আড্ডা ছাড়া আমি পারি না। সেই কলেজ জীবনে যে কফি হাউসে প্রবেশ করেছিলাম, আর বের হতে পারিনি। এখনো শনি মঙ্গলে যাই। থাকে তরুণ বন্ধুরা। সমকালের নলিনী বেরা, সৈকত রক্ষিত, আমাদের পরবর্তী কালের জয়ন্ত দে, প্রবুদ্ধ মিত্র, অলোক গোস্বামী, সমীরণ দাস, মৈত্রেয়ী সরকার – এক সঙ্গে আড্ডা মারি। রমানাথ রায়, শেখর বসুরাও আসেন। আসে নবীন প্রজন্ম। কবিতার টেবিল সুইনহো স্ট্রিট পত্রিকার। সকলেই কবি। আমি তাপস রায়ের ডাকে তাদের টেবিলে বসি। আমি আড্ডায় নিজেকে সমৃদ্ধ করি। সত্তর থেকে সতেরর সঙ্গে মিশতে পারি। দে’জ পাবলিশিং-এ শুভঙ্কর দে, অপুর ঘরে যেদিনই যাই আড্ডা হয়। পুলক চন্দ থাকেন। তিমিরকান্তি কাজ করতে করতে যোগ দেয় আড্ডায়। আর নলিনী বেরা ও সমীর চট্টোপাধ্যায় এলে তো জমে যায় আড্ডা।
এখন টেকনোলজি দিয়েছে নতুন আড্ডার জায়গা। ফেসবুক, হোয়াট’স অ্যাপ। সেখানে বসে বাংলাদেশের স্বকৃত নোমান, অঞ্জন আচার্য, তাপস রায়, বিধান রিবেরু, অদিতি ফাল্গুনীর সঙ্গে আড্ডা হয়, প্রশান্ত মৃধার সঙ্গে কথা হয়। কথা হয় আমেরিকা বাসী বাংলাদেশের লেখক কুলদা রায়ের সঙ্গে। দীপেন ভট্টাচার্য, অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। মত বিনিময় হয় অতি তরুণ বন্ধুদের সঙ্গে। ইন্টারনেট, ফেসবুকের আড্ডায় কত বন্ধু পেয়েছি। কত রকম কথা জেনেছি। পরস্পরের এই মত বিনিময় খুব জরুরি এই জীবনের জন্য। আমি কুলদা, স্বকৃত, অদিতির লেখা ইন্টারনেটে পড়ি। খবর পাই সে দেশের। অভিজিৎ রায়ের হত্যার পর বাংলাদেশে কী হয়েছিল, সেই খবর। ওঁরাও খবর পান এই দেশের। আমি বন্ধুদের ছাড়া থাকতে পারি না। কয়েক বন্ধু চলে গেছে। মন খারাপ হয়। যাওয়ার বয়স হয়নি কারোর। আড্ডাটা ভেঙে গেল যে। কফিহাউসে আমাদের আড্ডা আছে। থাকবে। চল্লিশ বছর ধরে কফি হাউস যাওয়া। মনে পড়ে রামুদার কথা। কফিহাউসের পরিবেশক। মনে পড়ে একা টেবিলে নিমগ্ন নির্মাল্য আচার্য। মনে পড়ে অনেকের কথা। কফি হাউসে ঢুকলে মনে হয় তাঁরা আছেন ভীড়ের ভিতরে। কলরোলে যে মিশে আছে তাঁদের কথা।
কফিহাউস – একটি না লেখা বই
কফিহাউস একবার তুলে দিয়ে শপিং মল না কী করার কথা হয়েছিল। হাত বদল হয়ে হয়ে যে অবাঙালি ব্যবসায়ীর হাতে চলে গিয়েছিল, তিনি কফি হাউস তুলে দিয়ে বস্ত্র বিপনি কিংবা শাড়ির মল করবেন শোনা যাচ্ছিল। পরিবর্তিত হয়ে যাবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ এই অ্যালবার্ট হল। এখানে রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনা হয়েছে, সুরেন্দ্রনাথ বক্তৃতা করেছেন। জীবনানন্দের ‘জীবন প্রণালী’ উপন্যাসে অ্যালবার্ট হলের কথা আছে। আমি তখন আজকাল পত্রিকায় একটি লেখা লিখেছিলাম কফি হাউস বাঁচানো নিয়ে, হারিয়ে গেছে সেই লেখা। আমরা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রয়াত অগ্রজ লেখক শৈবালদা। ছিলেন অনাথবন্ধু দে ও আরো অনেক অগ্রজ। তাঁরা বহুদিন ধরে কফি হাউসে আসেন। অনাথদা ছিলেন শৈবালদার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অনাথদা এখনো আসেন। তাঁদের একটি টেবিল আছে জানালার দিকে, কিংবা না পেলে আশে-পাশে। হ্যাঁ, কফি