এরপর পাশা কি ঘরে বসে থাকতে পারে?
মানিক ভাই তাদের মেলাঘর যাওয়ার নির্দেশিকা দিয়েছেন, সেটা ধরে, তিন দিন, তিন রাত বাস, রিকশা, হাঁটা, নৌকা, হাঁটা, বাস করে তারা এসে পৌঁছেছে মেলাঘরে। মানিক ভাইয়ের বলে দেওয়া রুটটা তারা মুখস্থ করে রেখেছিল : ফুলবাড়িয়া থেকে বাসে নরসিংদী, নৌকাযোগে নবীনগর, হেঁটে কোনিকরা, হেঁটে কড়ইবাড়ি, রাত্রিযাপন, হেঁটে পীর কাশেমপুর, হেঁটে কুটি, হেঁটে ষাইটশালা, হেঁটে কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিঅ্যান্ডবি বাইপাস, রাতের বেলা সিঅ্যান্ডবি রোড ক্রস, হেঁটে রেললাইন, সীমান্ত পেরিয়ে কোনাবন, কোনাবন শরণার্থীশিবিরে রাত্রিযাপন, বাসে আগরতলা, সিপিএম অফিসে রিপোর্ট। পথে কড়ইবাড়িতে তারা ছিল এক কৃষকবাড়িতে, যার ঘরে কিছুই ছিল না, সেই কৃষকবধূ নিজেদের পর্ণকুটিরে তাদের আদর করে থাকতে দিয়েছিল, নিজের মুরগি জবাই করে মসলাছাড়া বেশি করে ঝাল আর হলুদ দিয়ে ঝোল বেঁধে খাইয়েছিল, সেই মমতার কথাও তো কোনো দিনও ভুলবে না পাশা। ১৪ জুন বেরিয়ে ১৬ জুন আগরতলা পৌঁছে টানা ষোলো ঘণ্টা হাঁটার ক্লান্তিতে ধ্বস্ত দেহটা যখন খাবার চাইছিল, তখন কাঁঠাল কিনে খেয়ে জঠরজ্বালা দূর করেছিল তারা।
আগরতলা থেকে চান্দের গাড়িতে চড়ে ৩০ মাইল পাহাড়ি পথের সবুজ বন বনানী চড়াই-উতরাই পাহাড় কেটে করা জুম কৃষিখেত দেখতে দেখতে তারা এসে পড়েছিল মেলাঘরে। ট্রেনিং ক্যাম্পটা কোথায়, জিজ্ঞেস করে পথ জেনে নিয়ে কর্দমাক্ত কাঁচা পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যবর্তী পথ ধরে এক ঘণ্টা হেঁটে অবশেষে মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্পের প্রবেশপথ। বাঁশ দিয়ে গেট বন্ধ করে রাখা। কয়েক মাইল দৈর্ঘ্য, কয়েক মাইল প্রস্থ পাহাড়, পাহাড়ের শানুদেশ, জল-জঙ্গল, বন-বনানী, উপত্যকা, মাঠজুড়ে এই ক্যাম্প। বাঁশের তৈরি ব্যারাক।
ভেতরে খবর পাঠিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর প্রবেশানুমতি। একজন নন-কমিশন অফিসার তাদের নিয়ে গেল যার সামনে, পাশা পরে জানবে যে তিনিই মেজর এ টি এম হায়দার। ধারালো চিবুক, কোঁকড়ানো চুল, বুদ্ধির ঝলকানি দেওয়া চোখ, হাফহাতা শার্ট, গাঢ় রঙের প্যান্ট, পায়ে কেডস। মেজর হায়দার প্রশ্নের পর প্রশ্ন করলেন আর পায়চারি করতে লাগলেন। পাশা কামাল বেলালের উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে জানালেন, প্রশিক্ষণ হবে ভয়াবহ কঠিন, কোর্সটা হবে সংক্ষিপ্ত, শেখানো হবে গেরিলা লড়াই, ছোট ছোট আগ্নেয়াস্ত্র চালানো আর বোমা বানানো।
তোমরা দুপুরে খেয়েছ?
