লিনেনের লুঙ্গির আলাদা আরাম। তার ছোঁয়া খুব নরম। একসময় খুব পরেছি। এখন মেলে কি মেলে না খেয়াল করিনি। গেরুয়া লিনেনের লুঙ্গি কিনে সেই লুঙ্গি দিয়ে পাজামা বানিয়ে পরতে দেখেছি এক অগ্রজ কবিকে। তাঁকে দেখে আমিও সেই কাজ করলাম, তাতে কি হলো ডুলুং নদীর পাড়ের মানুষজন অবাক। এ কী কাণ্ড! লুঙ্গি তার কাপড়েই যায় চেনা। পাজামা বানাই শার্ট বানাই, লুঙ্গিকে লুকোতে পারবে না কেউ। লুঙ্গির পরিচয় কাপড়েই। লুঙ্গিতে নাক সিটকানো মানুষ কম নেই। বউ চায় না স্বামী লুঙ্গি পরুক। বরং হাফ প্যান্ট, বারমুডা, নাভির কাছ থেকে দড়ি ঝুলবে তলপেট অবধি। ইস, লুঙ্গি ভাঁজ করে মালাইচাকির উপর পর্যন্ত তুলেছ কেন ভূত! সভ্যতা নেই। হাফ প্যান্ট কি গোড়ালি অবধি নামে? বলবে কে? পাজামার দড়ি নিয়ে সমস্যা। দরকারের সময়ে দড়িতে গিট লাগবেই। আর লাগলে সে গিঁট ছাড়ায় কার সাধ্য? গিট মধ্যরাতে হতে পারে, সময়ে অসময়ে হতে পারে। সিনেমা হল বা কফি হাউসের টয়লেটে হতে পারে গিটের গিটকিরি। আর পাজামার দড়ি পোক্ত না হলে, ফট করে ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। তাই বর্মার রাজা দর্জিকে ডেকে নতুন কিছু বানাতে বলতে লুঙ্গির আবির্ভাব। শোনা যায় পাজামার গিট না খুলতে পেরেই লুঙ্গির আবিষ্কার। বর্মার রাজার ইচ্ছাতে লুঙ্গির আবির্ভাব। লুঙ্গি আবিষ্কার নিয়ে আমাদের বন্ধু লম্বু নিমু এই লিখেছিল,
পাজামার গিটকিরি, সয় না সয় না,
সময়ে সে নিজের কাছে, রয় না, রয় না।
পাজামার গিটের গিটকিরি সয় না তাই লম্বু নিমু লুঙ্গি ধরল। বর্মার রাজার মতো তারও হয়েছিল পাজামার দড়ি নিয়ে কঠিন সমস্যা। রাজার হলে প্রজার হবে না কেন?
সেলাই ছাড়া লুঙ্গি আছে দক্ষিণ ভারতে। লুঙ্গি তাঁদের জাতীয় পোশাক। শাদা পরেন বেশি। লুঙ্গি নিয়ে লুঙ্গি ডান্সেও তাঁরা প্রাণবন্ত। চেন্নাই এক্সপ্রেস সিনেমায় দীপিকা পাড়ুকন এবং শাহরুখ খানের লুঙ্গি ডান্স লুঙ্গির প্রমোশন ঘটিয়েছে। দক্ষিণ বাদে বাকি ভারত সেলাই মারা লুঙ্গি নিয়ে খুশি। গোল হয়ে ঘিরে থাকে, ঝটকা মেরে পরে নাও। কোন ব্র্যান্ড পরবে, অফিসার, ইসমাইল? ইসমাইল ভালো অফিসার নয়। অফিসার ভালো ইসমাইল নয়। যার যেমন পছন্দ। লুঙ্গি বলে ফেলাঝেলা কিছু নয়, তার হরেক রকম ব্র্যান্ড আছে। সিল্কের দামী লুঙ্গি পরে আনন্দ উৎসবে এসেছেন মহাত্মন তাও দেখেছি। ইদানীং লুঙ্গি নারীর পোশাকও হয়েছে। কিন্তু তা সমস্ত বছরের, দিন রাত্রির নয়। সাড়ে তিন হাত চওড়া আর পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাত লম্বা হলেই লুঙ্গি সব মানুষের উপযোগী। ভারতের সব প্রদেশেই লুঙ্গি পরেন সাধারণ মানুষ, শুধু শীত প্রধান অঞ্চলগুলি বাদ দিয়ে। শুধু ভারত কেন, বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার (বর্মা) থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, জর্ডান, সোমালিয়া-সহজ পোশাক লুঙ্গি সব দেশেই প্রিয়। বললাম যে সময়ে সাহায্য করতে লুঙ্গির তুল্য কোনো পোশাক নেই। কোমরে গিট দেবেন সহজ, আর তা না হলে বেল্ট পরা