লিলি বললেন, তোমার দুগ্ধপোষ্য শিশুর খুব জ্বর। ১৮ মাসের বাচ্চাটা আব্বু আব্বু বলে ডাকে আর কাঁদে।
তাজউদ্দীন বললেন, আসব একবার। নজরুল ভাইয়ের সঙ্গে একটু কথা বলে আসি। খুবই ব্যস্ততা যাচ্ছে।
সৈয়দ নজরুল খুবই চিন্তিত। এমএনএ, এমপিএরা আসে, তারা তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে বলে। কিন্তু তাজউদ্দীন সরকারটা দাঁড় করানো আর পরিচালনার জন্য যে পরিশ্রম করছেন, আর তার লেখাপড়া ও প্রজ্ঞা যে পর্যায়ের, তাঁর সঙ্গে কারও তো তুলনা চলে না। আর সরকার প্রেসিডেনশিয়াল। সব ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে। প্রধানমন্ত্রী তো মুখ্য নয়। তাজউদ্দীন কাজ বেশি বেশি করে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছেন। তিনি তো তাকে কাজ কম করতে বলতে পারেন না। কিন্তু তার আরেকটা সমস্যা আছে। তাঁর ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মুজিববাহিনীতে যোগ দিয়েছে। শেখ মণি, রাজ্জাক, তোফায়েলদের সঙ্গে মিলে চলছে। এটা হলো জেনারেশন গ্যাপ। ছেলে তার কাছে আসেও না।
তাজউদ্দীন এলেন। তাঁর চোখমুখে উদ্বেগ।
সৈয়দ নজরুল বললেন, এত রাতে?
তাজউদ্দীন বললেন, শিলিগুড়ির সম্মেলনে ঝড় বয়ে যাবে। আমার ওপর দিয়েই যাবে। আপনি হাল ধরে থাকবেন। শক্ত করে হাল ধরবেন। আমরা এই পর্যায়ে এসে সরকারের বদলে ওয়ার কাউন্সিল বানাতে পারব না। আর আপনি যদি মনে করেন, সরকার থাকুক, প্রধানমন্ত্রী অন্য কাউকে করবেন, তা আপনি করতে পারেন। আমি ছেড়ে দেব। আর আমি ছেড়ে দিলেও আপনার যেকোনো অর্ডার আমি পালন করব। আপনি কাকে প্রধানমন্ত্রী করবেন, ঠিক করে রাখেন। সবাই যোগ্য। আমার কোনো অসুবিধা নাই।
সৈয়দ নজরুল অভিজ্ঞ মানুষ। বয়সে তাজউদ্দীনের সমান যদিও। তিনি মুহূর্তখানেক ভাবলেন। মনসুর আলী সাহেব বয়স্ক। নিজের পরিবার পরিজন নিয়ে চিন্তিত। কামারুজ্জামান সাহেব কবিতা লেখেন আর পান খান। পরিশ্রমী কিন্তু একদিকে দিল্লি আরেক দিকে সৈন্য, একদিকে ভারতীয় আর্মি আরেক দিকে আমলাতন্ত্র, একদিকে বাংলাদেশ প্রশাসন আরেক দিকে মুক্তিবাহিনী, একদিকে আওয়ামী লীগ নামের অতল অসীম প্রতিষ্ঠান আরেক দিকে ন্যাপ, সিপিবি, বুদ্ধিজীবী নানা দল–এই কঠিন দড়ি-টানাটানির মধ্যখানে কামারুজ্জামান সাহেব কঠিন দৃঢ়তা বজায় রাখতে পারবেন না। মোশতাক তো আগাগোড়া একটা প্রতিক্রিয়াশীল লোক। আর থাকে যুবনেতারা। তারা দুর্বিনীত। বয়সের কারণেই বিদ্রোহী। শেষটা হলো শেখ সাহেবের আত্মীয়রা। আত্মীয়তা কোনো যোগ্যতা হতে পারে না, আর তা যদি যোগ্যতা হয়, তাহলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর কোনো করণীয় থাকবে না। কাজেই দিল্লি যাকে পছন্দ করে, যিনি তাঁর সঙ্গে পরামর্শ না করে কিছু করেন না, সেই তাজউদ্দীনই সবচেয়ে ভালো প্রধানমন্ত্রী এবং এই মুহূর্তে তার কোনো বিকল্প নেই। শেখ সাহেবেরও তিনি ছিলেন ডান হাত।
