আর যদি বাংলার স্বাধীনতা এই মন্ত্রিসভার নেতৃত্বে একদিন অর্জিত হয়, সেই গৌরব আপনারা নেবেন, আওয়ামী লীগের কর্মীরা নেবেন, বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ নেবেন, মুক্তিযোদ্ধারা নেবেন। আর যদি সেদিন শুধু কিছু ধন্যবাদ মন্ত্রিসভার সদস্যদের দেন, তবে আমি কৃতার্থ হব। আপনাদের খাদেম আজকে এবং ভবিষ্যতে থাকব। আপনাদের সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আসোলামু আলাইকুম।
সৈয়দ নজরুলের এই আবেগপ্লাবী বক্তৃতার পর সবাই একেবারে চুপ করে গেলেন। তাজউদ্দীন আহমদের বুক থেকে একটা বড় পাথর নেমে গেল।
.
শাহ মোয়াজ্জেম ভারতীয় সৈন্যদের কথা না শুনে বাইরে বের হলেন। পাশেই দার্জিলিং। দেখতেই হবে। তাঁর সঙ্গে আরও আরও সদস্য বের হলেন। একটা ঝরনা দেখে শাহ মোয়াজ্জেম নেমে গেলেন গোসল করতে। রাতে ফিরে এলেন অ্যাডভেঞ্চার করার তৃপ্তি নিয়ে। পরের দিন আওয়ামী লীগের মিটিং হলো। তখন শাহ মোয়াজ্জেম শুরু করলেন হাঁচি দেওয়া। বিকেলে জ্বর এল। সারা রাত জ্বরের ঘোরে সুলতা সুলতা বলে প্রলাপ বকলেন। পরের দিন তাঁকে বাগডোগরার হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। সুলতা কলকাতার এক তরুণী, যিনি শাহ মোয়াজ্জেমের বাকপ্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। আর তিনি শুনেছিলেন, শাহ মোয়াজ্জেম অবিবাহিত, এবং লন্ডন যাচ্ছেন, সুলতা তাকে বলেছিলেন, আমাকে লন্ডন নিয়ে যাবেন। শাহ মোয়াজ্জেম বলেছিলেন, আমি তো বিবাহিত, আমার সন্তান আছে। তখন ছাদের পূজামণ্ডপে নির্জনে নিয়ে গিয়ে শাহ মোয়াজ্জেমকে তিনি বলেছিলেন, যদি বাংলাদেশে আপনার স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে যায়, তাহলে আমাকে সঙ্গে নেবেন? বালাই ষাট। তা হবে কেন বলে শাহ মোয়াজ্জেম চলে আসেন। এখন এই পাহাড়ি এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে প্রচণ্ড জ্বরে তিনি সুলতা সুলতা বলে সারা রাত এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, সৈয়দ নজরুল ইসলাম কইলেন, এই সরকারের নেতৃত্বে যদি স্বাধীনতা অর্জিত হয়, তাইলে কিছু ধন্যবাদ দেবেন।
ব্যাঙ্গমি বলে, এই সরকারের নেতৃত্বেই তো বিজয় আইছিল।
ব্যাঙ্গমা বলবে, ধন্যবাদ তাগো চিরকাল জাতি দিব। কিন্তু শত্রুরাও বুইঝা ফেলছিল কারা স্বাধীনতা আনছে। এই জন্য সবার আগে মারছে শেখ মুজিবরে, মারছে বেগম মুজিবরে, মারছে শেখ কামাল, শেখ জামাল, এমনকি শেখ রাসেলরে, তারপর কয়দিন গ্যাপ দিয়া তারা জেলে ঢুইকা মারছে সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন, কামারুজ্জামান আর মনসুর আলী সাবরে। তাগো অপরাধ, তারা বাংলাদেশ স্বাধীন করছিলেন। এ ছাড়া আর কী হইব?
তাইলে খন্দকার মোশতাকরে মারল না ক্যান?
