আবার আর্মি বাস এল। তারা পৌঁছালেন মুরতি ওটিএস–অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে। শিলিগুড়িতে, ইকো সেক্টর ৩৩ কোরের অধীনে। বাঁশের তৈরি ঘর, টিনের ছাদ। পাহাড়ি উঁচু-নিচু জমিনে ঘন জঙ্গলের মধ্যে এই ক্যাম্প।
এই ক্যাম্পের বেশির ভাগজুড়ে আছে এফএফ প্রশিক্ষণার্থীরা। তাদের ট্রেনিং দুই সপ্তাহের। তাদের উইংয়ের নাম মুজিব উইং। শেখ কামালরা গেলেন ভাসানী উইংয়ে। তাদের ট্রেনিং হবে ১৮ সপ্তাহের।
তাঁদের দেওয়া হলো বেডিং, পরার জন্য শার্ট, সেই শার্ট রঙিন ফুল আঁকা, তার বোতাম বুকের নিচে থেকে শুরু হয়েছে, আর তাতে ফতুয়ার মতো নিচের দিকে দুপাশে দুটো পকেটও আছে। একটা করে ঢোলা আর লম্বা হাফপ্যান্ট দেওয়া হলো। আর ট্রেনিংয়ের সময় পরার জন্য দেওয়া হলো খাকি ডুঙ্গারি।
বেডিং বিছাতে হবে সিমেন্টের মেঝেতে। হারিকেনের আলো নেভানোর অর্ডার যখন আসবে তখন। পরে অবশ্য তাদের জন্য আসে বাঁশের তৈরি খাঁটিয়া। বাঁশের খুঁটির ওপরে বাঁশের ফ্রেম, মধ্যখানে দড়ির জাল।
রাতের বেলা তাদের ৬১ জনকে জড়ো করা হলো। দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী ক্যাম্প থেকে সবাই এসেছেন। দুজন যমজ ভাই আছেন-মুহিব আর মিজান। আরও দুই ভাই আছেন, সেলিম আর আনিস (সেলিম পরে শহীদ হবেন, এই ব্যাচ থেকে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনজন শহীদ হন)।
চিফ ইনস্ট্রাক্টর কর্নেল দাশগুপ্ত কথা বললেন। তিনি জানালেন, এটা আর্মি অফিসারদের পূর্ণ ট্রেনিং। যেহেতু মাত্র ১৮ সপ্তাহে কোর্স শেষ করতে হবে, কাজেই যুদ্ধে লাগবে না, এমন সব সাবজেক্ট বাদ দেওয়া হবে। তোমাদের টেবিল ম্যানার্স শেখানো হবে না। প্যারেড ভালোভাবে করতে হবে না। পিটি করানো হবে, যাতে তোমরা যুদ্ধের ময়দানের কষ্ট, পরিশ্রম সহ্য করা শিখতে পারো। আর শেখানো হবে যুদ্ধ, অস্ত্রচালনা, যুদ্ধ পরিকল্পনা, নেতৃত্ব দেওয়া, কমান্ড দেওয়া।
তিনি জানালেন, ব্রিগেডিয়ার টি ডে যোশি, এখানকার ব্রিগেড কমান্ডার, পদাধিকারবলে এই ট্রেনিং সেন্টারের প্রধান। মেজর আশমান সিং থাপা হলেন সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর। ক্যাপ্টেন যাদব, ক্যাপ্টেন চন্দন, ক্যাপ্টেন আর পি সিং, ক্যাপ্টেন স্তাহান পাতি প্রমুখ হলেন ইনস্ট্রাক্টর।
দিন শুরু হয় ভোরের আগের ভোরে। তখন পুরো মুরতি ঢেকে থাকে অন্ধকারে। উত্তরবঙ্গের ভ্যাপসা গরমে আর আর্দ্রতায় সারা রাত সেদ্ধ হয়ে। তারা এই ভোররাতে বিছানা ছাড়েন, বিছানা গোটান। তারপর লাইনে দাঁড়ান, আধা মগ করে দুধ-চিনি দেওয়া চা নেওয়ার জন্য। এরপর যেতে হবে গর্তের ওপরে বানানো ল্যাট্রিনে, পানির জন্য ব্যবহার করতে হবে খালি বিয়ারের বোতল। সেখান থেকে এসে