.
হায়দার আকবর খান রনো আর কাজী জাফর দেখা করলেন খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে। মোশতাক বললেন, বাবারা, তোমরা তো কমিউনিস্ট।
জি হ্যাঁ।
আমি তো কমিউনিস্ট না। সমাজতন্ত্র আমার পছন্দ না। আমি ডেমোক্র্যাট। আদর্শগতভাবে আমি কমিউনিস্টদের বিরোধী। বাট অ্যাজ অ্যান ডেমোক্র্যাট আই ক্যান সিট অ্যাক্রোস দ্য টেবিল উইথ দ্য কমিউনিস্টস। বসো।
হায়দার আকবর খান রনো এবং কাজী জাফর বসলেন। মোশতাক বললেন, চা খাও। চা খাওয়াই। বুঝলা না, অন্যের দেশে এসেছি। ভারত তো আমার পছন্দের দেশ না। কিন্তু এখন এই দেশে থাকতে হচ্ছে। এই দেশের চা খাইতে হচ্ছে। শোনো, আমি পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন করেছি। আমি পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাস করি। আমি মনে করি, ছয় দফা যদি পাকিস্তান মাইনা নিত, পাকিস্তান আরও শক্তিশালী হইত। পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে জোরদার করত। আমি সশস্ত্র সংগ্রামেও বিশ্বাসী নই। আমি কনস্টিটিউশনাল পলিটিকসে বিশ্বাস করি। বলো আওয়ামী লীগে কোন ঘোষণায় স্বাধীন বাংলার কথা আছে? আমি ভালো আওয়ামী লীগার। তবে আজকের বাস্তবতায় আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ মেনে নিতে হচ্ছে। আমি বাস্তবতা মেনে নিচ্ছি।
রনো আর জাফর এরপর গেলেন কামারুজ্জামানের কাছে। তার বাসায়। কামারুজ্জামান তাঁর ডা. সুন্দরীমোহন অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে বাইরের ঘরে বসা। সেখানে তার সামনে রবীন্দ্রনাথের কবিতার বই, জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই।
রননা, জাফর বসলেন। কামারুজ্জামান বললেন, আমার এখন ভালো লাগে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা :
প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা
চোখে আর করুণার নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।
আমি তো কমিউনিস্ট হয়ে যাচ্ছি। সুকান্তকে নিয়ে কবিতা লিখেছি। এখন সুভাষ মুখোপাধ্যায় পড়ছি। চা খাও। তারপর পান দেব। আমি ফার্স্টক্লাস খিলি বানাতে পারি।
আপনি কমিউনিস্ট হয়ে যাচ্ছেন। এইটাই তো স্বাভাবিক। মানুষ ধীরে ধীরে পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদের দিকে যাবে। এটাই নিয়ম। বললেন রনো।
কামারুজ্জামান হেসে বললেন, কিন্তু আমি পুরা কমিউনিস্ট না। কারণ, আমি ধর্ম মানি। তোমাদের সঙ্গে আমার এই একটা জায়গাতে পার্থক্য আছে।
কাজী জাফর বললেন, হেনা ভাই, একটা কাজ করে দিতে হবে। আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করছি। অনেক জায়গায় আমাদের বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে কঠিন লড়াই করছে। আমরা তো আবদুল হক, সিরাজ শিকদার, তোয়াহাদের মতো না। আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা মনে করি, এই যুদ্ধ জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ। এটায় আগে সফল হওয়া দরকার।
কামারুজ্জামান বললেন, খুবই ভালো কথা। আসলে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজকে ঐক্যবদ্ধ। সবাই মিলে লড়াই করছে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে।
রনো বললেন, তবে দুই লাখ লোক বাদ দিয়ে। সাড়ে সাত কোটির মধ্যে দুই লাখ পাকিস্তানের দোসর আছে।
কামারুজ্জামান বললেন, ঠিক। হাজারে হাজারে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রসংঘ মিলে বানিয়েছে। আলবদর। বিহারিদের দিয়ে বানিয়েছে আলশামস। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সব খবরই আমি পাই। এই রাজাকার, আলবদর, আলশামস খুবই অত্যাচার করছে। বাড়িঘর দখল করছে। মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের খুন করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বাবা-মা পরিবারদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
কাজী জাফর বললেন, ভারতে তো আরেক সমস্যা। নকশাল। ভারতীয় বাহিনী নকশাল সন্দেহ হলেই ধরে ফেলে। আমাদের তো আবার চীনা লাইন। কাজেই আমাদের যেকোনো সময় ইন্ডিয়ান পুলিশ আর্মি ধরে ফেলতে পারে। আপনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনি আমাদের দুইজনকে সার্টিফিকেট দেন যে এরা জয় বাংলার লোক। আমাদের ধরলে সেটা আমরা দেখাব।
কামারুজ্জামান সাহেব বললেন, ওকে। তাহলে কালকে অফিসে আসো। প্যাডে টাইপ করে দেব। সিল দিয়ে দেব।
রনো, মেনন ও কাজী জাফর কামারুজ্জামানের সার্টিফিকেট নিয়ে ভারতে নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ পেয়েছিলেন।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, হায়দার আকবর রনোগো লগে দেখা হইব আরেকজনের।
ব্যাঙ্গমি বলবে, কার? মোয়াজ্জেম চৌধুরীর।
হ।
সেই ঘটনাটা কও।
রনো আর কাজী জাফর বাইর হইতাছেন আগরতলা সিপিআই (এম) অফিস থাইকা। তাগো ধইরা ফেলল ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের লোক। কইল, আপনাগো দুইজনরে একটু শিলং যাইতে হইব। গাড়ি কইরা চললেন। অনেক লম্বা পথ। পাহাড়ি পথে চলতে দুইজনের ভালোই লাগতেছিল। দুই রাত পথের ধারের হোটেলেও থাকতে হইল। গোয়েন্দার লোক নানা গল্প কইরা অবশেষে তাগো লইয়া গেলেন সেনাবাহিনীর একটা অফিসে। একজন। মেজর জেনারেল তাগো সামনে হাজির হইলেন। কইলেন, আপনারা তো চীনপন্থী। আপনারা কি জানেন, চীন আমগো শত্রু?
আমরা চীনপন্থী নই। আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতাছি। চীন পাকিস্তানরে সাপোর্ট করতাছে। বুঝতেই পারতেছেন।
রনো কইলেন, আমার ভাই যুদ্ধ করতাছে দেশের ভিতরে। আমার বাবা মা গ্রামে। তারা কে কেমন আছে কিছু জানি না। রনোর চোখ ছলছল কইরা উঠল। তিনি দেখলেন, ভারতীয় মেজর জেনারেল, অবাঙালি, তারও চোখটা ছলছল করতাছে। তিনি অনেক কথা কইলেন, দেখা গেল, রনো, জাফর, মেনন। সম্পর্কে তিনি বেশি জানেন। এরপর কইলেন, সিপিআই (এম) আপনাগো টাকা দেয়। এই টাকায় তো চলে না। আমরা আপনাদের টাকা দিব।