না।
এই এদের খেতে দাও আর এরা কোথায় থাকবে, দেখিয়ে দাও।
এখন সকালবেলা পুরি খেতে খেতে চায়ের মগে চুমুক দিয়ে একটুখানি। দুধের সর জিবেতে চটকাতে চটকাতে পাশা ভাবছে প্রথম দুপুরের খাবারটার কথা। নায়েক রশিদ তাদের বড় একটা সেগুনগাছের নিচে বসিয়ে খাবার এনে দেবেন। পাশা তাকিয়ে দেখছে পাহাড়ের ঢালগুলোর মধ্যে একটা অংশ সমান, সেটার গাছপালা কেটে সেটাকে বানানো হয়েছে প্রশিক্ষণের মাঠ, আর পাঁচটা বাঁশের ব্যারাকের ইউ আকৃতির মধ্যখানে একটা উঠান। ব্যারাকের বাঁ পাশে উপত্যকায় রান্নার জায়গা। নায়েক রশিদ এনে দিলেন মোটা রুটি আর খেসারির ডাল। রুটি ছিঁড়তে কসরত করে খেসারির খোসাসমেত ডাল মুখে দিতেই মনে হলো, এই খাবার গরুর পক্ষেও অখাদ্য। ক্যাম্পের পুরোনো লোকেরা তাদের দুরবস্থা দেখে বলল, চিন্তার কিছু নাই, সব অভ্যাস হইয়া যাইব।
১২তম প্লাটুনের ৩৮ জনের একজন পাশা। তাদের দলনায়ক সাদেক হোসেন খোকা। শফি ইমাম আর জাহানারা ইমামের ছেলে শাফী ইমাম রুমী এই প্লাটুনেই আছে। আছেন শাহাবুদ্দিন। ছবি আঁকেন। আর্ট কলেজের ছাত্র। কয়লা দিয়ে কাগজে এঁকেছেন বঙ্গবন্ধুর মুখ।
আছেন গায়ক আজম খান। তাদের প্রত্যককে দেওয়া হলো একটা করে কম্বল। থাকার জায়গা হলো একটা বাশের খাঁটিয়া। মাথার ওপরে বাঁশের চাটাই। রাতের বেলা ছয়টা হারিকেন আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি–এই প্রতিজ্ঞায় ময়লা চিমনির ভেতর থেকে আলো দেয়। একটা করে রাইফেলও পেল পাশারা, তবে তা জমা রাখতে হলো অস্ত্রাগারে।
প্রথম দিন নাশতার পরে মেজর হায়দার নিজের পরিচয় দিলেন। ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছেন, ৬৫ সালে গ্র্যাজুয়েট, ৬৬ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ থেকে মেজর খালেদ মোশাররফের সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করছেন।
সারা দিন কঠোর প্রশিক্ষণ, খাওয়াদাওয়া, রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চিত্তবিনোদন, ৯টায় বাতি নিভিয়ে ঘুম। চিত্তবিনোদনের সময়টায় আজম খান। গান ধরেন, আর সবাই থালাবাসন দিয়ে বাজনা সংগত করে। আজম খান মান্না দের গান করেন, হেমন্তর গান করেন, নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়। আর তখন সবাই খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘের ফাঁকে চাঁদের মায়াবী মুখখানা দেখে, দেখে দূরে ওই নক্ষত্ররাজিকে–অরুন্ধতী স্বাতী। নীহারিকা সপ্তর্ষিমণ্ডল। আজম খান গান ধরেন, শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি… স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান।
রুমির বাড়ি থেকে টাকা এলে রোববার ছুটির দিনে দুপুরে ঝরনার জলে গোসল সেরে তারা যায় স্থানীয় বাজারে। একদিন আগরতলায় গিয়ে হিন্দি সিনেমা দেখে আসাও চলে। ট্রেনিং কঠোর, রাইফেল চালাতে শেখায় ভারতীয় ট্রেনার, গুলি টার্গেটে না লাগলে খেপে যায়, রাইফেলের গুলি বেরিয়ে যাওয়ার সময় কাঁধে ধাক্কা লাগে, শিশ্ন উত্থিত হয়। প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের ব্যবহার শেখানো হয়। কোনটা ডেটোনেটর, কোনটা ফিউজ…গ্রেনেড ছোঁড়া। এমনকি এলএমজি, এসএমজি, এসএলআর চালানোও শিখছে তারা।
