আব্বা, আম্মা
আমি বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগ দিতে চাই। কারণ, আমি মনে করি, আমাদের দেশের মানুষের দুর্দশা লাঘব করতে আমারও কর্তব্য রয়েছে। আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। অচিরেই আমরা বর্বর, নিষ্ঠুর পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করে বিজয়ীর বেশে বাড়ি ফিরব। শান্ত থাকার চেষ্টা করুন, নিজেদের এবং ভাই দুটির যত্ন নিন।
আব্বা-আম্মা কি চিঠিটা পেয়েছিলেন? তারা কি পড়েছেন? কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তাঁদের?
হাতমুখ ধুয়ে টিনের থালা আর টিনের মগ হাতে নাশতার লাইনে দাঁড়াল। পাশা। খাকি রঙের দুধ-চা আর তেলে ভাজা পুরি নিয়ে ব্যারাকের উঠানে ঘাসের ওপরে বসে নাশতা করতে লাগল। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছে, মাটি ভেজা।
আকাশের দিকে তাকাল, পুবের আকাশে একটা কালো মেঘের পেছন থেকে সূর্য টর্চলাইটের মতো করে রশ্মি ছড়ানোর চেষ্টা করছে, আর কদম ফুলের পাপড়ির মতো রশ্মিগুলো মেঘ ফুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
সকালের নাশতা হিসেবে পুরি তো অমৃত। ১৪ জুন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে তারা মানিক ভাইয়ের নির্দেশিত পথ ধরে এসেছে। তার সঙ্গী কামাল আর বেলাল, দুজনেই মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারের বাসিন্দা, সমবয়সী, সুতরাং বন্ধু। পল্টনের ছাত্রনেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ১৯৬৯-এর গণ আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী রেজাউল করিম মানিক যুদ্ধে গেছেন, পশ্চিম দিনাজপুরের বালুরঘাট মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করছেন, আগরতলার মেলাঘর ক্যাম্পে মেজর খালেদ মোশাররফ তাকে নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা থেকে ব্রাইট স্টুডেন্ট ইয়ুথদের যুদ্ধে পাঠাতে। পল্টনে মানিক ভাইদের বাড়িতে এই কিশোরেরা দেখা করেছিল তাঁর সঙ্গে, তিনি তাদের বারবার সাবধান করে দিয়েছেন, যুদ্ধ খুব কঠিন ব্যাপার, দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হবে, অখাদ্য জুটবে, বিছানা পাবে না, ঘুম হবে না, বাথরুম তো আর কোনো দিনও জুটবে না, মাইলের পর মাইল হাঁটতে হবে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে নাক পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকতে হবে, গুলি এসে বুকে বিঁধতে পারে, তুমি মরতে পারো, পাশের জন মরতে পারে, ধরা পড়লে প্রচণ্ড অত্যাচারের মধ্যে পড়বে, চামড়া কেটে লবণ লাগিয়ে দেবে, তবু মুখ বন্ধ রাখতে হবে, পারবে না। ফিরে যাও। পাশারা বলেছে, পারব।
