কফি হাউসে বন্ধুরা সব নানা টেবিলে থাকে। নবীন বন্ধুরা, কনিষ্ক, শাশ্বতী, অনির্বাণরা আলাদা টেবিলে বসে। নবীন প্রজন্ম এসে গেছে। প্রচুর কম বয়সী ছেলে মেয়ে। তাদের দিকে তাকিয়ে দেখি। আমিই যেন টেবিলে টেবিলে বসে বসে এই বয়সে এসে পড়েছি। এক এক টেবিলে এক এক বয়স। বন্ধু বদল হয়ে গেছে। ইচ্ছে করে টেবিল বদল করে ওদের সঙ্গে মিশে যাই। ওদের কথা শুনি। গল্প কবিতা সিনেমা… কী ভাবছে ওরা। দূর থেকে সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়ে থাকি। এমন দিন হয়েছে, একা বসে আছি কোনো টেবিলে, দরজার দিকে তাকিয়ে আছি। কেউ এলে হাত তুলব। শ্যামলদা ঢুকলেন নাকি, সিদ্ধার্থ ঘোষ বা বাসুদেব দাশগুপ্তকে নিয়ে তুষার চৌধুরী? এমন মনে হয়। সত্যি মনে হয়। কফি হাউস হলো স্মৃতিপুঞ্জের আধার। কফি হাউস একটি না লেখা বই। এর ভিতরে কত গল্প, কত ভালোবাসা, নিন্দা, হিংসার জন্ম হয়, মৃত্যু হয়। বইটির পাতা উল্টে দেখি আমি যখন একা বসে থাকি একটি টেবিলে। কালো কফির কাপ সামনে। বাইরে মেঘ করেছে ভীষণ। বৃষ্টি নামল বলে।
লুঙ্গির বাহার
লুঙ্গির তুলনা লুঙ্গিই। এমন আরামের পরিধেয় আর নেই। লুঙ্গি ধরেছি হাফ প্যান্ট ছাড়ার পর। হাফ প্যান্ট ছেড়েছি পা দুখানি রোমশ হয়ে যাওয়ার পর। হাঁটুতে রোম, চোখের তলায় কালি, আর হাফ প্যান্ট মানায় না। শ্যামবাজারে পর পর লুঙ্গির দোকান। লুঙ্গি স্টোরই আছে কয়েকটা। শুধুই লুঙ্গি। মফস্বলের মানুষ আর.জি.কর. হাসপাতালে কাজ সেরে নতুন লুঙ্গি নিয়ে বাড়ি ফিরবে,তাই লুঙ্গির কত রঙ কত বাহার। টিউশনির টাকা পেয়ে সেখান থেকে লুঙ্গি কিনে এনে বেলা দশটা নাগাদ রোয়াকের আড্ডায় গেছি, বয়স ১৮-১৯, সবে ফার্স্ট ইয়ার। আয় করছি দুটি কিশোরকে পড়িয়ে। তো লুঙ্গি পরিহিত শ্রীমানকে দেখে বন্ধুরা অবাক। তাদের কেউ কেউ কেউ পায়জামা, কেউ কেউ হাফ প্যান্ট। আমিই লুঙ্গি। আমাদের হারুদা অনেক বছর অবধি হাফ প্যান্ট পরত। খুব কায়দাবাজ। চুলে টেরি, গালে পাতলা দাড়ি, রাজকুমার সিনেমা দেখে তার গল্প আরম্ভ করেছিল, কীভাবে চুমুর দৃশ্যে দুইটি টিয়া পাখিকে ব্যবহার করেছে পরিচালক। বলতে বলতে হারুদা আমাকে তিরস্কার করল, এসব পরে আড্ডায় আসবি না। আমি পরেছি তাতে হারুদার খুব অসুবিধে। তাকে আমি লুঙ্গি পরতে দেখিনি। অনেক দিন পরে পায়জামা। আমি তখন, সেই বেকারবেলায় লুঙ্গি পরে কয়েকদিন বাইরে গিয়ে বুঝেছিলাম এতে এলাকার কিশোরী কন্যাদের কাছে দাম কমে যাবে। হাসাহাসি করে সব। লুঙ্গি মানেই কর্তা। বুড়ো কর্তা। সুতরাং রাস্তায় লুঙ্গি পরা শেষ, কিন্তু বাড়িতে বন্ধ হয়নি। লুঙ্গির রকম আছে। চেক লুঙ্গি, প্লেন লুঙ্গি, সিল্কের লুঙ্গি, সিন্থেটিক সুতো মেশান লুঙ্গি, সরু পাড় দেওয়া লুঙ্গি…। কোনো লিনেনের লুঙ্গির গিট খুলে খুলে যায়, সে লুঙ্গিতে সিন্থেটিক সুতো মেশান। লুঙ্গির