সৈয়দ নজরুল বলেন, দীর্ঘদিন শেখ সাহেবের সঙ্গে রাজনীতি করেছি, আমি জানি, এই সব ঝড় শেখ সাহেব কীভাবে সামলাতেন। সামলানোর উপায় হলো, আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখা, আর বলিষ্ঠভাবে সেই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করিয়ে নেওয়া। আপনি চিন্তা করবেন না, তাজউদ্দীন। আমি আমার দায়িত্ব পালন করব। ডোন্ট ওয়ারি।
সৈয়দ নজরুলের বাসা থেকে বেরিয়ে তাজউদ্দীন গেলেন লিলির কাছে।
আব্বু এসেছে, আব্বু এসেছে বলে রিমি, রিপি তার কাছে চলে এল। তিনি মেয়ে দুটোকে দুই হাতে ধরে চলে গেলেন বেডরুমে। মিমি খেলছে। সোহেলের মাথায় পানি ঢালছেন লিলি।
তাজউদ্দীন বললেন, ডাক্তার দেখিয়েছ? ডাক্তারকে খবর দাও।
পরে তিনি তাঁর পিএস ফারুক আজিজ খানকে বলবেন, দেখুন, ছেলের জ্বর হয়েছে। আমি কী করব? আমি কি ডাক্তার? আপনি চিন্তা করুন, সারা বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ লোক মারা গেছে। লক্ষ লক্ষ লোক আহত। যুদ্ধক্ষেত্রে যে মানুষটা গুলিবিদ্ধ হয়েছে, কে তাকে দেখছে। শরণার্থীশিবিরে কত লক্ষ শিশু রোগেশোকে পুঁকছে। কে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এখানে ফ্ল্যাটে আছে, নিরাপদে আছে। একটা ডাক্তার ডেকে দেখাবে, এটা যদি আমাকেই দেখতে হয়, তাহলে আমি সরকারের কাজ করব কখন?
.
শিলিগুড়ির বিমানবন্দরে একে একে পরিষদ সদস্যরা নামছেন। তাঁদের বাসে তুলে নেওয়া হচ্ছে গভীর জঙ্গলে, বাগডোগরা, বিএসএফের ক্যাম্পে। এত ঘন জঙ্গল যে সদস্যরা দিনে বেলাতেও রাতের অন্ধকার দেখছিলেন পথের দুধারে।
ক্যাম্পের ভেতরে পৌঁছানোর পরপর বিএসএফের একজন জেনারেল সমবেত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বললেন, এটা খুবই ভয়ংকর একটা জায়গা। এই বাউন্ডারির বাইরে যাওয়ার কথা কেউ ভুলেও ভাববেন না। এই বনে বাঘ আছে এবং সবচেয়ে ভয়ংকর হলো বন্য হাতির পাল। আপনাদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রত্যেকেই বাউন্ডারির ভেতরে অবস্থান করবেন।
.
৫ জুলাই ১৯৭১। আজ পরিষদ সদস্যদের সম্মেলন। জাতীয় পরিষদের ১৩৫ জন, প্রাদেশিক পরিষদের ২৩৯ জন সদস্য উপস্থিত। ক্লিয়ার মেজরিটি। তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল উপস্থিতি দেখে সন্তুষ্ট। আসলে এটা করতে সাহায্য করেছে ভারতীয় বাহিনী। তাদের ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক আছে। টেলিফোনে যোগাযোগের চেইন আছে। তারা সারা বাংলাদেশের প্রতিটা বর্ডারে, যে এক শ ক্যাম্প আছে, সবখানে, বিএসএফ চ্যানেল ব্যবহার করে এবং গোয়েন্দাদের লাগিয়ে রেখে সবাইকে খবর দিয়ে, ডেকে, কখনোবা সঙ্গে থেকে নিয়ে এসেছে।
