আনিসুজ্জামান এর আগেই তাজউদ্দীনকে বলেছিলেন মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং শুধু আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সব দলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে। তাজউদ্দীন বলেছিলেন, কথাটা আপনি আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের বলুন। তিনি সেই কথা পেড়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াসকে। ইলিয়াস এই প্রশ্ন শুনতে অভ্যস্ত, শুনে বিরক্ত, আর তার উত্তরও ছিল প্রস্তুত। তোমাকে লাল মিয়ারা পাঠাইছে নাকি?
না না। আমাকে কেউ পাঠায়নি। আমি নিজে এসেছি।
ওদেরকে কেন নেবে? ৬ দফার পর ওরা বলে নাই ৬ দফা সিআইএ বানায়া দিছে! অরা কি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় নাই। এখনো কি বলছে না স্বাধীনতাযুদ্ধ করতে হবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আর ভারতের বিরুদ্ধে?
এখন তাজউদ্দীন তৈরি হচ্ছেন সামনে পরিষদ সদস্যদের সম্মেলন করা নিয়ে। তিনি বেশ চিন্তিত। তাঁর কাছে খবর আছে, প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব উঠবে এবং ভোটাভুটি হবে।
আনিসুজ্জামান বললেন, বিরোধিতা কোন দিক থেকে আসছে? যুবনেতাদের দিক থেকে?
তাজউদ্দীন বললেন, ওদের দিকটা থেকে যা আসছে, তা প্রকাশ্য। আমাদের জানা-বোঝার ভেতরে। ওরা বিএলএফ করেছে। এটা আমাদের সরকারের অনুমতি নিয়ে নয়। র এটাকে দেখভাল করছে। দিল্লিকে বললে তারা বলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আমাদের কন্ট্রোলে আছে। কিন্তু এর বাইরেও বিরোধিতা আছে। মোশতাক সাহেব আমাকে মানতে পারেনই না। আসলে মুজিব ভাই তো আমাদের হাইকমান্ডকে নিয়ে বসতেন। অসহযোগের সময় বিকল্প সরকার আমরা পাঁচজনই চালিয়েছি। কিন্তু মুজিব ভাই অনেকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন, সবাই নিজেকে তার পরে তাঁর উত্তরসূরি বলে নিজেকে ভাবে। আবার সেনাবাহিনীর মধ্যেও নিজেদের বড় ভাবার এবং রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকে না মানার প্রবণতা আছে।
আনিসুজ্জামান এবং খান সারওয়ার মুরশিদ দুজনেই শরীর এলিয়ে দিলেন।
তাজউদ্দীন বললেন, এত অল্পতে হতাশ হলে চলবে না। বাংলাদেশ বিজয়ী হবেই। আমি সবচেয়ে বড় সাপোর্ট পাচ্ছি সৈয়দ নজরুল সাহেবের কাছ থেকে। উনি না থাকলে ঝড়ের ঝাঁপটায় এতক্ষণে উড়েই যেতাম। তবে আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল। নানা মতের, পথের লোক এখানে একটা অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে সমবেত হয়েছে, বাংলার মানুষের মুক্তি। কিন্তু সেটা কী উপায়ে হবে, সে বিষয়ে প্রত্যেকের মত আলাদা। আর প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতিদ্বন্দ্বী। এসব বুর্জোয়া দলে হবেই। আওয়ামী লীগ তো বিপ্লবী দল নয়। গণতান্ত্রিক দল।
একটু পরে একজন এলেন তাজউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করতে। আনিসুজ্জামান আর খান সারওয়ার মুরশিদ বসে রইলেন তাজউদ্দীনের শয়নকক্ষে।
পাশের ঘরে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হলো। এই ঘরে সব শোনা যাচ্ছে।
আনিসুজ্জামান বললেন, কণ্ঠস্বর তো মনে হচ্ছে শেখ মণির।
খান সারওয়ার মুরশিদ বললেন, আমারও সে রকমই প্রত্যয় হচ্ছে।
.
তাজউদ্দীন বলছেন, মণি, বিএলএফকে ওসমানী সাহেবের কমান্ডের অধীনে আনতে হবে।
ওসমানী সাহেবের অধীনে কেন? বিএলএফের কমান্ডার আমি। এটা আমার অধীনেই থাকবে।
তাহলে তোমাকে ওসমানী সাহেবের কমান্ডের আন্ডারে আসতে হবে।
ওসমানী কে?
আমাদের প্রধান সেনাপতি!
শোনেন। আমি আপনাকে বলেছি কি না আপনাদের এই সরকারকে আমরা মানি না। বঙ্গবন্ধু আমাদের পাঁচজনকে একসঙ্গে ডেকে নিয়ে বলে দিলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ রোডে যাওয়ার কথা। আর আপনি আমাদের কাউকে কিছু না বলে চলে গেলেন দিল্লি। ইন্দিরাজির সঙ্গে দেখা করে নিজেই নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ডিক্লেয়ার করলেন। আপনি একজন অবৈধ প্রাইম মিনিস্টার। আপনার সরকার অবৈধ সরকার। আপনার সেনাপতি একজন অথর্ব। আপনাদের মানার প্রশ্নই আসে না।
এই বিভেদের মধ্য দিয়ে তোমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাও? কিন্তু এর ফলে তোমাদেরও লাভ হচ্ছে না। আমাদেরও লাভ হচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধ গতি পাবে, যদি সরকার বাতিল করে রেভলুশনারি কাউন্সিল করেন।
মণি, আমার সরকার বৈধ না অবৈধ, আমরা এমএলএ, এমএনএদের ডেকে ভোটে দেব। তারা যদি অনাস্থা জানায়, আমি তোমাদের কথা মেনে নেব। যাকে লিডার বানাবে, তাকে প্রধানমন্ত্রী করব। তার আগপর্যন্ত এই সরকারকেই তোমাদের মানতে হবে। আর একবার পরিষদ সদস্যদের ভোট হয়ে গেলে তোমাদের আমাদের অধীনে আসতে হবে।
দেখেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন করে গেছেন। আপনি নিজে একজন লেফটিস্ট। সব লেফটিস্টকে মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং দিচ্ছেন। সব চীনাপন্থী নকশালপন্থীরা ট্রেনিং পাচ্ছে, অস্ত্র পাচ্ছে। এর পরিণতি ইন্দিরাজির জন্যও ভালো হবে না। আওয়ামী লীগের জন্যও ভালো হবে না। আপনাকে সরানো হচ্ছে আমাদের এক নম্বর কাজ।
তুমি অযথা শক্তিক্ষয় করছ। এই শক্তিটা পাকিস্তানি অকুপেশনাল ফোর্সের বিরুদ্ধে কাজে লাগাও। হাজার হাজার ছাত্রলীগ কর্মীকে তুমি নিয়ে যাচ্ছ। তারা দেশে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরছে। আল্লাহর দোহাই লাগে, তোমরা থামো।
আপনি থামেন।
ওকে। আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা আর জাতীয় পরিষদ প্রাদেশিক পরিষদের সভাতেই ফয়সালা হয়ে যাবে। তুমি থেকো। দ্যাখো কী দাঁড়ায়।
