প্রিয় বন্ধুরা, ২৫ মার্চের রাতের পর আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। তাই আপনারা জানেন, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা করতে আমাদের একটু বিলম্ব হয়েছিল।
আমরা যে পাঁচজন শেখ সাহেবের পাশে পাশে ছিলাম এবং যাদের কাছে কথিত, লিখিত, অলিখিত সর্বপ্রকারের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু দিয়ে গিয়েছিলেন, আমরা বিচ্ছিন্নভাবে বাংলার বনে বনে, জঙ্গলে ঘুরেছি। ১৩ এপ্রিল আমরা বাংলার পূর্ব অঞ্চলে প্রথম একত্র হলাম। আমরা মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ যারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের সামনে সেদিন আমার সহকর্মীদের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা কার্যকরী করার জন্য পরিকল্পনা পেশ করেছিলাম।
১৭ এপ্রিল স্বাধীনতা ঘোষণা(পত্র) পাঠের পর আমি আমার সহকর্মী বন্ধু জনাব তাজউদ্দীন সাহেবকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তারই পরামর্শে এবং বঙ্গবন্ধুর পূর্বতন নির্দেশের বলে আমি আমার সহকর্মী বন্ধু মোশতাক আহমদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলাম। জনাব মনসুর আলী সাহেবকে অর্থমন্ত্রীর কাজে নিয়োগ দিয়েছিলাম। জনাব কামারুজ্জামান সাহেবকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত করেছিলাম।
আপনাদের একটা কথা বলব, জনাব তাজউদ্দীন আহমদ এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছেন। আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের সরকারের জন্মমুহূর্ত থেকেই কর্নেল এ জি ওসমানীর মতো একজন স্বনামধন্য দেশপ্রেমী সমরবিশারদকে সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতিরূপে পেয়েছি।
মনে রাখবেন, রণক্ষেত্রে পশ্চাদপসরণ মানে পরাজয় নয়। যুদ্ধের প্রয়োজনে পশ্চাদপসরণ করতে হয়, যাতে তীব্র আক্রমণ করে জয়লাভ করা যায়। যেদিন হিটলারের বাহিনী ফরাসি দেশ আক্রমণ করেছিল, সেদিন শত শত, হাজার হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতা ও সংস্কৃতির অধিকারী ফরাসি সরকারকে হিটলারের কাছে মাথা নত করতে হয়েছিল। আপনারা মনে রাখবেন, মাত্র তিন দিনে হিটলারের ট্যাংক বাহিনী প্যারিসের উপকণ্ঠে উপস্থিত হয়েছিল। সেদিন ফরাসি দেশের বীর নায়ক জেনারেল দ্যাগল মাত্র কিছু সৈন্য নিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতে চলে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে আপনারা জানেন দ্যাগল শক্তি সঞ্চয় করে যেদিন ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে অবতরণ করেছিল, সেদিন হিটলারের বাহিনী তার সামনে টিকতে পারেনি।
দীর্ঘকাল সুখে-দুঃখে আমি আপনাদের পাশে ছিলাম। আমার প্রিয়তম নেতা জনাব শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন, আপনারা দীর্ঘকাল আমাকে ভালোবাসা দিয়েছেন, স্নেহ দিয়েছেন আমার বন্ধু তাজউদ্দীন সাহেবকে, যেমন দিয়েছেন। আমার বন্ধু কামারুজ্জামান সাহেবকে, যেমন দিয়েছেন আমার বন্ধু মুরব্বি মোশতাক সাহেবকে, মনসুর আলী সাহেবকে। কোনো দিন কি আমরা আপনাদের বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছি? বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস, আপনাদের স্নেহ, ভালোবাসার বিনিময়ে আমরা কি কোনো দিন আপনাদের আদর্শ থেকে চ্যুত হয়েছি? ২০-২২ বছরের ইতিহাস যদি এ কথা বলে সুখে-দুঃখে জয়-পরাজয়ে গৌরবে-অগৌরবে আপনাদের পাশে ছিলাম। আপনাদের বিশ্বাসের অমর্যাদা করিনি। তাহলে আপনাদের কাছে আকুল আবেদন জানাব, আবার আপনারা বিশ্বাস স্থাপন করুন। দেখুন আমরা কী করতে পারি। যদি না পারি, তবে শুধু আপনাদের কাছে নয় অনাগত ভবিষ্যতের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। আমার বিশ্বাস, আমার মন্ত্রিসভার সদস্যরা ও প্রধান সেনাপতিও এ সম্বন্ধে সজাগ।
বন্ধুরা, ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল এই তিন বছর আমি আপনাদের পরিচালনা করার দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। বঙ্গবন্ধু এই তিন বছর কারাগারে ছিলেন। আইয়ুব শাহির দাপট আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমি দেখেছি তখনো আপনারা অধৈর্য হতেন। আমি কোনো দিন ধৈর্য হারাই নাই। বহুবার সংগ্রামের বহু কৌশল নিয়ে আপনাদের সঙ্গে আমার মতবিরোধ হয়েছে। আমার সহকর্মী ভাইয়েরা, আজকে আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমার প্রবর্তিত কৌশলের ফলে ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করেছিলাম, তথা আইয়ুব শাহিকে খতম করেছিলাম।
বন্ধুরা আমার, আমি জানি এই বিশ্বাসের বলে আপনারা আমাকে আবার বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসেবে প্রধান সহসভাপতি করেছিলেন। এই বিশ্বাসের বলে আপনারা আমাকে জাতীয় পরিষদে ডেপুটি করেছিলেন।
আমি জানি, এই বিশ্বাসের বলে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে আবার আপনারা আমাকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দিয়েছেন। আমার ভাগ্য এই যে আমার নেতা, আমার ভাই, আমার প্রিয়তম বন্ধু শেখ সাহেব যখনই যান, তার অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে পড়ে যায়।
বন্ধুরা আমার, সেই কাজ চিরকাল আপনাদের পাশে পাশে থেকে করেছি। বন্ধুরা আমার, আজও আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি–যদি বিশ্বাসঘাতকতা করি, যদি সংকল্পে কোনো রকম মলিনতা দেখেন, আপনারা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবেন। কিন্তু বাংলার এই সংকট মুহূর্তে জাতির স্বাধীনতার এই ক্রান্তিলগ্নে যেখানে শত শহীদের রক্তে আজকে ইতিহাস লেখা হয়েছে, আর যেখানে হাজার হাজারে সৈনিক আজ বন প্রান্তরে ইতিহাস লিখে চলেছে, সেই মুহূর্তে আপনারা আরেকবার আস্থা স্থাপন করুন। আমার বন্ধু তাজউদ্দীন দীর্ঘদিন আপনাদের পাশে সংগ্রাম করেছে। বহু জেল খেটেছে। আমার ভাই, মোশতাক সাহেব, মনসুর সাহেব, কামারুজ্জামান সাহেব দীর্ঘকাল সংগ্রামের পরীক্ষিত সেনাপতি। তাদের ওপর আপনারা আস্থা স্থাপন করুন। এ কথা আমি বলব না নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আপনারা সমালোচনা করবেন না। সমালোচনা করার অধিকার আপনাদের আছে। সমালোচনার উদ্দেশ্য হবে একটি–কী করে স্বাধীনতাসংগ্রামকে জোরদার করা যায়।
