলাঘরের মাঠে সমবেত হলো ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কয়েক শ জওয়ান। তারা সার বেঁধে বসল নিয়মমাফিক। মোটিভেশনাল ক্লাস। লেকচার দেবেন আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী, পরিষদ সদস্য। দুপুরের খাওয়াটা তেমন ভালো হলো না। মিজান চৌধুরীর একটু পান। চিবোনো দরকার। পানের কৌটাটা খুলে দেখলেন পান নেই। একটু সুপুরি পেলেন, সেটাই চিবুতে চিবুতে হাজির হলেন খোলা মাঠে। চারদিকে পাহাড়। দূরে ঘন জঙ্গলের ওপারে নীল পাহাড়ের হাতছানি।
মাইক্রোফোনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
খালেদ মোশাররফ বললেন, আমরা আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে পেয়েছি। তোমরা জিজ্ঞেস করো, আওয়ামী লীগ তোমাদের জন্য কী করেছে?
মিজান চৌধুরী কাউকে আর মাইক্রোফোন দিলেন না। তিনি বলতে লাগলেন, ভুলে যাবেন না, আপনারা ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্য। আপনারা কীভাবে ভারতে আশ্রয় পেলেন? কেন ভারত আপনাদের আশ্রয় দিল? এই ব্যবস্থা কে করেছে? আপনাদের খাওয়া-পরা, অনুশীলন, প্রশিক্ষণ–এই ব্যবস্থা কে করেছে? পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের কারণে। আজকে যে সারা দেশের মানুষ এক দেহ এক মন হয়ে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রাণবাজি রেখে লড়ছে, এই উদ্দীপনা, এই প্রেক্ষাপট, এই পটভূমি কে তৈরি করে দিয়েছে? আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটা করেছেন আওয়ামী লীগ সংগঠনের মাধ্যমে। সারা দেশে প্রতিটা জেলায়, প্রতিটা মহকুমায়, প্রতিটা থানায় ২৫ মার্চ থেকে যে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়, সেটা কে করে? কীভাবে করে? কেন করে? আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি করে, যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে করে। করে, কারণ শেখ মুজিবুর রহমান এই নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
পরে ফেরার পথে গাড়িতে সঙ্গী আবদুল মালেক উকিল, সংসদ সদস্য নুরুল হক, ক্যাপ্টেন সুজাত আলীর সঙ্গে এই নিয়ে কথা হচ্ছিল মিজান চৌধুরীর।
মিজান চৌধুরী বললেন, খালেদ মোশাররফ মেজর হায়দারের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একটা বিরূপ মনোভাব আছে। তারা বলতে চায়, সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ নেতারা আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন, মোটিভেটর হিসেবে ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে বক্তৃতা করছে, আর যুদ্ধ করছে তারা।
নুরুল হক বললেন, ঠিক। এটা যে একটা পলিটিক্যাল ওয়ার, পলিটিকস না থাকলে তাদের কাজটা যে টেররিজম বলে সারা পৃথিবীতে অগ্রহণযোগ্য হতো, এটা কি তারা বোঝে না?
মিজান চৌধুরী বললেন, ক্যাপ্টেন সুজাত, আপনি ভালো বলতে পারবেন। তবু আমি আমার মতটা বলি। আমাদের আর্মির ট্রেনিংটা হয়েছে পাকিস্তানে। পাকিস্তানি অফিসারদের মতো সিভিল সমাজকে হেয় করে দেখার এই মানসিকতা আমাদের বাঙালি অফিসারদের কারো কারো মধ্যেও আছে। তার মধ্যে এই অফিসারদের অনেকেরই ফ্যামিলি রয়ে গেছে দেশে। তাদের জন্য দুশ্চিন্তায় আর ভারতের মাটিতে এসেও পূর্ণাঙ্গ অস্ত্রশস্ত্র, কামান, ট্যাংক, বিমান না পাওয়ায় তাদের মানসিক ভারসাম্য কখনো কখনো লোপ পেয়ে যায়। একমাত্র জিয়াকে দেখি এই মনের চাপটা দমিয়ে রাখতে পারেন। একদিন অবশ্য আগরতলার সাবরুমে তিনি তাঁর ফ্যামিলির কথা মনে করে আমার সামনে চোখের জল ঝরিয়েছিলেন নীরবে।
আবদুল মালেক উকিল বললেন, জিয়াউর রহমানের মধ্যেও অ্যাম্বিশন আছে। তা না হলে কী করে চট্টগ্রাম রেডিওর ঘোষণায় একবার সে নিজেকে বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রধান হিসেবে ঘোষণা দেয়?
মিজান চৌধুরীদের গাড়ি আগরতলা এসে পৌঁছায়।
.
পাশাদের ট্রেনিং শেষ হলো।
এবার সমাপনী অনুষ্ঠান। খালি পা, লুঙ্গি পরা, ছেঁড়া গেঞ্জি মুক্তিযোদ্ধারা লাইনে দাঁড়াল। হাতে রাইফেল। শাহাবুদ্দিনের আঁকা বঙ্গবন্ধুর ছবিটা একটা বড় খুঁটির ওপরে টাঙানো। আরেকটা বাঁশের খুঁটিতে বাংলাদেশের পতাকা তুললেন মেজর খালেদ মোশাররফ।
মুক্তিযোদ্ধারা, গ্রাম থেকে আসা চাষি মুক্তিযোদ্ধা, কুলি মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা, তৌফিকদের মতো শাহিন স্কুলে পড়া মুক্তিযোদ্ধারা সবাই মিলে গাইতে লাগল :
