তাজউদ্দীন আহমদ সম্মতি দিলেন। ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। প্রথম ব্যাচে নেওয়া হবে ৬০ জন। ট্রেনিং হবে মুরতি ট্রেনিং ক্যাম্পে।
কামাল বললেন, ৬০ জনের জায়গায় ৬১ জন করতে হবে। আমি যাব।
ওসমানী বললেন, তুমি যাবে?
হ্যাঁ। আমি আপনার এডিসি আছি। তা-ও না হয় থাকলাম। কিন্তু আমরা জানি না যুদ্ধ কবে শেষ হবে। আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমারও অফিসার ট্রেনিং থাকা কি উচিত নয়?
ঠিক আছে। আমি তাজউদ্দীন সাহেবকে জিজ্ঞেস করে নিচ্ছি।
ওসমানী জানেন, কামাল কেবল তার এডিসি নন, তিনি প্রেসিডেন্টের ছেলে। যদিও কামালের মতো নরমশরম ভদ্র বাধ্য ছেলে তিনি এই জীবনে। দ্বিতীয়টা দেখেছেন কি না সন্দেহ!
তাজউদ্দীন আর ওসমানী একই ভবনে বসেন। ৮, থিয়েটার রোড, কলকাতা।
কামাল বললেন, স্যার আপনি বললে আমি তাজউদ্দীন কাকুর কাছে নিজেই যেতে পারি।
না। আমি যাই। একটা ডিসিপ্লিনের ব্যাপার আছে। হয়তো উনি তোমাকে মনের কথা বলতে চাইতে না-ও পারেন।
ওসমানী গেলেন তাজউদ্দীনের কাছে। একটু পরে ফিরে এসে বললেন, কংগ্রাচুলেশনস, মাই বয়। তুমি যাচ্ছ ওয়ারটাইম কোর্সের ফার্স্ট ব্যাচেই।
২২ জুন কামাল, শচীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের বিখ্যাত ফিরু ভাই, যিনি এনএসএফের গুন্ডাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমীহ অর্জন করেছেন, খোন্দকার নুরুন্নবী, অলীক কুমার গুপ্ত, মঈনুল, মোহাম্মদ আলীসহ ১২ জন ব্যারাকপুরের ব্যারাকেই রাত কাটালেন। ২৩ জুন তাঁদের তোলা হলো আর্মির ট্রাকে। জঙ্গল-পাহাড় ডিঙিয়ে অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত আঁকাবাঁকা পথে চলল ট্রাক। সন্ধ্যায় তাঁরা গেলেন একটা সেনানিবাসে। একেবারে জঙ্গলের মধ্যে। সেখানেই রাতের খাওয়া আর ঘুমানো। রাতের বেলা সেই ব্যারাকের ওপরে কয়েকটা যুদ্ধবিমান চক্কর দিল। শচীনের ধারণা, এটা দিচ্ছে কামালের নিরাপত্তা চেক করে দেখার জন্য। কামাল বললেন, হ। কামাল তো ইন্দিরা ম্যাডাম, তারে পাহারা দেওয়ার জন্য যুদ্ধবিমান পাঠায়া দিছে! ২৪ জুন তাঁরা উঠলেন আর্মির বাসে। টাটা কোম্পানির বাস। বেশ শক্তপোক্ত। জানালার কাঁচে কাদার দাগ। কামাল জানালার ধারে বসলেন। তারা এসেছেন সমভূমি থেকে। ঢাকা বলো, টুঙ্গিপাড়া বলো, ল্যান্ডস্কেপ মানে সমভূমি, মনে হয় জমি কেউ ইস্তিরি করে সমান করেছে। জমির সঙ্গে একই তলে জলাভূমি। সেই সব খাল-বিলের পানির তলও সমান। এই পাহাড়ি পথ, আঁকাবাঁকা, মারাত্মক ভয়াবহ গভীর খাদ, পাহাড়ের গায়ে পাইনগাছ, আর ওই দ্যাখো নীল পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে ঝরনা–এসব দেখে কার না মন ভরে ওঠে। তখন যুদ্ধের কথা, রক্তের কথা, স্বজন হারানোর কথা, শরণার্থীশিবিরে নারী শিশু-বৃদ্ধসহ সবার পর দুর্ভোগের কথা কিছুক্ষণের জন্য যেন ভুলে থাকা যায়।
