আমার ছেলেবেলার কিছুটা দিন কেটেছে বসিরহাটের অদূরে দণ্ডীরহাট গ্রামে। আর সেই গ্রাম ছিল যেন আড্ডার পীঠস্থান। ছোট একটি বাজার ছিল হাই ইস্কুলের কাছেই। সেই বাজারে ছিল গোড়া বাঁধানো এক বকুল গাছ। সেই বকুলতলায় আমার আড্ডাজীবন শুরু। তখন ইস্কুল বালক। তবু আড্ডা দিয়েছি খেলার পর। ইস্কুল ছুটির পর। বাজারে ধনাদার চায়ের দোকানের ধরাটে ছিল বড়দের আড্ডা। ধরাট হলো বাঁশের চটা জুড়ে জুড়ে বেঞ্চির মতো করা। ওই ধরাটে বসলে তার জীবনে আর কিছু হয় না। এই কথা নীতিবাগীশ মেজদাদের মুখে শুনতাম। সেই ধরাটের আড্ডা আর কলকাতার রকের আড্ডা একই রকম বলা যায়। আমাদের কিশোর বেলায় কিংবা সদ্য যৌবন বেলায় রকের আড্ডায় যে রং ছিল বন্ধুতার, তা এখন নেই। কলকাতা শহর থেকে রকই উঠে গেছে। তবে উত্তর কলকাতায় এখনো আছে। শ্যামপুকুর স্ট্রিটে খুব ভালো আড্ডা দিয়েছি আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে। রকে। থাকতেন এখন খ্যাতিমান ভাস্কর বিমল মণ্ডল। থাকতেন প্রখ্যাত লেখক সমরেশ মজুমদার। থাকতেন প্রদ্যোত ভদ্র, কল্যাণ সর্বাধিকারী। এই আড্ডা ছিল সাহিত্য আর শিল্পের। সদ্য প্রকাশিত গল্প নিয়ে কথা হতো এখানে। বিমলের বাড়ি শ্যামপুকুর স্ট্রিটেই। তার কাজ দেখতে তার বাড়িতেও যাওয়া হতো। এখনো রবিবারে পুরনো পাড়ায় দেখা যায় পুরনো আড্ডা। রক না পেলে চায়ের দোকান। তাও না পেলে রাস্তার ধারে,ফুটপাথে দাঁড়িয়ে। আড্ডায় বন্ধুতা বাড়ে। আড্ডায় মত বিনিময় হয়। আড্ডা অতি মধুর। নিউ ইয়র্কের কুইনস সিটিতে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে বাঙালি বাংলাদেশিরা চায়ের কাপ হাতে আড্ডা দিচ্ছে, দেখেছি। আমিও যোগ দিয়েছিলাম।
আমি আড্ডা দিতে ভালবাসি। আড্ডা দিতে দিতে বড় হয়েছি। অভ্যাসটা রাখব কোথায়? জানি আড্ডা সময় খেয়ে নেয়, নিক, আড্ডা না দিলে যে ভাত হজম হয় না। আড্ডা কেরিয়ার নষ্ট করে, করুক, কিন্তু আড্ডা না হলে মন প্রসারিত হয় না। অনেক কিছু পাওয়া হয় না। যেহেতু বহুদিন নিবার্ন্ধব প্রায় থেকেছি বাইরে, দুর্গম গ্রামে, আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকতাম কলকাতার আড্ডার জন্য। আড্ডার বন্ধুদের সঙ্গে মানসিকতার মিল না থাকলে সেই আড্ডা ভেঙে যায়। নাটকের লোকজন একসঙ্গে, সিনেমার লোক একসঙ্গে আড্ডা দেন। আমি দেখেছি নাটকের আড্ডা। ন’টায় বসে সেই আড্ডা বেলা দুপুর পযন্ত গড়াত আমাদের ফ্ল্যাটে। বিভাস চক্রবর্তী, অশোক মুখোপাধ্যায়, মাণিক রায়চৌধুরীরা আসতেন।
শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষের বাড়ির আড্ডায় ছুটির দিনে কোনো বিরাম থাকে না। সকাল থেকে চলতে থাকে। বেলা তিনটে অবধি তা গড়াতে দেখেছি আমি। সেই আড্ডা কলকাতা শহরের সেরা আড্ডা। সেখানে তরুণ কবি থেকে প্রবীন কবি, গল্পকার, সিনেমা নির্মাতা, চিত্রকর, গায়ক থেকে অভিনেতা, নির্দেশক, কে না যান? ঘুরে এসে আনন্দ। আড্ডা শুধু শঙ্খবাবুর সঙ্গে নয়, সকলের সঙ্গে সকলের। আমার সৌভাগ্য হয়েছে সেই আড্ডায় কয়েকবার যাওয়ার। অপূর্ব অভিজ্ঞতা।
লিখতে আরম্ভ করলে বন্ধু বদলে যায় আমার। পাড়ার আড্ডা আর হয় না। পুরনো আড্ডা ভেঙে যায়, নতুন আড্ডা শুরু হয়। সেই আড্ডা অবশ্যই সাহিত্যের। পাড়ায় আড্ডা হত বাল্যকালের বন্ধুদের সঙ্গে। তারপর ‘একাল’ নামের একটি লিটল ম্যাগাজিন ঘিরে। ম্যাগাজিনটি পাড়া থেকেই বেরোত। সম্পাদক নকুল মৈত্রের বাড়ি। তাঁর সঙ্গে কফি হাউস। চায়ের দোকান। গল্প পড়া হত। সে এক দিন গেছে। ১৯৭৩-এর শেষ থেকে আমি কলকাতার বাইরে। ১৯৭৫-এর প্রথমে কবিপত্রের বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ। এক পক্ষ অন্তর কলকাতা ফিরে ২২/বি প্রতাপাদিত্য রোডে কবিপত্রের আড্ডায় গিয়ে পড়েছি। সেখানে কত নতুন প্রতিভাবান বন্ধু হয়েছিল। কবি তুষার চৌধুরী, অনন্য রায় (দু’জনেই এখন নেই), সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, সমীর চট্টোপাধ্যায়, বৌধায়ন মুখোপাধ্যায়, দীপঙ্কর দাস, শচীন দাস, অসীম চক্রবর্তী (শেষ তিনজনই এখন নেই) ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়। ছিলেন পবিত্র মুখোপাধ্যায়, প্রভাত চৌধুরী। একদিন এক আড্ডার সন্ধ্যায় বটুকদা (জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র), একদিন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়…, কতজন। বটুকদা নিজ কন্ঠে, নবজীবনের গান শুনিয়েছিলেন। এস মুক্ত কর, মুক্ত কর…। কবিপত্রের আড্ডা সেই পঁচাত্তর থেকে। সেখানেই শৈবাল মিত্র, চণ্ডী মণ্ডলের সঙ্গে পরিচয়। আমার সেই সব বন্ধু অগ্রজরা অনেকেই তো নেই। শ্যামলদা, চণ্ডীদা, শৈবালদা, দীপঙ্কর, শচীন, অসীম, তুষার অনন্য। বৌধায়ন এখন ইংরেজি ভাষার মান্য কবি। আমি প্রায়ই নতুন গল্প বের করতাম ব্যাগ থেকে। মেদিনীপুরের নিঃসঙ্গবাস আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিত। একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল সকালে উঠে লিখতে বসা। সেই অভ্যাস রয়ে গেছে। আমাকে নিয়ে তুষার বলত, সুলেখা কোম্পানির পাইপ লাইন অমরের কলমে ঢুকে গেছে। হা হা হা। কী হাসি। নির্মল বন্ধুতা। কী লিখব সেই সব দিন আর আড্ডার কথা। বারদুয়ারি, খালাসিটোলা… আড্ডা চলত। ১৯৮৩ নাগাদ আমার জন্ডিস হয়। তুষার বলেছিল, মদ খেয়েছি আমি, জন্ডিস হয়েছে তোর।