দাম কাপড়ের গুণমানে। আবার রঙে চেকে দামের হেরফের হয়। আমার এখন দুইখান লুঙ্গি বাটিকের ছাপওয়ালা। সে বেশ সুন্দর। একটি হলদে শাদা, অন্যট সবজে শাদা। আমার খুব পছন্দের। বাড়ির পোশাক ঐটি। গায়ে পাঞ্জাবি কিংবা সার্ট। হুঁ, লুঙ্গি সরল পোশাক। এত সরল আর হয় না। তার কোনো ডিজাইনের হেরফের নেই। লুঙ্গির পকেট নেই। জিপার নেই। শুধু বুক চিরে লম্বা একটা সেলাই আছে। লুঙ্গিকে অমন সেলাই করে একসূত্রে বাঁধা হয়। সেলাই না করে লুঙ্গি পরিধানও একটি স্টাইল। দক্ষিণ ভারতীয়রা পরেন। লুঙ্গি তাঁদের নিজস্ব পোশাক। লুঙ্গির উপরে শার্ট পরে মিটিঙে চলেছেন বড় সায়েব। লুঙ্গির উপরে শার্ট পরে চেম্বার আলো করে বসে আছেন বড় কর্তা। বর্মা (এখন মিয়ানামার) থেকে লুঙ্গি এসেছে এদেশে। যারা বলেন মুসলমান পুরুষের পরিধেয় এইটি, ঠিক বলেন না। বার্মিজ পরিধেয় এদেশে এলে বুদ্ধিমানের মতো বাঙালি মুসলমান তা নিয়ে নিল নিজের করে, আর মুসলমান নিল বলে হিন্দু নিল না। হিন্দু দাগিয়ে দিল লুঙ্গি মুসলমানের মুসলমানির এক চিহ্ন। কিন্তু এও তো সত্য, দরিদ্র মানুষের এত ভালো এবং নিশ্চিন্ত পরিধেয় আর হয় না। প্রয়োজনেই লুঙ্গি পরে হয়েছে ধর্ম নিরপেক্ষ। একযোগে হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের পরিধেয়। চাষা মজুর, যাঁরা কায়িক শ্রমে বাঁচেন, জমিতে খাটেন, তাঁদের লুঙ্গি ভরসা। সে চাষা হিন্দু হন আর মুসলমান হন। দুটি কি তিনটি লুঙ্গিতে তাঁদের বছর কেটে যায়। লুঙ্গি ঘরে, লুঙ্গি বাইরে। লুঙ্গি পরে ধান কাটা, লুঙ্গি পরে বেয়াই বাড়ি যাওয়া। জামাই আসছে লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি গায়ে, শ্বশুর তাকে দামী লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি দিয়েছে ইদের বরাত। গাঁয়ের কথা এইটি, শহরের নয়। শহরের জামাই আলাদা। তার জিনস চাই, টি শার্ট চাই। সে জমিতে খাটে না যে লুঙ্গি মালাইচাকি অবধি ভাঁজ করে তুলে নিয়ে ছোট করে নিয়ে বর্ষা প্লাবিত জমিতে ধান্য রোপন করবে। কিংবা বৈঠা মেরে গাঙে ভেসে যাবে কাটা ধান নিয়ে। হ্যাঁ, শিখ ট্র্যাক ড্রাইভার লুঙ্গিতে স্বচ্ছন্দ। লুঙ্গি ভাসিয়ে ভাঙরা নাচেও সে স্বচ্ছন্দ।
দেশটায় ৯ মাস গরম, তিন মাস ঠান্ডা। গরমের দেশে লুঙ্গির মতো ভালো কী আর হয়। কতজনকে বোঝাতে চেয়েছি, লুঙ্গি হলো সন্ধ্যার খোলা জানালা, দখিনা হাওয়া বয় সেই জানালা দিয়ে। পা দুখানি, কোমর থেকে পায়ের পাতা অবধি খোলা- মেলা বাতাস খায় লুঙ্গিতে। দরকারে আধ ভাঁজ করে মালাইচাকি অবধি তুলে নাও। আরো আরাম। বাজারের ব্যাপারিরা লুঙ্গির নিচে হাফ প্যান্ট পরে, সেই প্যান্টে চোরা পকেট। সেই পকেটে টাকা রাখে। খুচরো-খাচরা রাখে ট্যাঁকে। ট্যাঁক হলো কোমর। কোমরে টাকা রাখা লুঙ্গিতেই সম্ভব। ট্যাঁকের জোর আছে কি নেই তা লুঙ্গিই বলবে।
