কাজী জাফর কইলেন, কত দিবেন? কত কোটি?
না না। কোটি না। তবে বেশ।
টাকা লাগব না। অস্ত্র দেন।
তা তো পলিটিক্যাল ডিসিশন। নট মাই কাপ অব টি। আপনাগো লগে পরিচয় করায়া দেই, একজনরে, তিনি পারবেন।
.
যিনি এলেন তিনি মোয়াজ্জেম চৌধুরী। রেজা আলীর মামা। সিলেটে চা বাগানের মালিক। বঙ্গবন্ধু ১৯৬২ সালে রেজা আলীকে নিয়ে মোয়াজ্জেম চৌধুরীর মাধ্যমেই আগরতলা গিয়েছিলেন, স্বাধীনতায় ভারতীয় সাহায্যের কানেকশন উন্মুক্ত করতে।
রনো বললেন, আপনি না কনভেনশন মুসলিম লীগ থেকে ইলেকশন করে আইয়ুব খানের পার্লামেন্টের মেম্বার হয়েছিলেন।
মোয়াজ্জেম চৌধুরী বললেন, সবই ক্যামোফ্লেজ। শেখ সাহেব আমাকে করতে বলেছিলেন। আসলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ হলো এই মেজর জেনারেল সাহেবদের।
মেজর জেনারেল বললেন, হি ইজ আওয়ার ম্যান। হি হ্যাঁজ অলওয়েজ বিন আওয়ার ম্যান।
রনো, কাজী জাফর অবাক হলেন। শেখ সাহেব যে আগে থেকেই ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, এটা জেনে তাদের বিস্ময় যাচ্ছে না। মোয়াজ্জেম বললেন, আমি সেই কবে থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখি। এ জন্য ভারতীয়দের সাহায্য আমাদের লাগবে, এটা আমার ভালো করেই জানা ছিল। আমি শেখ সাহেবকে কনভিন্সড করেছিলাম। শেখ সাহেব বলেছিলেন, দেশের মানুষ ভারতবিরোধী। আমি আগে দেশের মানুষকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করি। তারপর আপনার এই কানেকশন আমার লাগবে।
কাজী জাফর বললেন, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ দিতে বলেন।
মোয়াজ্জেম চৌধুরী বললেন, কাল যাচ্ছি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে। বলব।
রনো বললেন, মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিন।
আচ্ছা চেষ্টা করব।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, বঙ্গবন্ধু চাইছিলেন বিনা রক্তপাতে দেশ স্বাধীন করতে। চাইছিলেন গান্ধীজির মতন অহিংস অসহযোগ আন্দোলন কইরা পাকিস্তানিদের তাড়াইতে। কিন্তু সেটা যে হইব না সেটা তিনি খুব ভালো জানতেন।
ব্যাঙ্গমি বলে, তাই তিনি প্ল্যান বি রেডি রাখছিলেন। চিত্তরঞ্জন সুতারকে পাঠায়া দিয়া রাখছিলেন কলকাতায় বাসা নিয়া থাকতে। ইন্ডিয়ান অথরিটির লগে যোগাযোগ কইরা অস্ত্রশস্ত্র সাপোর্টের ব্যবস্থা রাখতে।
ব্যাঙ্গমা বলে, তা না হইলে ২৫ মার্চের সাথে সাথে ইন্ডিয়া বর্ডার খুইলা দিল, আর মুক্তিযোদ্ধা বিদ্রোহী বাহিনীকে সাপোর্ট দিতে শুরু করল, এইটা তো ভেলকিবাজি না।
.
৬ জুলাই বাগডোগরায় হলো আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সভা। এতে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কমিটি বাতিল করে দেওয়া হলো। প্রাদেশিক কমিটিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কমিটি বলে ঘোষণা দেওয়া হলো। পাকিস্তানই যদি না থাকে, নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ থাকে কী করে? সহজ যুক্তি সবাই মেনে নিলেন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে আওয়ামী লীগের কমিটি এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা অনুমোদন করে নিলেন। তারা প্রকাশ্য অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন, সরকারকে সমর্থন করবেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন।
৪৯
আনিসুজ্জামান থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ সরকারের অফিসে ঢুকবেন। তিনি যে এখানকার নিয়মিত আগমনকারী, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার লেখক, তাতে কুলোচ্ছে না। বিএসএফ কিছুতেই ঢুকতে দেবে না। ব্যাপার কী?
ভেতরে খুব গোপন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হচ্ছে।
আনিসুজ্জামান খানিকটা হতভম্ব, খানিকটা বিষণ্ণ। তিনি শেরে বাংলা ও নাজিমউদ্দিনের সাবেক বাড়িটার গাছের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান, একপশলা কালো মেঘ। না। ঢুকতে না দিলে আর অনাহূত
অতিথির গেটে দাঁড়িয়ে থেকে কী লাভ? এই সময় ভেতর থেকে বের হলেন। কালো চশমা আর সাফারি স্যুট পরা একজন। তিনি রাস্তা পার হয়ে জিপের দিকে যাচ্ছেন। আনিসুজ্জামানের তাঁকে চিনতে একমুহূর্ত সময় বেশি লাগল।
মেজর জিয়াউর রহমান।
আনিসুজ্জামান রাস্তা পার হয়ে তাঁর কাছে গেলেন। বললেন, কেমন আছেন?
জিয়া বললেন, ভালো।
আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল রামগড়ে, চা-বাগানের ম্যানেজারের বাংলোতে, আমি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের। ইচ্ছা। করেই অধ্যাপক কথাটা জুড়ে দিলেন আনিসুজ্জামান।
জি চিনতে পেরেছি–তাঁর চোখ যেহেতু দেখা যাচ্ছে না, আদৌ চিনতে পারলেন কি না, কে বলতে পারবে।
আনিসুজ্জামানের মনে আছে, সেদিন জিয়া ম্যানেজারের বাংলোতে এসেছিলেন সম্ভবত টেলিফোন করতে। তাঁকে আনিসুজ্জামান নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, রেডিওতে আপনার ঘোষণা শুনেছি!
কোনটা?
যেটাতে আপনি শেখ মুজিবের নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।
শুনে জিয়া বলেছিলেন, পুয়োর শেখ। হি মাস্ট বি রটিং ইন দ্য প্রিজন নাই।
আনিসুজ্জামান তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ডু ইউ নো ফর শিয়ের?
দিস ইজ মাই গেস!
আনিসুজ্জামান বললেন, আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিল না। খুব গুরুত্বপূর্ণ আর গোপন নাকি বৈঠক হচ্ছে!
জিয়া বললেন, সেক্টর কমান্ডারদের সম্মেলন হচ্ছে। সেই জন্য এসেছি।
কেমন হচ্ছে সম্মেলন।
কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। সময় নষ্ট হচ্ছে।
পরে আনিসুজ্জামান সরকারের কার্যালয়ে ঢুকে ফারুক আজিজ খানের কাছ থেকে শুনতে পেলেন বিবরণ।
প্রথম দিনেই মেজর জিয়া এম এ জি ওসমানীর ভয়ানক সমালোচনা করেন। বলেন, তাঁকে সেনাপতি করা হয়েছে কেন? কারণ, তিনি পরিষদ সদস্য। ইটস আ পলিটিক্যাল রিক্রুটমেন্ট। সেনাপতি তো পলিটিক্যাল পোস্ট না। এটা একটা টেকনিক্যাল পোস্ট। ওনাকে মন্ত্রী করেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী। আর আমাদের সাতজন অফিসারকে নিয়ে ওয়ার কাউন্সিল করেন।
