আচ্ছা দেখা যাবে।
বলে মণি হনহন করে চলে গেলেন।
.
খান সারওয়ার মুরশিদ আর আনিসুজ্জামান মন খারাপ করে বসে রইলেন।
৪৮
কাজী জহিরুল কাইয়ুম কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম থেকে নির্বাচিত এমএনএ। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিশাল শিল্পপতি তিনি। ফলে বঙ্গবন্ধুও পার্টির জন্য চাঁদার দরকার হলে তাঁকে খবর দিতেন। পার্টিকে চাঁদা দেওয়ার ব্যাপারে, এমনকি জনহিতকর কাজে টাকাপয়সা দেওয়ার ব্যাপারে জহিরুল কাইয়ুমের হাত সত্যিই উদার। তিনি বলে থাকেন, সত্তরের নির্বাচনের আগে শেখ সাহেব বললেন, নির্বাচন করতে ১০ লাখ টাকা দরকার হবে। জহিরুল কাইয়ুম তাঁকে বলেন, আমি আপনাকে ৫ লাখ টাকা জোগাড় করে দেব। তিনি এ-ও বলে থাকেন, নির্বাচনের আগেই তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, নির্বাচনে আপনি জিতবেন, কিন্তু ক্ষমতা পাবেন না। ক্যান্টনমেন্টে ইস্পাহানি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট জেনারেল মিঠঠা খান। ভাইস প্রেসিডেন্ট কাইয়ুম। ফলে প্রায়ই ক্যান্টনমেন্ট যেতে হয়। পাকিস্তানি জেনারেলদের প্রকাশ্য কথা, ইলেকশনে আওয়ামী লীগ জিতলে তাদের ক্ষমতা দেওয়া হবে না। শেখ সাহেব নাকি তাঁকে বলেছিলেন, তাহলে কী করতে হবে? কাইয়ুম বলেন, শুনেছি আপনার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ছিল। জানি না কথা সত্য কি না। যোগাযোগটা আবার পুনরুজ্জীবিত করুন। এরপর কাইয়ুম কুমিল্লা আসেন। কুমিল্লা পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান স্বদেশি নেতা বাবু অতীন্দ্র মোহন রায়কে আগরতলা পাঠিয়ে দেন। এক মাস, দেড় মাস অতীন্দ্রবাবু আগরতলা কাটিয়ে এসে রিপোর্ট করেন, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীনবাবু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। ভারতের কথা হলো, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করলে এবং পাকিস্তানি জান্তা ক্ষমতা না দিলে ভারত আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় দেবে। তখন তিনি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন, শেখ সাহেব, আপনি ভারতে যাবেন কি না। উত্তরে মুজিব বলেন, আমি এত লম্বা মানুষ, কীভাবে ভারতে যাব, আপনারা তাজউদ্দীনের জন্য আশ্রয় ঠিক করে দিন।
এই জহিরুল কাইয়ুমের সঙ্গে খন্দকার মোশতাকের ভালো দোস্তি। এর একটা কারণ, খন্দকার মোশতাক সমাজতন্ত্র পছন্দ করেন না। কাইয়ুমেরও সমাজতন্ত্র পছন্দ না। আরেকটা কারণ উভয়েই কুমিল্লার।
২৫ মার্চের পর স্থানীয় প্রতিরোধ গড়তে তিনি এলাকায় যান। আগরতলার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভারত থেকে কিছু অস্ত্রশস্ত্র আনান। আর তার নিজের দাবি হলো, ৩ এপ্রিল তিনি পরশুরাম বিলোনিয়া সীমান্তে যান। সেখানে তিনি তিন দিনের না কাটা দাড়ি-গোঁফসমেত মেজর জিয়াউর রহমানের দেখা পান। জিয়াউর রহমানকে একটা রেস্টহাউসে সঙ্গীসহ নিয়ে গিয়ে তিনি বলেন, আপনি কি ভারতে যাবেন?