কত আড্ডার কথা মনে পড়ে। কলেজ স্ট্রিটে পুস্তক প্রকাশনী নামে একটি প্রকাশন সংস্থা সেই ১৯৭৫-৭৬ নাগাদ ষাট দশকের শ্রেষ্ঠ কবিতা প্রকাশ করেছিলেন। আর করেছিলেন পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা। সেই প্রকাশন সংস্থার কর্ণধার ছিলেন কনকবরণ মিত্র। বেলেঘাটা সুভাষ সরোবরের কাছে থাকতেন। কলেজ স্ট্রিটে তাঁর ঘরে এসে বসতেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। প্রথম তাঁকে সেখানে দেখে আমি অভিভূত। সঙ্গে সমীর চট্টোপাধ্যায়, বৌধায়ন মুখোপাধ্যায়, শচীন দাস, কখনো তুষার থাকতেন। পবিত্রদা আর প্রভাত চৌধুরী তো ছিলেনই। সেখানে কতদিন আড্ডা দিয়েছি সেই পিতৃপ্রতিম লেখকের সঙ্গে। তিনি বলতেন সাহিত্যের নানা কথা। আমার গ্রাম জীবনের অভিজ্ঞতা শুনতেন নিবিষ্ট হয়ে। শেষে বলতেন, এ সব আমি দেখি নি, তুমি দেখেছ, তুমি লিখতে চেষ্টা করো। আমি একটি গল্প লিখেছিলাম ১৯৮৮ নাগাদ, ‘বাদশা ও মধুমতী’। যে ঘটনা সেই গল্পের সূত্র, সেই ঘটনা তাঁকে আমি বলেছিলাম ১৯৭৬ নাগাদ। তিনি অবাক হয়ে শুনেছিলেন। বলেছিলেন লিখতে। সেই লেখা এল বারো বছর বাদে সাপ্তাহিক বর্তমান পত্রিকায় তাঁকে স্মরণ করে একটি লেখা লিখতে গিয়ে। যা দেখিনি তাও মনে পড়ে গিয়েছিল যেন। তিনি ছিলেন লেখকের লেখক। এখনো তাঁকে পড়ি। এক জীবনে এত পাওয়া হয় না সাধারণত। মনে পড়ে এক এক সন্ধ্যায় আমরা বন্ধুরা, সমীর আমি গিয়ে হাজির হতাম পরিচয়ের আড্ডায়। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন পরিচয় সম্পাদক। তিনি কথা বলতেন সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে। জানি না কবে শ্রোতা থেকে সেই আড্ডার অংশীদার হয়ে গেলাম আমরা। পুজোর পর বড় আড্ডা হত পরিচয়ে। পুজো সংখ্যার লেখা নিয়ে সকলে তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানাতেন। আমি পরিচয়ের ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংখ্যায় দীপেনদার সঙ্গে বসে সমস্ত দুপুর প্রুফ দেখায় সাহায্য করেছি। কপি মেলাতাম। দীপেনদা কাজের সঙ্গে সঙ্গে কত বিষয়ে না কৌতূহলী সেই তরুণের কৌতূহল মেটাতেন। তাঁর কাছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা শুনেছি, প্রগতি লেখক শিবিরের কথা, শম্ভু মিত্রের কথা…কত কথা। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প, মানিক – তারাশঙ্করের উপন্যাস নিয়ে কথা শুনেছি। কোন লেখা পড়তে হবে, তিনি জানাতেন। পরিচয় পত্রিকায় গল্প লিখি ১৯৭৫ সালে। শকুন্তলার জন্ম। সেই গল্প হারিয়ে গেছে। শারদীয়তে লিখি ১৯৭৬ সালে। গল্পের নাম রাজকাহিনি। দীপেন্দ্রনাথের সঙ্গে সারা দুপুর কথাবার্তা আমার জীবনে অনেক কিছু দিয়েছিল।
