শিপ্রাতীরেই আছে ভর্তৃহরি গুম্ফা। এই গুম্ফা-গুহা নিয়ে যে কাহিনি আছে, তা না জানলেই নয়। ভর্তৃহরি ছিলেন উজ্জয়িনীর রাজা। তিনি প্রাচীন ভারতের কবি ভর্তৃহরিই হবেন অনুমানে। রাজমহিষীর সঙ্গে রাজার বৈমাত্রেয় ভাই বিক্রমের অবৈধ সম্পর্কের কথা জেনে রাজ্যপাট ত্যাগ করে তিনি এই গুম্ফায় আশ্রয় নিয়ে ২৪ বছর উপাসনা করেন গোরক্ষনাথের। বিক্রমাদিত্য উজ্জয়িনীর রাজা হলেন। আসলে তখন যিনি সিংহাসনে বসতেন, বিক্রমাদিত্য উপাধি তাঁরই হতো। উজ্জয়িনী নাথ যোগীদেরও তীর্থক্ষেত্র। উজ্জয়িনীতে সূর্যঘড়ি আছে। আছে পাঠান আমলের কেল্লা দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। ছিল যে শাদা ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা, তা এখন নাকি নেই। অটোয় চেপে মহাকাল দর্শন হয় না। ফুলওয়ালারা বেশিরভাগ দেখেছিলাম মুসলমান। টাঙ্গাওয়ালারা তো নিশ্চয়ই। সে বড় সুখের পুণ্যধাম ছিল উজ্জয়িনী নগর। এখন যাইনি কতদিন। জানি মহাকালেশ্বর রক্ষা করেন। তিনি আছেন। তিনি উজ্জয়িনী নগরের সকল মানুষকে বাঁচিয়ে রাখেন। আমি ভাবি দেবতার কোনো ধর্ম নেই। ধর্ম নিয়ে দেবতার মাথা ব্যথা নেই। সব আছে মানুষের।
নতজানু
গৃহস্তের বাড়ি – প্রবেশ নিষেধ। বেলগাছিয়া থেকে হাঁটাপথে ঘুঘুডাঙা দিয়ে দমদম নেত্র সিনেমায় যেতে যেতে কত দেখেছি। তখন কৈশোর পার হয়েছি। অবাক হয়ে ভেবেছি তার অর্থ। পরে কেউ বুঝিয়ে দিয়েছিল। নতজানু সেই গৃহস্তের বাড়ির পাড়া, কালীঘাট মন্দিরের চারপাশের কাহিনি। বালিকা মিছরি ওপাড়ার মেয়ে, সে চক দিয়ে দরজায় এই কথা ফুটিয়ে তুলছিল। মুকুট এপারের ভালো পাড়ার বালক। মুকুট এই উপন্যাসের সেই এক প্রোটাগনিস্ট যে রাস্তার দুপারে যেতে যেতে বড় হতে থাকে। মিছরি ভালো পাড়ায় আসে। বালিকা এবাড়ি ওবাড়ি যায়। আশ্চর্য এক শৈশব যাত্রার কথা লিখেছেন জয়ন্ত দে তাঁর নতজানু উপন্যাসে। বেশ্যাপাড়ার ছেলে মেয়ে আর ভালো পাড়ার ছেলে মেয়ে একসঙ্গে বড় হয়ে উঠছে, এ কাহিনি কবে কে লিখতে পেরেছে?
মাতৃমন্দিরের ঘৃত প্রদীপের পিলসুজের নিচে যে অন্ধকার সেই অন্ধকার কালীঘাট আর প্রদীপের অনুজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত মুখচ্ছবি নিয়ে নতজানু উপন্যাস। এই নগর নিয়ে যে গল্প পড়েছি মতি নন্দীর তা উত্তর কলকাতা, এই নগর নিয়ে, নগর কলকাতার ছোট এক জনপদ নিয়ে, আর এক সেই উত্তাল এবং হিংস্র এক সময় নিয়ে উপন্যাস রচনা তেমন হয়েছে বলে জানা নেই। একটি শহর তার আলো, অন্ধকার-উত্তাপ ও হিমশীতলতা নিয়ে বাংলা উপন্যাসে ধরা থাকবে, তাইই তো স্বাভাবিক। কলকাতা শহর বা এই শহরের কোনো এক অঞ্চল আমাদের উপন্যাসে রয়েছে রক্ত-মাংস নিয়ে এমন উদাহরণ দেওয়া সহজ নয়। কলকাতা নিয়ে তেমন উপন্যাস কই যেখানে সাধারণ, খুব সাধারণ, নিম্নবিত্ত এবং বিত্তহীন মানুষ, দুঃখী মানুষ নিম্ন বর্গের মানুষ, নিরুপায় মানুষ ধরা পড়েছে? শহর হয়েছে প্রধান চরিত্র? নতজানু উপন্যাস আসলে এই নগরের সেই আখ্যান, সেই ভয়ানক সময়ের ইতিহাস, যা ক্রমশ ধূসর হয়ে আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল। মানুষ যা মনে রাখতে চায় না, তা স্মৃতি থেকে অবলুপ্ত হতে থাকে ধীরে ধীরে। আমরা কি সত্যই ভুলে যেতে চাই গত শতকের সত্তর দশকের সেই উত্তাল সময়ের কথা। আক্রমণকারী আর আক্রান্তের কথা? এই উপন্যাস পাঠের পর এমন প্রশ্ন জেগে উঠেছে আমার