উজ্জয়িনী নগর পুণ্যধাম, কেন না এই নগর ভুবন শ্রেষ্ট মহাকবি কালিদাসের নগর। আমি খুব অল্প বয়সে যখন উজ্জয়িনী নগরের কথা পড়েছি কালিদাসের মেঘদূতম কাব্যে, ভেবেছিলাম এ বুঝি কবি-কল্পনার নগর। এই নগরের অস্তিত্ব নেই এই ভুবনে। এখন মনে পড়ে অতি প্রত্যুষে, তখনো উষার আলো ফোটেনি, বিলাসপুর ইন্দোর এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে নেমেছি উজ্জয়িনীতে। মার্চ মাস। ভোরে বেশ ঠাণ্ডা। স্টেশনেই দাঁড়িয়ে থাকত আব্দুল কিংবা ইসমাইলের বড় বড় শাদা ঘোড়ার টাঙ্গা। টাঙ্গায় চেপেই আত্মীয়গৃহে। আবার সেই টাঙ্গায় চেপে উজ্জয়িনী নগর পরিক্রমা ছিল এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। আর নগর পরিক্রমায় প্রথম দর্শন মহাকালেশ্বর মন্দির। এখন যা রুদ্র সাগর নামের এক হ্রদ কিংবা জলাশয়ের তীরে, প্রাচীন ভারতে তা ছিল গন্ধবতী নদীর তীরে। মেঘদূতম কাব্যে কালিদাস গন্ধবতীর কথাই বলেছেন। উজ্জয়িনী যেতে এখন শিপ্রা এক্সপ্রেস হয়েছে, সরাসরি চলে যায় সেই ট্রেন। তখন ভোপাল, উজ্জয়িনী, ইন্দোর যেতে আহমেদাবাদ এক্সপ্রেসে ইন্দোর বগি থাকত। বিলাসপুর কিংবা নাগপুরে ইন্দোর বগিটি বিলাসপুর ইন্দোর এক্সপ্রেসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হতো। ৩৬ ঘন্টা লাগত হাওড়া থেকে উজ্জয়িনী। উজ্জয়িনী মন্দির নগরী। মহাকাল তো আছেনই। আছে কালিদাসের শিপ্রা নদীর তীরে মন্দির আর মন্দির। সন্ধ্যায় শিপ্রার তীরে রাম ঘাটে সাধুদের স্তোত্র উচ্চারণ এবং প্রদীপ হাতে আরতি দর্শন এক বিরল অভিজ্ঞতা। কেন বিরল, না তার ভিতরেই বহুদূর থেকে ভেসে আসছে মগরিবের আজান ধ্বনি। সব কিছুই শান্ত। সব কিছুই পবিত্র। শিপ্রা তীরে হাঁটু মুড়ে নমাজ আদায় বসেছেন ধর্মপ্রাণ প্রবীণ। শিপ্রা তীরে বড় গণেশের মূর্তি, চিন্তামণি গণেশ, সিদ্ধ বট, হনুমান মন্দির যেমন আছে, শিপ্রাতীরে রয়েছে মঙ্গলনাথের মন্দির। মঙ্গলনাথ হলেন মঙ্গল গ্রহ। প্রাচীন ভারতের জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির এই নগরেই বাস করতেন। তিনি অঙ্ক কষেই নাকি মঙ্গল গ্রহকে খুঁজে পেয়েছিলেন প্রথম। এই শিপ্রাতীর থেকেই লাল তারাটিকে তিনি রাত্রির আকাশ-মণ্ডলে দেখতে পান। কল্পনাই হয়তো। কিন্তু সন্ধ্যায় আপনি যখন মঙ্গলগ্রহের মন্দিরের সামনে বসবেন শিপ্রাতীরে, মনে হবে তাইই সত্য। না মঙ্গলনাথ নিয়ে এখানে ধুমধাম নেই। মঙ্গলনাথ তাঁর মন্দিরে একাই থাকেন। তাঁরও লিঙ্গ মূর্তি। সমুখে একটি মেষ। দিনে একবার পূজারী এসে পুজো করে দিয়ে যায়। দরজার চাবি তাঁর কাছে। খুব কাছেই থাকেন তিনি। মন্দিরের ভিতরে সিঁদুর চর্চিত লিঙ্গ দেবতা মঙ্গলনাথকে আমি দেখেছিলাম। তিনি সামান্যতে তুষ্ট। মুসুর আর অড়হর ডাল দিন, দিন একটি সূর্যমুখী ফুল, মঙ্গলনাথ গ্রহণ করবেন। উজ্জয়িনী নগরে জ্যোতিষ চর্চা চলে রমরম করে। জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা আর জ্যোতিষ চর্চা তো এক নয়। কিন্তু জ্যোতিষ চর্চা নাকি এই নগরে অনেক প্রাচীন এক অভ্যাস। যাক সে কথা, মনে পড়ে সেই এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যার কথা। শিপ্রাতীরে একাকী বসেই মনে হয়েছিল কিছু একটা কাছে এসে চলে যাচ্ছে। তা কি মন্দিরে অবহেলায় পড়ে থাকা দেবতা মঙ্গল গ্রহ? না, অন্য কিছু। আমার কাছে মঙ্গলময় কিছু আসছে, যা কিনা এই পুণ্যধামে এসে আমার অর্জন। মহাকালেশ্বর দর্শনে আমার অর্জন। সিদ্ধ বট, শিপ্রা নদী দেখে আমার অর্জন। কালিদাস একাডেমিতে সন্ধ্যায় সংস্কৃত নাটক অভিজ্ঞান শকুন্তলম দেখাও ছিল আমার অর্জন। লোক বিশ্বাস শিপ্রা তীরে গড় কালিকা মন্দিরে কালিদাস শিবের আরাধনা করতেন। সেই মন্দির দেখাও ছিল আমার অর্জন। হ্যাঁ, আমি অর্জন করে ছিলাম পুণ্য। এই ধাম দর্শনের পুণ্য। নির্জন মঙ্গলনাথের মন্দির, শিপ্রা নদী তীরের সেই সন্ধ্যাই আমাকে দিয়েছিল ধ্রুবপুত্র উপন্যাস লেখার ভাবনা। তারপর সেই লেখার জন্য কতবার যে গিয়েছি ওই নগরে। উজ্জয়িনী নগর অতি পুণ্যধাম। ওই নগরের মাটিই পুণ্য। আমি তো লিখতে পেরেছিলাম ঐ দূর দেশের জনপদটিকে নিয়ে যা ছিল আমার কাছে এক অলীক নগরীই। কালিদাসের মেঘদূতম কাব্যে যক্ষ মেঘকে উজ্জয়িনী নগর ঘুরে উত্তরে হিমালয়ের দিকে অলকা পুরীর পথে যেতে বলেছিল। বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদ স্মরণ করি।
জেনেছো, উত্তরে তোমার অভিযান; যদি বা পথ হয় বক্র,
ভুলো না দেখে নিতে উজ্জয়িনীপুরে সৌধসমূহের উপরিতল;
সেখানে সুন্দরী আছেন যাঁরা, তুমি তাঁদের চঞ্চল চাহনির
স্ফুরিত বিদ্যুতে না যদি প্রীত হও, হবে যে বঞ্চিত নিদারুণ।
(২৮ নং শ্লোক, পূর্বমেঘ)
অপরূপ বর্ণনা আছে এই পুণ্য ধামের। এই অবন্তী দেশে গ্রামবৃদ্ধেরা সন্ধ্যায় বসে বিশালা নগরীর পূর্ব গৌরবের কথা শোনায়। বলে বৎস্যরাজ উদয়ন এবং বাসবদত্তার প্রেমের কাহিনি। হে মেঘ তুমি চলতে চলতে ক্ষণিক বিশ্রামে যেও মহাকাল মন্দিরের মাথায়। মন্দ্র, গম্ভীর, শ্লাঘ্য নিনাদের পুণ্যফল অর্জন করবে তুমি মেঘ। আমি তো মেঘের গর্জন শুনিনি ঘোর শ্রাবণে গিয়েও। মনে হয়েছিল মেঘদূতম কাব্য যেন কবির বৃষ্টির প্রার্থনা মন্ত্র। বৃষ্টি নেই, তাই বৃষ্টির স্মৃতিকে ধরে রাখা। মালব মালভূমি আসলে অনাবৃষ্টির পৃথিবী। আর অনাবৃষ্টি, জলহীনতার বিরুদ্ধে মানুষের উৎসব যেন সিংহস্থ।