হাউসের গেটে তখন একটি সভা হয়েছিল। সেই সভায় আমি অবক্তা বক্তৃতা করেছিলাম। শেষে বামফ্রন্ট সরকার অধিগ্রহণ করে কফি হাউস বাঁচিয়ে দেন। কফি হাউস ব্যতীত কলকাতা শহর ভাবতেই পারি না। কলকাতার কফি হাউস নিয়ে অন্য রাজ্যের কবি, শিল্পী সাহিত্যিকরা কত কৌতুহলী। ভোপালে ভারত ভবনে শুনেছিলাম, তাঁরা এমন এক আড্ডার জায়গা তৈরি করতে চান, করতে পেরেছেন বলে জানি না। বাংলাদেশের বন্ধুরাও একই কথা বলেন। আমি যা বলছি সব কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস নিয়ে। সেন্ট্রাল এভিনিউ কফি হাউস উঠে গেছে। শ্যামবাজারেও ছিল একটি। উঠে এখন হরলালকার কাপড়ের দোকান। এইটিকে তা করতে চেয়েছিল বেনিয়াবুদ্ধির ক্রেতা। আমরা আটকেছিলাম।
১৯৬৮-সালে আমি স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হয়েছি, তারপরই কিংবা ১৯৬৯ সাল থেকে আমি কফি হাউস যেতে আরম্ভ করি বন্ধুদের সঙ্গে। তখন নক্সালবাড়ির কৃষক বিদ্রোহ হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্সির ছেলেরা ‘সংগ্রামপুর’ (শৈবালদার গল্প) যাত্রা শুরু করেছে। শুনেছিলাম বিপ্লবের মন্ত্র উচ্চারিত হতো কফি হাউসেই। একবার পুলিশ আসার খবর পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে নেমে এসেছিলাম। কফি হাউসের পরিবেশক – কর্মীরাই আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন, কফি হাউসের অনেক স্মৃতি। লিখতে অনেক সময় লাগবে, স্মৃতি বিভ্রমে অনেকজনের কথা বাদ চলে যাবে হয়তো। তবুও লিখি। যতটা পারি লেখার কথা ভাবি, কিন্তু তা তো আনুপূর্বিক হবে না। আগের কথা পরে আসবে, পরের কথা আগে। কফি হাউসের পরিবেশক, কর্মী যাঁরা, তাঁদের অনেকের কথা মনে আছে। নাম মনে পড়ে রামুদা, ওয়াহেদভাই এঁদের। রামুদা মস্ত মানুষ ছিলেন। মোটা গোঁফ ছিল। মুখে হাসি ছিল। আমাদের ভালোবাসতেন। আমরাও রামুদাকে ভালোবাসতাম। আমি তখন চাকরি সূত্রে দীঘায় থাকি। ১৯৮০ সালের কথা। শৈবালদা গ্রীষ্মের ছুটিতে সপরিবারে গেছেন। বিকেলে ঝাউবনের ধারে পশ্চিমমুখী হয়ে নমাজে বসেছিলেন যিনি, শ্বেতশুভ্র দাড়ি, দীর্ঘকায়, তাঁকে দেখে দাঁড়ালেন শৈবালদা। তিনি নমাজ শেষে উঠলে শৈবালদা বললেন, ওয়াহেদভাই, তুমি এখানে? ওয়াহেদভাই ছিলেন কফি হাউসের কর্মী। তাঁকে আমি দেখিনি আগে, মানে কফি হাউসে। অবসরের পর তিনি তাঁর গ্রামে ফিরে এসেছিলেন। গ্রামের নাম রানিসাই। পূর্ব মেদিনীপুরের ঐ প্রান্তে। ওয়াহেদের সঙ্গে শৈবালদার কত কথা। নির্মল ব্রহ্মচারী, নিমাই ঘোষ, অনাথ বাবু … আরো কারো কারো খোঁজ নিয়েছিলেন ওয়াহেদভাই। সকলেই ছিলেন বিপ্লবী আন্দোলনে শৈবালদার সহযাত্রী। তাঁদের যত পরামর্শ যত পরিকল্পনা ছিল কফি হাউসেই। আমি এসব চোখে দেখিনি। কানে শুনেছি। বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের ঘাটি ছিল কফি হাউস। হ্যাঁ, ওয়াহেদভাই আমার কাছে এরপরে এসেছেন অনেক। কফি হাউসের খবর নিতেন, শৈবালদার খবর নিতেন। আমাকে তাঁর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। রানিসাই গ্রামে ওয়াহেদ ভাইয়ের বাড়িতে মধ্যাহ্ন ভোজের কথা এ জীবনে ভুলব না। ৩৮ বছর তো হয়েই গেছে।