ভিতরে। বড় কথা, এর পটভূমি ইতিহাস-বিধৃত এক অঞ্চল যা এই শহরের সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে অনেকটাই সংপৃক্ত। কালীঘাটের কথা আমি প্রেমেন্দ্র মিত্রতে পেয়েছি। বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে, সংসার সীমান্তের কালীঘাট আর জয়ন্ত দের কালীঘাট আলাদা হয়েও এক, এক হয়েও আলাদা। প্রেমেন্দ্র মিত্রর ঐ দুই গল্প আমাদের ছোট গল্পের অসীম শক্তিকে চিহ্নিত করে। জয়ন্ত যে কালীঘাটের ছবি এঁকেছেন তাঁর এই বৃহৎ উপন্যাসে তা নিশ্চিত ভাবে আমাদের উপন্যাসের ইতিহাসে উচ্চারিত হতে থাকবে ক্রমাগত। এই উপন্যাস না পড়লে এই শহরকে চেনা হবে না সত্য। নতজানু উপন্যাস লেখা হয়েছে কালীঘাট মন্দিরের সেবাইয়েত এক হালদার পরিবার নিয়ে। যে মন্দির ধার্মিক হিন্দুর কাছে এক পবিত্র বিশ্বাসের স্থল, সেই মন্দির ঘিরে যে ক্লেদ তার উজ্জ্বল উদ্ধার এই নভেল। হালদার পরিবারের বালক মুকুট যে সময়ে বড় হয়ে ওঠে সেই সময় ছিল ভুলে না যাওয়ার সময়। আমরা সেই সময়ে যুবক। যৌবন ছিল সন্দেহের আধার। জয়ন্ত সেই সময়কে উদ্ধার করেছেন নিপুণ কথন শৈলীতে। এমন সত্য এখানে উচ্চারিত যা ছিল অশ্রুত। চেনা শহর আর এই প্রাচীন জনপদ অচেনা হয়েই বারবার ধরা দিয়েছে আমার কাছে। পড়তে পড়তে বিস্মিত হয়েছি কতবার। এ কোন শহর, চার্লস ডিকেন্সের সেই সেই মস্তান, অনাথ বালকদের ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করার অন্ধকার জগতের শহর, অলিভার ট্যুইস্টের শহর? কিংবা ভিক্তর হুগোর সেই পরাজিত মানুষের জীবনোপখ্যান যা পড়েছিলাম লা মিজারেবল উপন্যাসে, সেই সব মানুষের অন্য উপাখ্যান। আমাদের শহর নিয়ে লিখেছিলেন যুবনাশ্ব, পটলডাঙার পাঁচালি উপন্যাসে। জয়ন্তর উপন্যাসে অনেক বড় করে ধরা পড়েছে এই শহর আর সেই ভয়ানক সময়, গত শতাব্দীর ৭০ দশকের আরম্ভের কয়েক বছর। সেই সময়কে আমরা ভুলেই গিয়েছি প্রায়। নাহলে আমাদের সাহিত্যে তার ছায়া নেই কেন তেমন করে? এই উপন্যাসে আছে, যুব কংগ্রেস মজুত উদ্ধারে নেমেছে, কলকাতায় পাতাল রেলের কাজ আরম্ভ হলো, তাই হকার উচ্ছেদ হলো, রেশনে সব কিছুই অমিল, চাল, গম, চিনি, কেরসিন, সি পি আই কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল, রেলের থার্ড ক্লাস উঠে গেল… সব শুনে শ্রীনাথ বলে, ‘যেখানে যাই হোক আমাদের মায়ের রাজত্ব ঠিক আছে’। মা হলেন কালীঘাটের মন্দিরের মা। মন্দির আর তার চারপাশই এই আখ্যানের চালিকাশক্তি। উপন্যাসের খুটিনাটি থেকে সময়ের ইতিহাস রচনা করা যায়। নতজানু সেই প্রেক্ষিতে অসাধারণ। মন্দির কমিটিতে ঢুকছে কংগ্রেসি লোকজন। মন্দিরের কত আয়, পার্টি তো ঢুকবেই। সেই পার্টির যুব সংগঠনের নেতা শ্রীনাথেরই পুত্র দেবু। কংগ্রেসি রাজত্ব, ৭২-এর ইন্দিরা কংগ্রেস, ৭৫-এর এমার্জেন্সি, সেই সময়ের কত কাহিনি, সব ভুলে গেছি। মানুষ বিস্মৃতিপ্রবণ, লেখকই সেই হারিয়ে যাওয়া সময়কে উদ্ধার করেন উপন্যাসের পাতায়। হকার্স ইউনিয়ন হাত বদল হয় মৃৎশিল্পী যতনের বড়দার কাছ থেকে। যতনের বড়দা মনে প্রাণে বামপন্থী। সে বামপন্থী পার্টি ছেড়ে দিয়ে বেইমান হয়ে গেল, অথচ না ছাড়লে উপায় ছিল না। তার সংসারের অন্ন বন্ধ হয়ে যেত। হকার বড়দা জায়গাই পেত না ফুটপাথে পশরা নিয়ে বসার। এই রাজনৈতিক দখলদারি তো বন্ধ হয়নি। কিন্তু এই ইতিহাস কেউ লেখেনি। না উপন্যাসে, না সিনেমায়। কোথাও না।
