সৈয়দ নজরুল ঘোষণা করলেন, এবার বক্তব্য রাখবেন অর্থমন্ত্রী মনসুর আলী।
অর্থমন্ত্রী মনসুর আলী মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, দুষ্কৃতকারীরা বাস্তুত্যাগী বাঙালিদের যে ঘরবাড়ি, বিষয়সম্পত্তি দখল করেছে, তা প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ কথা ঠিক যে শত্রুকবলিত এলাকায় আমাদের মুক্তিবাহিনী পুল-সেতু উড়িয়ে দিচ্ছে, রাস্তা কেটে দিচ্ছে, শত্রুর আবাসস্থল গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এতে আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। দেশ শত্রুমুক্ত হলে এসব রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হবে। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে তাই বুলেট-বেয়নেট, শেল-গোলায় স্তব্ধ করা যাবে না। রক্তের যখন মাতন জেগেছে, পদ্মা-মেঘনায় বান ডেকেছে, তখন তাকে রুখতে পারে, এমন সাধ্য কারও নেই। জয় আমাদের হবেই। জয় বাংলা।
তাজউদ্দীন আহমদ দাঁড়ালেন। চশমা পরে নিয়ে তিনি বক্তৃতা শুরু করলেন :
মাননীয় সদস্য ও সদস্যাগণ,
আমরা একটা যুদ্ধের মধ্যে আছি। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা আমার চেয়ে আপনারাই বেশি জানেন।
আজকের এই যুদ্ধের ফলে ৬০ লক্ষেরও অধিক লোক ছিন্নমূল হয়ে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের মাটিতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দলমত-নির্বিশেষে ভারতের প্রতিটি মানুষ বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ এই বন্ধুত্বের কথা মনে রাখবেন।
অন্য সব ভুলে গিয়ে আমাদের বড় লক্ষ্য হবে আমার দেশের মুক্তিসংগ্রামকে জোরদার করা এবং হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা। আমাদের আজ বড় লক্ষ্য হবে ৬০ লক্ষাধিক ছিন্নমূল মানুষকে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা। ৬০ লক্ষাধিক যদি ভারতে চলে গিয়ে থাকেন, ১০ লক্ষাধিক মানুষ যদি মৃত্যুবরণ করে থাকেন, তা হলে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মধ্যে এখনো সাড়ে ৬ কোটি মানুষ বাংলাদেশের দখলীকৃত এলাকায় রয়ে গেছেন। তারা যে নির্যাতন ভোগ করছেন, যে কষ্ট ভোগ করছেন, তাঁদের যে হাহাকার, যে দুঃখ, তা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। হৃদয় দিয়ে বুঝতে হলেও হৃদয়ের অনেক বল দরকার। ভালো করে বুঝতে হলেও নিজেরা সজ্ঞান থাকতে পারব কি না সন্দেহ।
আজ সেই সমস্ত মানুষ পরম দুঃখ-কষ্টের মাঝেও প্রতিনিধিদের মুখের পানে চেয়ে আছেন। চেয়ে আছেন বাংলার যুবকদের আশায়, মুক্তিবাহিনীর আশায়। একদিন তারা আমাদের উদ্ধার করবেন, একদিন তারা আমাদের লাঞ্ছনা থেকে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করবেন, সেই আশায় তারা আকুল হয়ে পথ চেয়ে আছেন। আমার বিশ্বাস বাংলার প্রতিটি যুবক, প্রতিটি প্রতিনিধি সে ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা তাদের এই অটুট আশা, এই আস্থা পূরণ করবই করব।
তাজউদ্দীন আহমদ বুকের সমস্তটা বল একত্র করে, মুখমণ্ডল রক্তে লালিম করে এই ভাষণ দিলেন। সভাস্থল নীরব হয়ে গেল।
এবার উঠলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টাক, তার চেহারার মধ্যে একটা সৌম্য ভাব আছে, চেহারাটাই এমন যাকে সবাই মান্য করবেন, শ্রদ্ধা করবেন। বঙ্গবন্ধু যেমন আমেরিকানদের বলেছেন, আমার অবর্তমানে সৈয়দ নজরুলই নেতা, তেমনটা দু-একজন নেতার সামনেও বলেছেন, কিন্তু তাঁকে সিনিয়র সহসভাপতি পদ দেওয়া, পরিষদের ডেপুটি লিডার বানানোর মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুর পর আওয়ামী লীগে তিনিই, এটার স্পষ্ট বার্তা বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন।
কাজেই সৈয়দ নজরুল ভাষণ দিতে উঠলে স্তব্ধ সভা কান পেতে রইল তিনি কী বলেন।
সৈয়দ নজরুলও বুঝতে পারলেন, আজ তাঁকে তাঁর জীবনের সেরা ভাষণটা দিতে হবে। তিনি বলতে থাকলেন :
আমরা যখন এই পরিষদের সম্মেলনকক্ষে, তখন বাংলাদেশের বীর মুক্তিফৌজ অপূর্ব বীরত্বের সঙ্গে শত্রুবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে।
২৫ মার্চের রাতের আঁধারে এই বীভৎস ঘটনার পর আপনারা রুখে দাঁড়ালেন। রুখে দাঁড়ালেন বাংলার নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিরা যে। যেখানে ছিলেন। মফস্বল শহরে, জেলা শহরে, গ্রামে, বন্দরে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আপনারা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করব আমাদের বীর বাঙালি সৈনিকেরা। বেঙ্গল রেজিমেন্টের ছেলেরা, যাদের বীরত্ব আজকে ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। কিন্তু বন্ধুরা যা ভাবতেও পারি নাই তা হয়েছে। আমাদের ইপিআর বাহিনী, আমাদের পুলিশ বাহিনী, আমাদের আনসার, আমাদের মুজাহিদরাও বাংলার মানুষের পাশে এসে দাঁড়াল। বন্দুক আর কামান তুলে নিল। আজ তারা সংগ্রামের পুরোভাগে। বাংলার গ্রামে, বন্দরে, গঞ্জে আপনারা দাঁড়ালেন। আমি কীভাবে আপনাদের শ্রদ্ধা জানাব, তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। যে সমস্ত মিথ্যাবাদী বলে আওয়ামী লীগের নেতারা এবং সদস্যরা সংগ্রামের পুরোভাগে ছিল না, তাদের আমি জবাব দিতে চাই। বাংলার মানুষ জানে আপনারা ছিলেন পুরোভাগে। আমি জানি চট্টগ্রামে, ময়মনসিংহে, যশোরে, রংপুরে, খুলনায়, বরিশালে, ঢাকায়, ফরিদপুরে বাংলার সবখানে আপনাদের নেতৃত্বেই সংগ্রাম হয়েছে।
মূলত ও বাহ্যত বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার মুহূর্তে স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী রেখে যান। আমরা দীর্ঘকাল যারা বঙ্গবন্ধুর পাশে পাশে থেকে সংগ্রাম করেছি, তারা জানতাম, বঙ্গবন্ধু যদি গ্রেপ্তার হয়ে যান, তবে স্বাধীনতা ঘোষণা তিনিই করে যাবেন। আর সেই স্বাধীনতা রক্ষার জন্যই আমাদের সংগ্রাম করে যেতে হবে।
