যাক। তিনি ভেতরে গেলেন, গেটের সামনে উপস্থিত দুজন সরকারের কর্মচারী তাকে চিনলেন, স্যার আপনি আসুন বলে ডেকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিরোধ পর্যায়ের দিনগুলো পার করে অন্য সব শরণার্থীর মতো বহু ক্রোশ পাড়ি দিয়ে, বহু পথ কষ্ট স্বীকার করে আগরতলা এসে পৌঁছান সপরিবার। তিনি তাঁর গাড়িখানাও আগরতলায় নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। সেখানে কিছুদিন থেকে মে মাসের মাঝামাঝি তিনি এবং তাঁর পরিবার কার্গো বিমানের টিকিট কেটে উড়ে চলে এসেছেন কলকাতা। গাড়ি আগরতলায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবহন হিসেবে কাজে লাগছে। কলকাতায় এসে দিলখুশা স্ট্রিটে ফুফুর বাসায় ওঠেন। তা ছিল এরই মধ্যে অতিথি এবং বাড়ির লোকজন দিয়ে পরিপূর্ণ। রাতে ফুফা নিজে ঘুমানোর জন্য অন্য বাড়ি যান, তাতে তার মনের মধ্যে খচখচ করে, নিজের শৈশব কেটেছে যে পাড়ায়, সেই পাড়াতেই ফুফুর বাড়িতে আজ এত দিন পর এসে নিজেকে উদ্বৃত্ত বলে গণ্য করতে হবে কি? তা সত্ত্বেও রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল। কারণ, রাতে গুলির শব্দ ছাড়া ঘুমাতে পারছেন, এ রকম রাত ২৫ মার্চের পর আসেনি। এবং তার সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে রুচি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, এখানে যুদ্ধ লাগলে কি আবার আমাদের অন্যখানে চলে যেতে হবে? এখানে। যুদ্ধ লাগবে না বলে বাবা আশ্বস্ত করেছিলেন মেয়েকে। ফুফুর বাড়িতে গাদাগাদি করে থাকার সময় তিনি সব সময় মনে করেছেন শরণার্থীদের দুঃখ দুর্দশার কথা। প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ এরই মধ্যে পূর্ব বাংলা ছেড়ে ভারতে ঢুকে পড়েছে। রোদে-বৃষ্টিতে মাইলের পর মাইল হেঁটে, পেছনে দগ্ধভিটা, নিহত পরিবার-পরিজনের লাশ রেখে যারা আসছেন, তাঁরা কোথায় থাকবেন, কী খাবেন, কোথায় বাথরুম করবেন, কোনো কিছুরই তো ঠিক নেই। আনিসুজ্জামান ভারত সরকারের খাদ্য বিভাগের কর্তা অশোক ভট্টাচার্যের। কাছে একটা ঘটনা শুনেছেন, তা মনে করামাত্রই নিজের থাকা-খাওয়ার কষ্ট এক নিমেষেই উবে যায়–
শরণার্থীশিবিরে লোক বেশি। তার ধারণক্ষমতাও কম। বরাদ্দ করা খাদ্যের পরিমাণও কম। সরকার থেকে যা বরাদ্দ করা হয়, তা এমনিতেই অপ্রতুল, তার মধ্যে মধ্যখানে সরকারি লোকেরাও খেয়ে ফেলে অনেকটাই। একটা শরণার্থীশিবিরে শিশুদের জন্য দুধ দেওয়া হচ্ছে। মগে করে দুধ তুলে। ঢেলে দেওয়া হয় প্রার্থী-মায়েদের আনা পাত্রে। শিশুদের মায়েরা শিশুদের কোলে নিয়ে, কিংবা পাশে দাঁড় করিয়ে লাইনে দাঁড়ান। দুধ কম, লাইনে মায়েদের সংখ্যা বেশি। সবাই দুধ পাবেন না, এ স্বাভাবিক। একটা দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে মা লাইনে দাঁড়িয়ে সামনে চলে এসেছেন, এবার তার দুধ নেওয়ার পালা। পেছন থেকে এক মহিলা বললেন, ওর বাচ্চাকে তো ও বুকের দুধই খাওয়াতে পারে। ওকে দুধ দেবেন না।
শুনে সামনের মা তার বুকের আঁচল সরিয়ে দেখালেন, দেখুন, আমার বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। আমার বাচ্চার বাইরের দুধই লাগে।
.