যায় কি? একটু পরপর মনে পড়ে। কত ভয়াবহ কাহিনি আছে! একটা এলাকা ছিল মুক্তিবাহিনীর দখলে। পাকিস্তানি আর্মি কয়েকবার আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনীকে সরাতে পারছিল না। সে এপ্রিলের শুরুর দিকের কথা। তারপর তারা বিপুল শক্তি নিয়ে ফিরে এল, মর্টার, আকাশ থেকে জঙ্গি বিমান–একযোগে আক্রমণ চালাল। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদও ফুরিয়ে এসেছে। ভারত থেকে তখনো অস্ত্র, গোলাবারুদ যাওয়া শুরু হয়নি। কাজেই মুক্তিবাহিনী পিছু হটে চলে এল ভারতের ভেতরে। এবার পুরো এলাকা ঘিরে ফেলল মিলিটারিরা। বাড়িঘরে আগুন দিল। আর চলল নির্বিচার গুলি। পুরুষ মানুষেরা আগেই পালিয়েছিল। যারা ছিল, সবাইকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করল। নারীদের মধ্যে যারা বৃদ্ধ, তাদের ছুঁড়ে দিল জ্বলন্ত বাড়িঘরের মধ্যে। প্রায় ৫০ জন কিশোরী, তরুণী, যুবতী নারীকে তারা আলাদা করল। তাদের বলল, তোমাদের মারা হবে না। তোমাদের কোনো ভয় নেই। তারা তাদের নিয়ে গেল ক্যাম্পে। সেখানে তাদের উলঙ্গ করে রেখে দিল। সারা রাত ধরে চলল ধর্ষণ। কামড়ের দাগে মেয়েগুলোর প্রত্যেকের সারা গা ক্ষতবিক্ষত। একই নারীকে ধর্ষণ করল ৫ জন, ৬ জন, ১০ জন। অসহ্য হয়ে ওঠে! তারপর দিনের বেলা ৫০ জন উলঙ্গ নারীকে এক দড়িতে বেঁধে পাকিস্তানি মিলিটারি নিয়ে গেল নদীতে। গোসল করানোর জন্য। এই ধরনের করুণ কাহিনি শুনলে চোখের পানি আটকানো যায় না। কামাল এই কাহিনি শুনেছেন একজনের কাছ থেকে, তিনি আবার শুনেছেন ভারতীয় জেনারেল উবানের মুখ থেকে। বাসের জানালার ধারে বসে কামাল চোখ মোছেন, আর মনে মনে শপথ নেন, ট্রেনিং শেষ করে তিনি অবশ্যই যুদ্ধের ময়দানে যাবেন। বাংলার মেয়েদের এই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই হবে।
বাস থেকে গিয়ে তারা উঠলেন ট্রেনে। ট্রেন থামল একটা ছোট্ট পাহাড়ি স্টেশনে। সবুজ পাহাড় পেছনে, ছবির মতো স্টেশনটাকে বলা হয় নিউ মল। সেই স্টেশনে নেমে দেখা গেল আরও আরও ক্যাডেট এসেছেন। একে অপরের পরিচিত। হইহই করতে লাগলেন যুবকেরা। আগরতলা মেলাঘর থেকে মেজর খালেদ মোশাররফ পাঠিয়েছেন ১২ জনকে। সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের, ক্যাডেট কলেজের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, ছাত্রলীগের–একেকজন একেকভাবে আরেকজনের সঙ্গে পূর্বপরিচিত। এ ওকে জড়িয়ে ধরছে, ও একে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কবি কায়সার হকও আছেন এই দলে।
