তখন কিন্তু ২২/বি প্রতাপাদিত্য রোডে আমাদের আড্ডা চলছিল। কবিপত্রের আড্ডা। এই সময়ে পবিত্রদা একদিন বললেন, শ্যামলদা, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এসেছেন প্রতাপাদিত্য রোডে, আর কয়েকটা বাড়ি পরে ৫১/১ নম্বরে, চলো আলাপ করে দিই তোমাদের সঙ্গে। কুবেরের বিষয় আশয়ের শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়! সেই আমাদের আড্ডা কবিপত্র থেকে শ্যামলদার বাড়ি আড্ডা স্থানান্তরিত হয়ে যেতে লাগল কখনো কখনো। আর শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আড্ডা ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আর মনোরম দিন। তখন নিজেকে গড়ে তোলার সময়। ওই সময়ে অমন এক মহৎ লেখকের সঙ্গ পাওয়া জীবনের দুর্লভ অর্জন। শ্যামলদার সঙ্গে আড্ডায় আমি জীবনকে যেটুকু শিখেছি, জেনেছি, তাই নিয়ে এতটা বছর কেটে গেল। সেই আড্ডায় তুষার সমীর প্রভাতদা, শৈবালদা, কতজন যে বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে। এমনই আড্ডা আর গল্পের মানুষ ছিলেন তিনি, কলেজ স্ট্রিট থেকে টেনে নিয়ে গেছেন তাঁর বাড়ি। আমার হাতে ব্যাগ। আমি মেদিনীপুর থেকে এক পক্ষ পর বাড়ি ফিরছি। শ্যামলদা বাড়ি ফিরতেই দিলেন না। পরের দিন সকালে ফিরলাম।
একদিন সন্ধ্যায় তিনি বললেন, নদীর বয়স হয়, জানো? আমি চুপ করে আছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেই কুলটিকরিতে চালের দর কত? হাটে যাও? তিনি বললেন, বিভূতিভূষণের ইছামতী পড়েছ? অনুবর্তন, দৃষ্টি প্রদীপ? মেঘমল্লার গল্পটি? জীবনটাকে দেখে নাও। জরিপের এক চেনে কত লিংক থাকে? চাষা তার হেলে বলদের সঙ্গে কথা বলে, শুনেছ?
তিনি আমার আরম্ভে আমাকে পেলেই এই সব জিজ্ঞেস করতেন। এক সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত, তুই ধারাবাহিক উপন্যাস লিখবি। আমি যে লিখিনি কখনো? বন্ধুরা, তুষার সমীর বলল, চ্যালেঞ্জ নে। লেখ। তিনি বলেছিলেন, সম্পাদক বললে, না করতে নেই। আমার উপন্যাস লেখার শুরু তাঁর প্ররোচনায়। “পাহাড়ের মতো মানুষ” লিখেছিলাম, তখন আমি ২৭। কোন সূত্রই ছিল না, লিখতে আরম্ভ করলাম ডুলং নদীর তীরে রাজবাড়িতে ফিরে। উপন্যাস লিখতে শিখেছি লিখতে লিখতে। তিনি বলতেন, কচু গাছ কাটতে কাটতে তলোয়ার চালাতে শেখে সৈনিক, লিখতে লিখতে লেখক হয়। এখন সেই সব দিনের কথা মনে পড়ে।
মহাশ্বেতাদির বাড়িতেও সেই সময়ে, তার পরেও কম আড্ডা হয়নি। অসীম চক্রবর্তী, জয়ন্ত জোয়ারদার, নির্মল ঘোষ, কলকাতায় এলে দীপঙ্কর চক্রবর্তী(অনীক সম্পাদক) আরও কত মানুষ। তাঁর সঙ্গে আড্ডাও ছিল এই জীবনের বড় পাওনা। তাঁর বাড়িতেই আমি তৃপ্তি মিত্রকে দেখি একদিন। দুপুরে গিয়ে দেখি তাঁরা তাঁদের কম বয়সের কথা বলছেন। সেই তেতাল্লিশের মন্বন্তরের কথা। মায়ের কোলে ক্ষুধার্ত শিশুর মৃত্যু, লঙ্গরখানা, পথে মৃতদেহ পড়ে। আমি এখনো সেই কথা স্মরণ করে শিহরিত হই। আমাদের সেই আড্ডায় গীতা ঘটকের গানও শুনেছি মহাশ্বেতাদির বাড়িতে।
আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসে রমাপদ চৌধুরীর ঘরে ছিল শনিবারের আড্ডা। আমি বহুদিন সেই আড্ডায় থেকেছি। সাহিত্য, শিল্পই ছিল সেই আড্ডার বিষয়। শনিবারের শেষবেলায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, বুদ্ধদেব গুহ কোনো কোনদিন আসতেন। বুদ্ধদেব গুহ, সিরাজদা আর শীর্ষেন্দুদার খুনসুটি ছিল অসামান্য। আসতেন হিমানীশ গোস্বামী, প্রখ্যাত চিত্রকর সুধীর মৈত্র, লেখক রমানাথ রায়, সুব্রত সেনগুপ্ত, শেখর বসু… কে নয়? আমাদের সমসাময়িক বন্ধুরা, রাধানাথ মণ্ডল, শিবতোষ ঘোষ, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, কানাই কুন্ডু, দীপঙ্কর দাস, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, নবকুমার বসু, মালবী গুপ্ত…থাকতেন। রাধানাথ এখন বেঁচে নেই। লন্ডন থেকে এলে নবকুমারের সঙ্গে দেখা হয়। সে এক মহাআড্ডাবাজ। খুব বন্ধুবৎসল। রমাপদবাবুর ঘরের আড্ডায় তিনি শুনতেন বেশি, বলতেন কম। আবার তাঁর মুখেই শুনেছি সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কলকাতার কথা। মার্কিন সোলজারদের কথা। খড়গপুরে তাঁর শৈশবের কথা। একবার রবীন্দ্রনাথকে দেখেছিলেন রেলের কামরায়। তাঁরা কবিকে দেখতে অচেনা ফুল হাতে করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জানালা দিয়ে তাঁর হাতে সেই ফুল তুলে দিতে, তিনি চিনতে পেরেছিলেন, বললেন, মুচকুন্দ! রবীন্দ্রনাথের রূপ বর্ণনা করেছিলেন রমাপদবাবু। রমাপদ চৌধুরীর ঘরে সেই আড্ডায় এমনি কত কথা শুনেছি। তিনি তরুণ লেখকদের সাহচর্য পছন্দ করতেন। তাঁর সঙ্গও অনেক দিয়েছে আমাকে।
আড্ডায় তো পাওয়া যায়। দেওয়া নেওয়া হয়। আমি এখন বুঝতে পারছি পেয়েছি বেশি। অনেক অনেক। সমকালের লেখকরা এক সঙ্গে বসে নতুন লেখা পাঠ হতো। রাধানাথের ছিল গল্পচক্র। আমরা ছিলাম তার অংশীদার। সেখানে কত গল্প পড়েছি পাণ্ডুলিপি থেকে। শুনেছি কত গল্প। এমনি এক অনতি সন্ধ্যায় এসেছিলেন সমরেশ বসু ও তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী। বহুরাত অবধি তাঁর কাছে শুনেছিলাম ‘দেখি নাই ফিরে’ রচনার প্রস্তুতি কাহিনি। তখন তিনি লেখার জন্য তৈরি হচ্ছেন। উপাদান সংগ্রহ করছেন।
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, দীপেন্দ্রনাথ, শ্যামলদা, মহাশ্বেতা, রমাপদ চৌধুরীর পরে আমার কাছে যে আড্ডা যে সংসর্গ মূল্যবান হয়ে উঠেছিল তা ছিল প্রতিক্ষণ পত্রিকা ঘিরে। প্রতিক্ষণ আমাদের সাহিত্যে বড় একটা ছায়া ফেলে গেছে। এখানে শিল্প নির্দেশক ছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। তিনি পত্রিকার অলঙ্করণে এনেছিলেন অভিনব সৌন্দর্য। কবিতার পাতায় অলঙ্করণ প্রথম প্রতিক্ষণেই দেখি। প্রতিক্ষণ সম্পাদনা করতেন স্বপ্না দেব। প্রকাশক প্রিয়ব্রত দেব। প্রতিক্ষণের মতো রুচিমান সাময়িক পত্র আমি আর দেখিনি। এই পত্রিকার পুজো সংখ্যার অলঙ্করণ করতেন বিখ্যাত চিত্রকররা। আমার উপন্যাস হাঁসপাহাড়ির ছবি এঁকেছিলেন যোগেন চৌধুরী। পাতা জুড়ে সব রঙিন ছবি। প্রতিক্ষণের আড্ডা বসত মঙ্গল আর বৃহস্পতিতে। সেই আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন দেবেশ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। আমরা বন্ধুরা, নলিনী বেরা, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, আফসার আমেদ, অশোককুমার সেনগুপ্ত, তরুণ লেখক জয়ন্ত দে, শিল্পী যুধাজিৎ সেনগুপ্ত, কবি সিদ্ধেশ্বর সেন, তরুণ শিলাদিত্য সেন… কতজন যে আড্ডা দিতাম। মাঝে মাঝে আসতেন দিব্যেন্দু পালিত, স্বপ্নময়, বালুরঘাট থেকে কলকাতায় আসা অভিজিৎ সেন, ভগীরথ মিশ্র। সেই আমাদের নানা রঙের দিন ফুরিয়ে গেল প্রতিক্ষণ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যেতে। প্রকাশন সংস্থাটি রয়েছে। কী অপূর্ব তাঁদের বইয়ের ডিজাইন, ছাপা। বইমেলায় প্রতিক্ষণের স্টলে একটি আড্ডা ঘর হতো। সেই আড্ডা ঘর ছিল বইমেলায় আমাদের অফুরন্ত আড্ডার জায়গা। সেখানে একদিন দেখি কবি শামসুর রাহমানকে। বাংলাদেশের লেখকদের একটা ভাল ঠিকানা ছিল প্রতিক্ষণ। একদিন বাংলাদেশের আবুবকর সিদ্দিকি, একদিন তরুণ লেখক প্রশান্ত মৃধা। কতজন যে এসেছেন। সব নাম মনে নেই।
