সম্মেলনের শুরুটা হলো ঝোড়ো হাওয়ার মতো। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের একচোট তর্ক হয়ে গেল। তাজউদ্দীন মাথা ঠান্ডা রাখলেন। চিৎকার যা করার জহুর আহমেদই করলেন।
তাজউদ্দীন ভেতরে গেলেন। বিশাল অডিটরিয়াম। সবই আর্মিদের। পাশেই এয়ারফোর্স আর আর্মি বেস। এইটা মনে হয় দরবার হল।
খন্দকার মোশতাক গিয়ে বসলেন সভাপতির আসনে।
প্রথমেই কথা বলার জন্য মঞ্চের দিকে গেলেন শেখ আজিজুর রহমান। মোরেলগঞ্জ এলাকা থেকে নির্বাচিত পরিষদ সদস্য। ময়েজউদ্দীন জানেন, তাজউদ্দীনবিরোধীদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ। ময়েজউদ্দীন তাঁর কলার চেপে ধরে তাকে বাইরে টেনে নিতে লাগলেন। ময়েজউদ্দীনের কোমর টেনে ধরলেন শাহ মোয়াজ্জেম। তখন শাহ মোয়াজ্জেমের পেটে বা কনুই দিয়ে সর্বশক্তিতে আঘাত করলেন ময়েজউদ্দীন। মোয়াজ্জেম পড়ে গেলেন। শেখ আজিজকে সম্মেলনকক্ষের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শামসুল হক এসে তাঁকে জাপটে ধরে আটকে রাখলেন। ময়েজউদ্দীন দ্রুত মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোন দখল করলেন। সভাপতির আসনে বসা মোশতাক বললেন, সভা অ্যাডজরন করা হলো। তিনি উঠে মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন।
তখন সৈয়দ নজরুল ইসলাম এসে সভাপতির দায়িত্ব নিলেন আর সভার কাজ শুরু হলো।
মিজানুর রহমান চৌধুরী তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ দেখালেন। মোট ৬০ জন সদস্য বক্তব্য দেন। অনেক সমালোচনা। অনেক আপত্তি।
একজন সদস্য প্রশ্ন তুললেন, ভারত আমাদের সাহায্য করছে। ৬০ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে। তারা স্বীকৃতি দিচ্ছে না কেন আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রকে?
সৈয়দ নজরুল বললেন, প্রধানমন্ত্রী, এই প্রশ্নের জবাব দিন।
তাজউদ্দীন বললেন, আপনারা জানেন, আমরা সারা পৃথিবীর সব শান্তিকামী দেশ এবং সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। পৃথিবীর সব সংবাদমাধ্যমে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম গণহত্যা, নারী নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। তারপরও সরকারগুলো অনেকেই এটাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে গণ্য করছে। ভারতের এই সাহায্যকে জাতিসংঘের একটা সদস্যদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পাচ্ছে।
আমরা যদি মুক্তিবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে বিজয়ে দ্বারপ্রান্তে না নিতে পারি, ভারতের স্বীকৃতি তাদের একঘরে করে ফেলবে। তবে আমাদের সরকার, আমাদের সব মন্ত্রী, এমনকি আমাদের পরিষদ সদস্যদের মধ্যেকার প্রতিনিধি এবং বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের কথা হয়েছে। মিসেস ইন্দিরা গান্ধী আমাদের সব রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আপনারা জানেন চীনের প্রতিক্রিয়া। তারা প্রকাশ্যে ভারতের এই সাহায্যকে সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা হিসেবে বর্ণনা করেছে। ভুট্টো চীন সফর করেছেন। চীন পাকিস্তানকে কথা দিয়েছে, ভারতের কোনো রকমের আক্রমণ হলে তারা পাকিস্তানের পাশে এসে দাঁড়াবে। ১৩ এপ্রিল চৌ এন লাই ইয়াহিয়া খানকে চিঠি দিয়েছেন, আপনারা খবরের কাগজে পড়েছেন, যদি ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করে, চীন পাকিস্তানের পাশে এসে দাঁড়াবে।
কাজেই ভারতকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলতে হচ্ছে। তারা আমাদের কথা দিয়েছেন, ঠিক সময়ে তারা স্বীকৃতি দেবেন। শুধু ঠিক সময়ে স্বীকৃতি দেবেন তা-ই না, আর যা যা করার তা-ই করবেন। তবে আমি প্রথম দিন থেকেই মিসেস গান্ধীকে বলে আসছি, আমাদের লড়াই আমাদের করতে হবে। আমাদের লড়াই আপনারা করে দেবেন, তা হয় না। আমাদের অস্ত্র দিন, ট্রেনিং দিন। ব্যাকআপ দিন। এই আহ্বান আমি পৃথিবীর সব স্বাধীনতাকামী দেশের প্রতিই দিয়েছি। আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমাদের চাওয়া, আমাদের অস্ত্র দিতে হবে না, পাকিস্তানকে অস্ত্র দেওয়া, সমর্থন দেওয়া, অর্থসাহায্য দেওয়া বন্ধ করুন।
পরের প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধু কেন ধরা দিলেন? ওই সময় আপনার ভূমিকা কী ছিল? আর আপনারা যদি জানেনই তাঁকে ধরা হয়েছে, তাহলে কেন বলা হলো, তিনি আমাদের মধ্যে থেকে সংগ্রাম পরিচালনা করছেন? এতে তার প্রাণহানি হতে পারত। ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে গুম করে ফেলে বলতে পারত, তাজউদ্দীনকে বলুন, শেখ সাহেবকে তারা কোথায় রেখেছে? কোথা থেকে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করছেন? এত বড় ভুল আমরা কেন করলাম?
ব্যারিস্টার আমীর বললেন, আপনারা অনেকেই ২৫ মার্চ গভীর রাত পর্যন্ত ৩২ নম্বরে গেছেন। আপনারা সব জানেন। বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি পালিয়ে যাবেন না। এটা কি আপনারা কল্পনা করতে পারেন যে তার মতো বিশাল নেতা, যিনি সমস্ত পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা, তিনি ছদ্মবেশ নিয়ে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশে আসবেন? তাকে কি লুকিয়ে রাখা সম্ভব হতো? আর তিনি কেন পালাবেন? এটা তাঁর সচেতন সিদ্ধান্ত। তিনি পালাবেন না। লুকোবেন না। যদিও তিনি প্রথমে বলেছিলেন সবাইকে পুরান ঢাকায় যেতে। সেখান থেকে নদী পার হয়ে তিনি হামিদ সাহেবের লঞ্চে উঠবেন। তবে এটা ঠিক যে আমরা এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহের আগে জানিনি যে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হয়েছেন। আর জনগণ যাতে হতাশ না হয়ে পড়ে, সারা দেশের প্রতিটা জেলা, মহকুমা, থানায় গড়ে ওঠা প্রতিরোধসংগ্রাম যেন স্তিমিত না হয়ে যায়, সে জন্য আমরা বলেছি তিনি আমাদের মধ্যেই আছেন। তার অনেকগুলো ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। আপনারা চট্টগ্রামের নেতারা জানেন, চট্টগ্রাম বেতার থেকে এ-ও বলা হয়েছিল যে দুপুরের লালদীঘি ময়দানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন। পরে নেতাদের নির্দেশে সেই ঘোষণা পাল্টানো হয়।