জিয়া জিজ্ঞেস করেন, আপনি যাবেন?
কাইয়ুম তখন ভারতের ক্যাপ্টেন সেনের কাছে গিয়ে বলেন, মেজর জিয়া আর তার দলবলকে ভারতে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিন। সেই অনুযায়ী জিয়া ভারতে আশ্রয় নেন। ৯ এপ্রিল কাইয়ুম নিজে আগরতলা যান।
তারপর খবর পান, যে অতীন্দ্রমোহন রায়কে তিনি ১৯৭০ সালে আগরতলা পাঠিয়েছিলেন, তাঁর ছেলে অসীম রায়কে পাকিস্তানিরা কুমিল্লার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। অসীম রায় ছিলেন জগন্নাথ কলেজের কেমিস্ট্রির ডেমোনস্ট্রেটর।
আগরতলাতেই তারা ক্যাম্প করেন। গেরিলাদের ট্রেনিং দেওয়া শুরু করেন। শরণার্থীদের খোঁজখবর করতে থাকেন। তিনি ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে যাননি। কলকাতায়ও কম যেতেন।
এবার জুলাই মাসের শুরুতে তাজউদ্দীন শিলিগুড়ির বাগডোরায় এমএনএ, এমপিএদের সম্মেলন ডেকেছেন। কাইয়ুম উত্তেজিত। কারণ, তিনি এটাতে যাবেন এবং তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনবেন। প্রধানমন্ত্রী বদলে দেবেন।
তিনি গিয়ে হাজির হলেন কলকাতায়।
খবর তাজউদ্দীনের কানে চলে গেল। এমএনএ, এমপিএরা এসে বললেন, বিএসএফের গোয়েন্দারাও জানালেন তাঁকে। জহিরুল কাইয়ুম তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে চান।
তাজউদ্দীন ডেকে আনালেন কাইয়ুমকে। কী ব্যাপার কাইয়ুম ভাই, আপনি নাকি আমার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনবেন? কারণ কী?
কাইয়ুম বললেন, আপনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এপ্রিলে। এটা জুলাই মাস। এর মধ্যে কোনো দিনও আপনি আগরতলা গিয়েছেন? আপনি কি জানেন কীভাবে আমরা মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং সেন্টার চালাচ্ছি। হাজার হাজার ছেলে প্রতিদিন আসছে ট্রেনিং নেবে বলে। তাদের কীভাবে বাছাই করা হয়, কোথায় রাখা হয়, কীভাবে তারা দেশে যুদ্ধ করতে যায়, আপনি জানেন? শরণার্থীশিবির আমরা আগরতলায় কীভাবে চালাচ্ছি, আপনি কি জানেন? আপনি নিজ চোখে দেখতে যাবেন না?
তাজউদ্দীন বললেন, কাইয়ুম ভাই। আপনি একবার এসে আমার ঘরে বসে দেখেন আমি কী করি। রাতে ঘুমানোরও সময় পাই না। নিজের ফ্যামিলির কাছে যাই না। সারা দেশের বর্ডার লাইনে ১০০টা ক্যাম্প আছে। ৬০ লাখ শরণার্থী এসে গেছে। আমার একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আছে। অনেক অফিশিয়াল কাজ থাকে। বাজেট দেখতে হয়, অনুমোদন করতে হয়। আপনি তো আমাদের দেশের মানুষের টাকাপয়সার অ্যাকাউন্টিং সেন্স কেমন জানেন। পুরোটার সমন্বয় করতে হচ্ছে। ঘর সামলাতে হচ্ছে। আবার দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। কিন্তু আমি আপনার কথা মানছি, আমার আগরতলা যাওয়া উচিত ছিল। আপনি হয়তো জানেন না, আমাকে খুন করার জন্য আমার অফিসে পিস্তলসহ একজন যুবক এসেছিল।
