সবাই থেমে গেল। সবাই চুপ। কিন্তু তাঁদের শ্বাসের শব্দ মিলে যাচ্ছে পাতার মর্মর আর ঝিঁঝির ডাকের সঙ্গে।
গুড়ুম গুড়ুম।
ইনস্ট্রাক্টর দাশগুপ্ত ফায়ার করলেন হাতির মাথার ওপর দিয়ে। অনেকগুলো। কিন্তু হাতির পাল বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না সেই শব্দকে। ক্যাপ্টেন যাদব বললেন, জোকাররা, শোনো, তিনি সবাইকে ডাকেন জোকার বলে, এই হাতি এই রাইফেলের গুলিতে টলবে না। একমাত্র অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন এদের টলাতে পারবে। চলো, পালিয়ে ক্যাম্পে ফিরে যাই। কয়েকজন পালাতে গিয়ে আহত হন। তাঁদের একজন পরে মারা যান। আবদুর রউফ এমপি এলেন ক্যাম্পে। তিনিও ছেলেদের সঙ্গেই একটা রুমে থাকেন। আর মুজিব উইং ও ভাসানী উইংয়ের প্রশিক্ষণার্থীদের রাজনৈতিক উদ্দীপনা দেন। শোষণমুক্ত সোনার বাংলা কী, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন কী, পাকিস্তানি মিলিটারি কত ধরনের অত্যাচার-নিপীড়ন করছে, সেসব সম্পর্কে বলেন।
মুজিব উইংয়ের মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা দুই সপ্তাহ পর চলে যায়। নতুন ব্যাচ আসে। তারা চলে যায় সেক্টরে। সেক্টর থেকে যুদ্ধের ময়দানে। সীমানা অতিক্রম করে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে। হাইড আউটে থাকে। পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপরে অতর্কিত আক্রমণ করে।
শেখ কামালরা রয়ে যান। তারা হলেন আর্মি অফিসার। বাংলাদেশ আর্মির প্রথম ব্যাচ। ফার্স্ট ওয়ারকোর্স ক্যাডেট। তাদের ১৮ সপ্তাহের ট্রেনিং কমিয়ে ১৫ সপ্তাহ করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র তাদের চায়।
ভারতীয় বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল অরোরা তাঁদের দেখতে আসেন। তারা সেদিন অবস্টাকল ট্রেনিং করছিলেন। ছেলেরা বহুগুণ উৎসাহ নিয়ে তাদের বাধাগুলো পার হয়ে গন্তব্যের দিকে ধেয়ে যায়। অরোরা ছেলেদের প্রশংসা করেন। বাঙালি অফিসার উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার, লে. ক. নজরুল হক, মেজর নাজমুল হক আসেন তাদের অগ্রগতি দেখতে।
ক্যাপ্টেন আর পি সিংকে বলে দেওয়া হয়েছে, শেখ কামালের দিকে নজর রেখো। কারণ, ওর বাবা পাকিস্তানিদের হাতে আটক। মা, ভাই, বোনও ঢাকায় আটক। ওর মনটা যেন ভালো থাকে।
আর পি সিং আসেন শেখ কামালের ডেরায়। সন্ধ্যার পর আজ আর ট্রেনিং নেই। বাঁশের ব্যারাকের ঘরগুলোতে কেরোসিনের হারিকেন জ্বলছে।
কামাল এসো। তারা ক্যাম্পের বাইরে পাথরের বেঞ্চিতে বসেন। আকাশে চাঁদ। চাঁদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে ঝরনায়। বর্ষাকাল। ঝরনা যেন যৌবনবতী। কলকল করে কথা কইছে।
তোমার বাবার কোনো নতুন খবর পেলে? আর পি সিং জিজ্ঞেস করেন।
না ওস্তাদ। তবে বাবাকে নিয়ে আমি কমই দুশ্চিন্তা করি। বাবার তো জেলে যাওয়ার অভ্যাস আছে। আমরা তো আব্বাকে কমই জেলখানার বাইরে দেখেছি। সব সময় দেখেছি তিনি জেলেই থাকেন। আমার দুশ্চিন্তা মাকে নিয়ে।
হ্যাঁ। আমরা তোমার মায়ের অনেক সুনাম শুনি।
মা-ই আমাদের ফ্যামিলির খুঁটি। আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে দেখেশুনে রেখেছেন মা। শুধু আমাদের ভাইবোনদের নয়, আমাদের মামাতো ভাইবোন, চাচাতো ভাইবোন, ফুফাতো ভাইবোন–সবাইকে মা-ই দেখেন। এখন মা ও বন্দী।
তুমি কি বেশি দুশ্চিন্তা করো?