হেরে মারব ক্যান? হে-ই তো মারছে!
কিন্তু অহন তো সৈয়দ নজরুল তারে কইলেন মুরব্বি। বন্ধু। বঙ্গবন্ধুর হাইকমান্ড।
হ। শেখ সাহেব মোশতাকরে তো পাশে রাখতেনই। কারণ, সামনাসামনি মোশতাক সবচায়া বেশি আনুগত্য দেখাইতেন। কিন্তু আজীবন তিনি আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানপন্থী এলিমেন্টই আছিলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ যখন মুসলিম বাদ দিয়া আওয়ামী লীগ হইল, তখন তিনি আওয়ামী লীগ থাইকা পদত্যাগ করছিলেন। অহন যুদ্ধের ময়দানে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হইয়া কলকাতা বাংলাদেশ হাইকমিশনের রুমে বইসা তিনি কী কইতাছেন শুনো।
.
কাজী জহিরুল কাইয়ুম গেছেন মোশতাকের অফিসে। তাঁকে বললেন, শেখ সাহেব কোথায় আছেন? কেমন আছেন? যদি বেঁচে থাকেন তাহলে তাঁকে মুক্ত করা, তাঁর যাতে ক্ষতি না হয়, তাকে যেন ফাঁসি না দেয়, এটা কি মুজিবনগর সরকারের একটা প্রধান কাজ হওয়া উচিত নয়?
মোশতাক চেয়ারে হেলান দিলেন। তারপর আবার টেবিলে ঝুঁকে কাইয়ুমের দিকে মুখটা এনে বললেন, কাইয়ুম সাহেব, আপনি আমার দেশি মানুষ। আপনার সাথে আমার বহুদিনের দোস্তি। তারপরও আপনাকে পছন্দ করি না। এমন না যে আপনার গুণগুলা আমার অপছন্দ। আপনার এই সব গুণই তো আমি পছন্দ করি। খোদাভক্তি। বন্ধুবাৎসল্য। দয়াদাক্ষিণ্য। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। খালি একটা দোষ আছে। যেই কারণে আমি আপনেরে শেষ পর্যন্ত পছন্দ করে উঠতে পারি না।
আমার দোষ? কী দোষ? আপনি বলেন আমি সেই দোষ কাটায়া ওঠার চেষ্টা করব।
আপনি শেখ মুজিবের মতো একটা অশিক্ষিত লোককে এত সমর্থন করেন কেন?
কাইয়ুম চমকে উঠলেন। শেখ মুজিব, শেখ মুজিব করে যে লোকটা মুজিবের সামনে, বেগম মুজিবের সামনে মুখে ফেনা তুলে ফেলে, তার মনের মধ্যে এই! কেমন করে সম্ভব?
কাইয়ুম বললেন, আমি অশিক্ষিত লোককে সমর্থন করি। কিন্তু ইতিহাস ভুলে গেলে তো চলবে না। আমি তো আওয়ামী লীগ করতাম না। আমাকে আওয়ামী লীগে আনছেন আপনি। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে আমাকে নিয়ে গেছলেন আপনি। কিন্তু এরপর আমি কিন্তু আর আওয়ামী লীগ ছাড়ি নাই। আপনি ছাড়ছিলেন। আপনি আওয়ামী লীগ ছাড়ছিলেন লোভে। সামান্য হুইপ হওয়ার লোভে পার্টি ছেড়েছিলেন। সেটা কি আপনার উচিত হয়েছিল?
আমি তো দল ছেড়েছিলাম আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটা বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে। আমি আবার দলে আসছি। কিন্তু আপনি আমার ড্রেসটা দেখেন। মাথায় সেই জিন্নাহ টুপিই কিন্তু আছে। শেরওয়ানি পরি। ওদের মতো পাঞ্জাবির ওপরে নেহরু কোট লাগায়া আমি মুজিব কোট পরেছি, এটা বলি না।