আনিসুজ্জামান ভবনের ভেতরে ঢুকলেন। অনেক ভিড়। এপার বাংলায় যারা এসেছেন, তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা, সুতরাং প্রত্যেকের অধিকার ও কর্তব্য হলো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজের সুখ-দুঃখের কথা বলা এবং এখনই করণীয় কর্তব্য সম্পর্কে মূল্যবান পরামর্শ ও সুচিন্তিত অভিসন্দর্ভ পেশ করা।
নিচতলাতেই একটা অপরিসর ঘরে বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়ে বসেন তাজউদ্দীন। নিচতলাতেই আরেকটা ঘরে তিনি রাত কাটান।
পাশের রুমে বসেছেন ফারুক আজিজ খান। কাপ্তাইয়ে ছিলেন, সুইডিশ পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পরিচালক। মার্চ-এপ্রিলে কাপ্তাই এলাকায় প্রতিরোধ সংগ্রামে যুক্ত থেকে তিনিও চলে এসেছেন বন-জঙ্গল পেরিয়ে প্রথমে আগরতলা, পরে কলকাতা। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পিএস হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। নিচতলাতেই প্রধান সেনাপতি ওসমানী বসেন এবং পাশেই একটা ঘরে রাত্রিবাস করেন।
এই ভবনে সব মন্ত্রী বসেন, ব্যতিক্রম খন্দকার মোশতাক। তিনি বসেন। বাংলাদেশ হাইকমিশনে। ৯ পার্ক সার্কাস অ্যাভিনিউতে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে তিনি আগরতলা থেকে আনিয়ে নিয়েছিলেন মাহবুবুল আলম চাষীকে, করেছিলেন পররাষ্ট্রসচিব। বহুদিন পরে আনিসুজ্জামানের মনে হবে, এই যে সরকারের অন্যদের থেকে মোশতাক নিজেকে দূরে রাখলেন, এই দূরত্ব ১৯৭৫ সালের আগস্টে কিংবা নভেম্বরে প্রকাশ পাবে তা নয়, এটা মুক্তিযুদ্ধকালেও স্পষ্ট হয়েছিল। সেটাও ১৯৭১-এর আগস্টেই।
তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করলেন আনিসুজ্জামান। তাজউদ্দীন তাঁকে বলেছিলেন সরকারে যোগ দিতে, আনিসুজ্জামান বাংলাদেশের শিক্ষকদের নিয়ে সমিতি করছেন, বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব দ্য ইন্টেলিজেন্সিয়া করছেন। কাজেই অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন।
আজকে প্রধানমন্ত্রী তাকে ডেকেছেন একটা বক্তৃতার মুসাবিদা করার জন্য। তিনি নিয়ে গেলেন তার শয়নকক্ষে। একটু পরে এলেন অধ্যাপক খান। সারওয়ার মুরশিদ। তিনি বক্তৃতার ইংরেজি ড্রাফট করবেন।
খান সারওয়ার মুরশিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক। বয়সে তাজউদ্দীনের চেয়ে এক বছরের বড়ই হবেন। কথা বলেন অননুকরণীয় ভঙ্গিতে, ক বছর আগেও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। তাঁর স্ত্রী নূরজাহান মুরশিদ তাজউদ্দীন আহমদের পারিবারিক বন্ধু। ধবধবে ফরসা, উন্নতনাসিকা খান সারওয়ার মুরশিদ তাজউদ্দীন আহমদের ইংরেজি বক্তৃতা লিখে দেন।