যায়। ঘরে আমি বেল্ট পরিনি কোনোদিন। আর বাইরে লুঙ্গি পরতে সঙ্কোচ। কিন্তু আমারই বয়সী সুমেধার বাবাকে রোজই রংজ্বলা লুঙ্গি আর টি শার্ট পরে বাজারে আসতে দেখি। তিনি তো লুঙ্গিতেই সদানন্দ। ক্কচিৎ দেখি প্যান্ট সার্ট, তিনি জামাইবাড়ি চলেছেন। প্রতিবেশী শৈলেনবাবু ব্রাহ্মণ। লুঙ্গি পরে উপবীতধারী তিনি খালি গায়েই বাজার যেতেন সকাল সকাল। তবে, শীতের দিনে লুঙ্গি শীত ঠেকাতে পারে না সত্য। পা দুখানি জমে যায়। লুঙ্গি তো আসলে কাপড়ের নিচে উদলা করেই রেখে দেয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। তাই কঠিন শীতের সময় লুঙ্গির নিচে ইনার পরতেই হয়। হ্যাঁ, লুঙ্গির ঘুম অনেক সময়ই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ক্যানিঙের এক সস্তার হোটেলে অনেক রাতে আশ্রয় নিয়ে যে ঘরটিতে আমাকে থাকতে দেওয়া হলো এক রাত্রের জন্য, সেই ঘরে আর এক খাটে ধুমসো কালো এক মাছের ব্যাপারি উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছিলেন লুঙ্গি মাথায় তুলে। চোখ বোঁজা ব্যতীত উপায় ছিল না। সে ছিল ভাদ্র মাস। ঘরটিতে পাখা ছিল না। উফ, এখন যে চোখ বুঁজলেও দেখতে পাই।
মুসলমান পরিবারে বালকও লুঙ্গি পরে। ইদের দিন দেখি, নতুন চেক লুঙ্গি, শাদা পাঞ্জাবি আর ফেজ মাথায় পাঁচ বছরের বালক চলেছে বাবার হাত ধরে। আমার পুত্রটি যখন বালক ছিল, চেক লুঙ্গি এনে দিয়েছিলাম খুঁজে। দড়ি দিয়ে সেই লুঙ্গি কোমরে বেঁধে, হনুমানের মুখোস পরে, হাতে গদা নিয়ে সে ঘুরত। লুঙ্গি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। গদাও। হনুমানের মুখোসও। হনুমান লুঙ্গি পরে ঘুরছে, হায়, তা যদি হতো তাহলে কত কিছুই না মিটে যেত। মিটত কারণ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি হিন্দু ঘরে লুঙ্গি পরলেও এখনো বিশ্বাস করে লুঙ্গি মুসলমানের পরিধেয়। সুতরাং বজরংওয়ালি তা পরেন কীভাবে, যতই তাতে বাহার খুলুক।
পুণ্যধাম উজ্জয়িনীর পুণ্যকথা
পুণ্যধাম উজ্জয়িনী। কবির নগর উজ্জয়িনী। উজ্জয়িনী নগর পুণ্যভূমি কেন না এই নগরে মহাকালেশ্বরের অধিষ্ঠান। এই পুণ্যধামে শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের একটি লিঙ্গমূর্তি রয়েছে মহালেশ্বর মন্দিরে। এই লিঙ্গমূর্তিকে শিবের সাক্ষাত- মূর্তি মনে করা হয়। শিবের জ্যোতিরলিঙ্গের কাহিনি রয়েছে শিব পুরাণে। একবার ব্রহ্মা ও বিষ্ণু কলহে মত্ত হন কে তাদের ভিতরে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে। তখন মহেশ্বর শিব ত্রিভুবন ভেদ করে এক অন্তহীন আলোকস্তম্ভ রূপে আবির্ভূত হন। ব্রহ্মা ও বিষ্ণু এই জ্যোতির্ময় আলোকলিঙ্গের উৎস সন্ধানে একজন যান আকাশে একজন যান পাতালে। আকাশ-পাতালে খোঁজ করেও কেউই লিঙ্গের উৎস সন্ধান করতে পারেন না। কিন্তু ব্রহ্মা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য বিষ্ণুকে বলেন তিনি খুঁজে পেয়েছেন লিঙ্গের উৎস। বিষ্ণু মেনে নিলেন তা। শিব তখন আর এক জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আত্মপ্রকাশ করে মিথ্যা বলার জন্য ব্রহ্মাকে অভিশাপ দিলেন যে কোনো অনুষ্ঠানেই ব্রহ্মার স্থান হবে না। তিনি পূজিত হবেন না। আর বিষ্ণুকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, তিনি অনাদি অনন্তকাল পূজিত হবেন। জ্যোতির্লিঙ্গ হলো সত্যের প্রতীক। সত্যম শিবম সুন্দরম – এই বাক্যই যেন জ্যোতির্লিঙ্গে উদ্ভাসিত। শিবই সত্যের অংশ। শিবই সুন্দর। এদেশের বারোটি মন্দিরে জ্যোতির্লিঙ্গ শিব আছেন। গুজরাতের সোমনাথ মন্দির, অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলমের মল্লিকার্জুন, উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর, উজ্জয়িনীর নিকটবর্তী ওংকারেশ্বর, কেদারনাথ, মহারাষ্ট্রের ভীমশঙ্কর, বারানসীর বিশ্বনাথ, মহারাষ্ট্রের ত্র্যম্বকেশ্বর, দেওঘরের বৈদ্যনাথ, গুজরাতের দ্বারকার নাগেশ্বর, তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের রামেশ্বর এবং মহারাষ্ট্রের আওরাঙ্গাবাদের জ্যোতির্লিঙ্গ মূর্তি। উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর শিবের মুখ দক্ষিণ দিকে। গর্ভগৃহে মহাকালেশ্বরের অধিষ্ঠান। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে মহাকালেশ্বর শিবই উজ্জয়িনীর রক্ষাকর্তা। পুরাণে কথিত আছে, এই নগরের নাম ছিল অবন্তিকা। এই নগর ছিল শাস্ত্র শিক্ষার জন্য সুখ্যাত। আর ছিল ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ। অবন্তিকার রাজা চন্দ্রসেন ছিলেন শিবের উপাসক। অবন্তিকা নগর একবার আক্রান্ত হয় বহিঃশত্রু দ্বারা। চন্দ্রসেন পরাস্ত হয়ে শিবের কাছে প্রার্থনা করেন বিপর্যয় থেকে মুক্ত হবার জন্য। তখন শিবের আবির্ভাব হয় মহাকালেশ্বর রূপে, তিনি অবন্তিকা নগরকে শত্রুমুক্ত করেন। সেই থেকে তিনিই এই পুণ্যভূমির রক্ষা কর্তা। অবন্তিকা নগরের আর এক নাম হয় উজ্জয়িনী। উজ্জয়িনীর আর এক নাম আছে। বিশালা। উজ্জয়িনীর বড় উৎসব শিবরাত্রি। আর হয় কুম্ভ। মহাকুম্ভের সময় বৈশাখ। এখানে প্রয়াগ হরিদ্বারের মতো অর্ধ কুম্ভ হয় না। বারো বছর অন্তর পূর্ণ কুম্ভ। বৈশাখ মাসে সূর্য যখন মেষ রাশিতে, চন্দ্র তুলা রাশিতে এবং বৃহস্পতির অবস্থান সিংহ রাশিতে, তখন বারো বছর অন্তর সিংহস্থ। এই কুম্ভ স্নানের নাম সিংহস্থ। হরিদ্বারে কুম্ভের যে শাহি স্নান তা হয় দুপুরে, প্রয়াগে ভোরে, আর উজ্জয়িনীর শিপ্রা নদীতে কুম্ভের শাহি স্নান হয় গভীর রাতে। বৈশাখে এই পুণ্যধামে জলকষ্ট ভয়ানক। এমনি উত্তর পশ্চিমের এই মালব মালভূমির দেশে বছরে ১৪-১৫ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়। বৈশাখে তাপমাত্রা হয় ৪৪ ডিগ্রি। তার ভিতরে সিংহস্থ কুম্ভ স্নানে সারা ভারতের পুণ্যারথীরা আসেন, শিপ্রায় জল নেই। শিপ্রা আসলে ছিল ক্ষিপ্রা নদী। তার সেই ক্ষিপ্রতা নেই। তবু সেই নদী মহাকালেশ্বরের নদী, মঙ্গলনাথের নদী, মহাকবি কালিদাসের নগরের নদী। আর এক নদী আছে এই নগরের উপকন্ঠে। খান নদী। সেই নদীও বিশুষ্ক প্রায়। মেঘদূত কাব্যে বর্ণিত গম্ভীরা নদী আছে এই নগরে কাছেই। সবই গ্রীষ্মে হারায় গতিপথ।