পাশাদের এই কথা বলার কারণ আছে। চানখারপুলে ২৫ মার্চ রাতে গুলির শব্দ, গোলার শব্দে তারা ঘুমাতে পারেনি, সারা রাত মেঝেতে শুয়ে ছিল। কিন্তু ৩০ ইঞ্চি দেয়ালের পুরোনো বাড়িতে তারা ঠিক টের পায়নি বাইরে আসলে কী ঘটেছে। ফলে রোজ বাজার করে করে বাজারসর্দার হিসেবে সুনাম অর্জনকারী পাশা ২৬ মার্চ সকালবেলা বাজার করতে বেরোলে চারদিকে সব সুনসান আর রাস্তাঘাট পুরো ফাঁকা দেখে বিস্মিত হয়। তখন হঠাই গুলির শব্দ আসতে থাকে। কিছু বোঝার আগে সে শুধু ঠাহর করতে পারে যে কার্জন হল থেকে গুলি করতে করতে পাকিস্তানি মিলিটারি–তারা দেখতে শ্বাপদের মতো–মাথায় হেলমেট, হাতে উঁচানো অস্ত্র, পায়ে বুট, কোমরভরা কার্তুজ–সার বেঁধে চানখারপুলের দিকে আসছে। সে দৌড়ে বাসায় ঢোকে। আব্বা-আম্মা বাড়ির সব চাল, ডাল, আটার বস্তা দরজায় দিয়ে ওদের সবাইকে মেঝেতে শুইয়ে দেন। প্রচণ্ড গোলাগুলি চলে অনেকক্ষণ। তারপর একসময় নিস্তব্ধ হয়ে যায়। দুপুরবেলা পাশা চুপি চুপি দরজা খুলে বাইরে চলে যায়। আব্বা-আম্মা টের পান না। দুপুরবেলা কোনো শহরে ভুতুড়ে নীরবতা এবং নির্জনতা নামতে পারে, এই ধারণা পাশার ছিল না। মেডিকেল কলেজের বাগানের ভেতর দিয়ে সে শহীদ মিনারে গিয়ে দেখতে পায়, এটা অর্ধেকটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখান থেকে সন্তর্পণে সে হাঁটতে থাকে ভূতে পাওয়া বালকের মতো। মাথার ওপরে সূর্য, সে যাচ্ছে জগন্নাথ হলের দিকে, কেন যাচ্ছে সে জানে না, জগন্নাথ হলের মাঠের পাশে এসে তার দোজখ দেখার অভিজ্ঞতা হয়, মাঠের মধ্যে মানুষের মৃতদেহ পড়ে আছে, অসংখ্য, গুলিবিদ্ধ, রক্তাক্ত, কতটা, বিশটা, ত্রিশটা, একশটা, দুইশটা! দুইশ জন মানুষ এখানে। মরে শুয়ে আছে! এই দৃশ্য দেখার জন্য বালক পাশা তৈরি ছিল না, সে বমি করে দেবে, তার সমস্ত নাড়িভুড়ি উগরে বের হয়ে আসতে চাইছে নাক-মুখ দিয়ে। সে উল্টো দিকে দৌড়ে বুয়েটের ভেতর দিয়ে রেললাইনে চলে আসে, তারপর রেললাইন ধরে আরেক দৌড়ে চলে আসে তাদের রশিদ ভবনের সামনে। রশিদ ভবনের কাছেই আবুল আর করিমের দোকান। করিম তার চেয়ে সামান্য ছোটই হবে, আবুল তার চেয়ে বছর দুয়েকের বড় হতে পারে, তারা দুই ভাই তাদের বাবা-মাকে সাহায্য করার জন্য এই দোকানটা চালায়। পাশার সঙ্গে তার সম্পর্কটা খদ্দের-দোকানির নয়, প্রায় বন্ধুর মতো। শাটার অর্ধেক খোলা দেখে পাশা দোকানের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখে দুজন চিত হয়ে একজন আরেকজনের গায়ে পড়ে আছে, পুরো দোকানের পাটাতন রক্তে ভেসে গেছে, সেই রক্তে এখনো বুদবুদ উঠছে, হয়তো সকালে তাদের গুলি করেছে। পাশা ঘরে ফিরে আসে। ২৬ মার্চ রাতে তারা বাড়ি থেকে দেখতে পায় বিশেষ ধরনের ফ্লেম গান থেকে চানখারপুল রেললাইনের দুই পাশের বস্তিগুলোতে আগুন দেওয়া হচ্ছে, রাতের অন্ধকার চিরে আগুনের লেলিহান শিখা দপদপ করে আকাশে উঠছে, এত তাপ যেন আকাশ পুড়ে যাবে, তার আঁচ রশিদ ভবনের জানালা থেকে পাশারা দেখতে পায়, আর তাদের আব্বা আম্মা দাতে দাঁত চেপে বলতে থাকেন, জানালা থেকে সরে আয়, মেঝেতে শুয়ে পড়। বস্তিবাসী মানুষেরা, নারী-পুরুষ শিশু চিৎকার করতে করতে বাইরে আসছে, পালানোর চেষ্টা করছে, আর ব্রাশফায়ারের ট্যা টা ট্যা গুলির মুখে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে, উল্টে পুড়ে যাচ্ছে।