নাশতা। পুরি আর ভাজি। আবারও চা। তারপর ডুঙ্গারি পরে নিয়ে ৬১ জন চললেন ট্রেনিংয়ে। হাতে তুলে নিতে হলো রাইফেল। পিটি হলো, প্যারেড হলো। তারপর অস্ত্রচালনা ট্রেনিং। মাঝেমধ্যে লেকচার। রণকৌশল বিষয়ে ক্লাস। রাতের বেলা নাইট এক্সারসাইজ। জঙ্গলের ভেতরে গিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে বাস্তবের শত্রুর সঙ্গেও লড়া, মশা আর জোক। জঙ্গল থেকে ফেরার পর দেখা গেল অনেকেই সঙ্গে করে এনেছেন রক্ত খেয়ে ফুলে ওঠা জোঁক। কয়েক দিনের ট্রেনিং চলার পরেই অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বিখ্যাত ফিরু ভাই তাঁদের একজন। ক্রলিং করতে করতে তার হাঁটু ফুলে উঠল। কিন্তু ট্রেনিংয়ে মাফ নেই। ট্রেনাররা বললেন, তোমাদের এক বছরের ট্রেনিং চার মাসে করানো হবে। কাজেই দিন-রাত তোমাদের ক্লাস করতে হবে, মাঠে থাকতে হবে। অস্ত্র চালানো শেখার জন্য তাদের নিয়ে যাওয়া হলো বাগডোরা ক্যান্টনমেন্টে। সেখানে তাদের ফায়ারিং শেখানো হলো। টার্গেট প্র্যাকটিস। এই যুবকদের হাতের নিশানা দেখা গেল বেশ ভালো।
ভোর চারটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম। খাবার সবজি ডাল। মাসে হাতখরচ হিসেবে দেওয়া হয় ১০০ টাকা। সেই ১০০ টাকা দিয়ে ছেলেরা দোকান থেকে হরলিকস বিস্কুট, দই ইত্যাদি কিনে খায়। কিছুদিনের মধ্যেই সেই টাকা শেষ হয়ে যায়। শচীন আর ফিরু ভাই সেক্টর থেকে এসেছেন। তাঁদের আসার সময় হাতখরচ হিসেবে দুই হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তা দিয়ে তারা মোটামুটি বড়লোক।
একদিন শচীন দেখলেন, বিকেলবেলা সবাই কিছু না কিছু খাচ্ছেন, শুধু শেখ কামাল ছাড়া।
শচীন বললেন, কামাল, কিছু খা। এমনিতেই তুই শুকনা-পটকা। না খেলে তো মারা যাবি।
কামাল ম্লান হেসে বললেন, টাকা পাব কই?
শচীন বললেন, জাতির পিতার দরিদ্র পুত্র! চল তোকে খাওয়াই। শচীন কামালকে হরলিকস বিস্কুট কিনে দিলেন। তারপর দুই শ টাকা গুঁজে দিলেন। কামালের পকেটে।
মুরতি ক্যাম্প জায়গাটা ভয়াবহ সুন্দর। পাহাড়, জঙ্গল। আর আছে। ঝরনা। মুরতি নুল্লাহ নাম ঝরনাটার। ডুয়ার্সের চা-বাগান পাশেই।
একদিন রাতের বেলা সবাই ডাবল মার্চ করে জঙ্গলের পথে ঢুকলেন। লেফট-রাইট-লেফট-রাইট। বুনো পথ। আস্তে আস্তে পাহাড়ের ওপরে উঠে গেছে। দুজনের হাতে টর্চ। টর্চের আলো মার্চের সঙ্গে সঙ্গে নড়াচড়া করছে। বনের ভেতরে শিয়াল, বনবিড়াল, বেজির চোখে আলো পড়লে জ্বলে ওঠে সেসব চোখ। বড় বড় গাছ সব। রেইন ফরেস্ট। সবাই জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। হঠাত্র ক্যাপ্টেন দাশগুপ্ত বলে উঠলেন, স্টপ। সামনে হাতির পাল। এদিকেই আসছে ধুপধাপ শব্দ তুলে। আবার ডাকছে হাতির দল। বৃংহিত।
