আমার ঘরে শত্রু, বাইরে শত্রু। তারপরেও আপনি বলছেন আমি যাব।
কাইয়ুম কণ্ঠ নিচে নামিয়ে বললেন, আমার কাছে দেড় কোটি টাকা আছে। সে টাকাটা নিতেও তো বাংলাদেশ সরকারের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারত। আপনি স্বঘোষিত প্রধানমন্ত্রী। আপনাকে আমরা প্রধানমন্ত্রী বানাই নাই। আপনাকে কষ্ট তো করতেই হবে। প্রাণের ভয়ে আপনি কলকাতা থেকে নড়বেন না, এটা একদমই গ্রহণযোগ্য নয়।
তাজউদ্দীন বললেন, কাইয়ুম ভাই, আপনি বলছেন, আমি অবশ্যই আগরতলা যাব।
.
তাজউদ্দীন তাঁর থিয়েটার রোডের অফিসে। বেলা একটার দিকে আগরতলা থেকে এসে হাজির হলেন পরিষদ সদস্য ময়েজউদ্দীন। তাজউদ্দীন তাঁকে দেখে প্রমাদ গুনলেন। তাজউদ্দীন তাকে তার বিরোধী পক্ষ বলে মনে করেন।
ময়েজউদ্দীন বললেন, আগরতলায় পরিষদ সদস্যরা যারা ছিলেন, বসেছেন। ৫০-৬০ জনের মতো। মাইক ছিল। মাইকে আপনাকে গালিগালাজ করেছে। এমন হলো যে, বাইরের কৌতূহলী জনতা সেই সব গালিগালাজ শুনে ফেলেছে। লজ্জায় আমাদের মাথা কাটা গেছে। আপনি এখনই প্রস্তুত হোন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি আপনাকে সমর্থন। করব। আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি। এই সময় সারা পৃথিবীর সামনে আমাদের মুখ ছোট করা যাবে না। বাইরের লোকেরা শুনলে কী মনে করবে? দেশের মানুষ শুনলে কী মনে করবে? মিলিয়ন মানুষ শহীদ হয়েছে, আর আমরা প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে মারামারি করছি।
কী করা উচিত বলে মনে করেন?
আপনি ঢাকার পরিষদ সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওরা ব্যাপক টাকা ছিটাচ্ছে।
তাজউদ্দীন আহমদের মুখ রক্তিমাভ হয়ে গেল। এই কাজটা তিনি। পারবেন না।
এর আগে শেখ মণিরা বেশ কয়েকজন পরিষদ সদস্যের স্বাক্ষরসহ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি পাঠিয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু ভারতে গিয়ে ওয়ার কাউন্সিল গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন চারজন মাত্র যুবনেতাকে–শেখ মণি, তোফায়েল, রাজ্জাক আর সিরাজুল আলম খানকে। র এটা আগে থেকেই জানে। ইন্দিরা গান্ধী একটুখানি দমে যান। তিনি এই চার নেতার নেতৃত্বে বিএলএফ তথা মুজিববাহিনী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। তাঁদের চিন্তা, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা যাবে না, আর যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে চীনপন্থী বিপ্লবী, নকশালদের হাতে অস্ত্র চলে গিয়ে উভয় বাংলার ভাগ্যকে ছিন্নভিন্ন করার যে আশঙ্কা আছে, তাকে শুরু থেকেই বাগে আনতে শুধু এই চারজন বঙ্গবন্ধু অনুগত-প্রাণকে দিয়েই একটা সংগঠিত যুবশক্তি গড়ে তুলতে হবে।
তাজউদ্দীনকে কেউ কেউ পরামর্শ দেয়, পরিষদ সদস্যদের টাকা দিন, সেটা তিনি একেবারেই অপছন্দ করেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘদিন চলার সূত্রে তিনি জানেন, পরিষদ সদস্যরা টাকা খেয়ে পক্ষ পরিবর্তন করে, এই জিনিসটাকে মুজিব ভাই চরম ঘৃণা করেন। তাজউদ্দীন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ময়েজউদ্দীন ভাই, মুজিব ভাই আমাকে একটা কথা বলেছিলেন, আমি বাঙালিকে হাড়ে হাড়ে চিনি, তবে চিনেছি একটু দেরিতে, আগে যদি জানতাম, তাহলে আমি রাজনীতিই করতাম না। টাকা আমি দিতে পারব না।
.
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বলাবলি করবে :
ডি পি ধর যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত পদ থেকে চলে আসেন–ইন্দিরা গান্ধীর ১ নম্বর উপদেষ্টা এবং মুখ্য সচিব হিসেবে যোগ দেবেন মাসখানেক পর, তখন আবারও ইন্দিরা গান্ধীর কাছে তাজউদ্দীনের অপসারণ চেয়ে পরিষদ সদস্যদের চিঠি যায়। এই সময় ডি পি ধর তাজউদ্দীন আহমদের পরামর্শক ও বিশেষ দূত মঈদুল হাসানকে বলেছিলেন, এটা কেন হচ্ছে, কেন পরিষদ সদস্যরা তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে চিঠি লেখেন?
মঈদুল হাসান বলে, তার প্রতিপক্ষ অনেক টাকাপয়সা খরচ করে।
ডি পি ধর বলেন, ভারত বাংলাদেশের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, তাহলে আমরা তাজউদ্দীনের হাতেও টাকা দিতে পারি, তিনিও খরচ করুন।
মঈদুল ডি পি ধরকে বলেন, তাজউদ্দীন আর যা-ই করুন, এমএনএ, এমপিএ কেনাবেচা করতে পারবেন না। তিনি নীতিমান লোক।
ময়েজউদ্দীন চললেন শেয়ালদা স্টেশনের কাছে টাওয়ার হোটেল এবং লজে। সেখানে ঢাকার পরিষদ সদস্যরা আছেন। ময়েজউদ্দীন তাঁদের বললেন, এখনই তৎপর হতে হবে। কুমিল্লার পরিষদ সদস্যরা, মিজান চৌধুরী, মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম, তাহের উদ্দীন ঠাকুর গং এক হয়েছে। তাজউদ্দীনকে সরাতে চায়। তাদের উসকানি দিচ্ছে শেখ মণি।
ঢাকার সদস্যরা ব্যাপারটা বুঝলেন। এক. তারা কেউই খন্দকার মোশতাককে পছন্দ করেন না। লোকটা যেন একটা চলমান পাকিস্তানের প্রতিমূর্তি। দুই. তারা শেখ মণিকেও পছন্দ করেন না। কারণ, এই যুবনেতারা মুজিব ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বলে নিজেকে দাবি করে অনেক ধরনের বেয়াদবি করে। এইটা পরিষদ সদস্যদের পছন্দ নয়। সবচেয়ে বেশি উৎসাহী হলেন শামসুল হক। তারা বেরিয়ে পড়লেন অন্য সদস্যদের খোঁজে। শিলিগুড়ি যাওয়ার আগেই সংখ্যাগরিষ্ঠদের তাজউদ্দীনের পক্ষে আনতে হবে।
তাজউদ্দীন চলে গেলেন মন্ত্রীদের ফ্ল্যাটে। লিফটে উঠলেন। এই সময় দেখা হয়ে গেল লিলির সঙ্গে।
লিলি জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ?
অন্যমনস্ক তাজউদ্দীন জবাব দিলেন, এই তো আছি।
লিলি বললেন, সোহেলের খুব জ্বর। একটু দেখতে এসো।
তাজউদ্দীন বললেন, আমি খুব ব্যস্ত লিলি।