না। মা-ও শক্ত আছেন। উনি আগরতলা মামলার সময় আব্বাকে বলেছিলেন, প্যারোলে মুক্তি নিবা না। এবারও বারবার করে বলেছেন, খবরদার, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা চিন্তাও কোরো না। আমার ছোট ভাইটা অনেক ছোট। মাত্র ৬ বছর বয়স। ওকে মিস করি। আমার বড় আপার বাচ্চা হওয়ার কথা। জানি না তারা কে কোথায় কেমন আছেন।
রাত বাড়ে। আর পি সিং বলেন, যাও, ঘুমাতে যাও।
সারা দিনের ধকলের পর ছেলেরা পড়ে পড়ে ঘুমান। কেউ কেউ রেডিও শোনেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর। বিবিসির খবর। আকাশবাণীর খবর। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চরমপত্র তাদের বড় প্রিয়।
কামাল বিছানায় যান। উল্টো দিকে শুয়ে আছে শচীন। ওর সঙ্গে প্রায়ই কাপড়চোপড় ওলটপালট হয়। ধোপার কাছ থেকে কাপড়গুলো যখন ফেরে, কোনটা যে কার বোঝা মুশকিল। তাই কাপড়ের গায়ে লিখে রাখতে হয় শে কা। শচীনের নাক ডাকার শব্দ আসছে।
কামালের খুব রাসেলের কথা মনে পড়ছে। রাসেল কেমন আছ, আদরের ভাইটি!
৪৭
আনিসুজ্জামান দাঁড়িয়ে আছেন থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয়ের সামনে। দোতলা কোঠাবাড়ি। চারদিকে উঁচু, মোটা প্রাচীর। ভেতরে অনেক খোলা জায়গা। গেটের ভেতরে ঢুকলে সুপরিসর প্রাঙ্গণ খোলা জায়গা মনটাকে একটা উন্মুক্ততার আশ্বাস দেয়। প্রাঙ্গণে বড় বড় গাছ আছে, গোড়া বাঁধানো গাছগুলোর বৃষ্টিস্নাত পাতা এবং সেসবের ছায়া শরীর ও মনকে আরামের স্পর্শ বোলায়। ছোট ছোট ফুলের ঝাড়ে নাম না-জানা হলুদ ফুল বর্ষার ভেজা বাতাসে মাথা দোলাচ্ছে। আনিসুজ্জামানের মনে হলো, বাড়িটা বেশ বড়, আঙিনাও সুপরিসর, তা সত্ত্বেও এটা একটা সরকারের কার্যালয় হওয়ার মতো বড় নয়। এটা আগে ছিল অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি। বাড়ির মালিকানা বদলে গেছে, আনিসুজ্জামান খেয়াল করে দেখলেন, সবাই এটাকে থিয়েটার রোড বললেও সাইনবোর্ডে রোডের নাম লেখা– শেক্সপিয়ার সরণি। গেটে বিএসএফের পাহারা। বিএসএফের লোকজনের সঙ্গে দর্শনার্থী ওপার বাংলার মানুষদের বচসা হচ্ছে। স্বদেশের মাটি ছেড়ে যারা কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন, তাঁরা থিয়েটার রোডে এসে বাংলাদেশ সরকারের নেতাদের সঙ্গে দেখা করবেন, তাদের আবার গেটে আটকানো কেন? আনিসুজ্জামান মনে মনে হাসছেন, দর্শনার্থীদের একজন এখনই নিশ্চয় বলে বসবেন, আপনি জানেন আমি কে? কিন্তু হাসলেন না, কারণ, তাঁর নিজেকেও এই গেট পেরোতে হবে। তিনি নিজেই-বা কী পরিচয় দেবেন, কী বলবেন, এই আনিসুজ্জামান কে?
